ইতালিতে রাজনৈতিক সংকট

রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৃতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী এবং থ্রি টাইগারসের অন্যতম দেশ ইতালি। দেশটির সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এর সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় দেশটিতে ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। এর রেশ ধরে এবং নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় ওই সময়ের প্রেসিডেন্ট সিলভিও বারলোসকুনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মারিও মোন্তিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনিও নির্বাচনে প্রার্থী হন। কিন্তু দেশটির ডান ও বামপন্থী কোনো দলই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ইতালির সংস্কার ও ব্যয় সংকোচের পথে থাকা না থাকা নিয়ে গভীর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বাজারে ধস নেমেছে, ইউরোর বিনিময় মূল্য পড়ে গেছে। বাজারে ইতালির বন্ডের মূল্যও ধাক্কা খেয়েছে। এখন ইতালির ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে গোটা ইউরোপ। আর সমঝোতার সরকার হলেও সেটি একবছরের জন্য টিকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনের ফলাফল: রোমের ইল মেসাজেরো পত্রিকা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে শিরোনাম করেছে: ‘ইতালিতে বিজয়ী হল অরাজকতা’। নির্বাচনের আগেই বিভিন্ন জরিপে আশঙ্কা করা হচ্ছিল যে, কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও পেতে পারে। সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়। নির্বাচনে পিয়ের লুইজি বারসেনির নেতৃত্বাধীন মধ্য বামপন্থী জোট নিম্নকক্ষে পেয়েছে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট। সিলভিও বারলোসকুনির মধ্য ডানপন্থী জোট পেয়েছে ২৯ দশমিক ২ শতাংশ। সিনেটে বারসেনি পেয়েছেন ৩১.৬ শতাংশ এবং ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। অনেকেই মনে করছেন বারসেনি মারিও মোন্তির সঙ্গে ঐক্য গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু তাতে জোটের নিম্নকক্ষে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ৯ দশমিক ১ শতাংশ হয় যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, বারসেনি এবং বারলোসকুনি ঐক্য গড়ে তুলতে পারেন। বারলোসকুনি মোন্তির সঙ্গে ঐক্য গড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। মোন্তিও তার সঙ্গে ঐক্য গড়তে চান না। তিনি বলেছেন, বারলোসকুনি একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন লোক। তিনি কেবল নিজের ব্যবসার কথা চিন্তা করেন। যদিও প্রথমদিকে দু’জনই এ বিষয়ে নেতিবাচক মত প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এখন বারলোসকুনি বলছেন দেশের স্বার্থে সেই ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। তবে সেটি আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেটি এখন ভাবার বিষয়। তবে খেলা দেখাতে পারেন কমেডিয়ান বেপ্পি গ্রিলো যিনি ফাইভ স্টার আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করেছেন এবং নিম্নকক্ষে একক দল হিসাবে ২৫ দশমিক ৫ এবং সিনেটে ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। পিয়ের লুইজি বেরসেনির নেতৃত্বাধীন মধ্য-বাম জোট সংসদের নিম্নকক্ষে জিতেছে মাত্র এক লাখ পঁচিশ হাজার ভোটে। তাদের সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে বৃহত্তম দল হিসেবে বেশ কিছু অতিরিক্ত আসন পাওয়ার কারণে। সংসদের উচ্চকক্ষে বা সিনেটে মধ্য-বাম জোটের ১১৯টি এবং মধ্য-ডান জোটের ১১৭টি আসন পাওয়ার কথা। সিনেটে আসনগুলো বণ্টন হয় অঞ্চলের ভিত্তিতে। আগামী ১৫ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক প্রেসিডেন্ট জর্জিয়ো নেপোলিতানো সংসদ গঠনের আহবান জানানোর মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের কাজ শুরু হবে। সংকট বাড়ার সম্ভাবনা: ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় দেশটিতে ব্যাপক সংকট দেখা দেয়। এর রেশ ধরে এবং নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রেসিডেন্ট সিলভিও বারলোসকুনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ইতালি উন্নত বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় দেশ যে ঋণ সংকটে রয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জিম্বাবুয়ে এবং হাইতি এর নিচে ছিল। দুর্নীতিতে দেশটি ৭২ তম। ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স অনুযায়ী দেশটি অর্থনৈতিক সংকটের দিক থেকে ৭৩তম, নারী সমতার দিক থেকে ৮০তম এবং আয় সমতাও বাড়ছে। শুক্রবার প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায় বেকারত্বের হার ১১.৭ যার মধ্যে ৩৯ শতাংশ যুবক। ইতালি সংস্কার ও ব্যয় সংকোচের পথে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবারও বাজারে ধস নেমেছে। ইউরোর বিনিময় মূল্য পড়ে গেছে। বাজারে ইতালির বন্ডের মূল্যও ধাক্কা খেয়েছে। ইতালির ভবিষ্যত্ নিয়ে গোটা ইউরোপ অনিশ্চয়তায় ভুগছে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মারিও মোন্তি কড়া হাতে ব্যয় সংকোচ ও সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নির্বাচনের এই ফলাফলের পর স্থিতিশীল সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাছাড়া যে তিন শিবির উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে দু’টি শক্তি সংস্কারের বিরোধী। নতুন করে আবার নির্বাচন হলেও সংস্কারপন্থিরা যথেষ্ট শক্তি অর্জন করতে পারবে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। ফলে ইতালি কোন পথে এগোবে, কীভাবে ঋণের ভার কমাবে, অর্থনীতিকে কীভাবে চাঙ্গা করবে, কেউ তা জানে না। এর প্রভাব গোটা ইউরো এলাকার উপর পড়তে বাধ্য। গ্রিলো মন্তব্য করেছেন, পরবর্তী সরকার একবছরের বেশি স্থায়ী হবে না। তিনি শনিবার জার্মান ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে কোনো সরকারকে সমর্থনদানে তিনটি শর্ত দিয়েছেন। প্রথমত, নির্বাচনী আইন সংস্কার, দ্বিতীয়ত, রাজনীতিবিদদের ব্যয় সংকোচন এবং তৃতীয়ত, সংসদ সদস্যরা দু’বারের বেশি নির্বাচন করতে পারবে না শীর্ষক আইন করা। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, কোনো সমঝোতার সরকার গঠিত হলেও সেটি একবছরের বেশি স্থায়ী হবে না। আবার একটা নির্বাচন দিতে হবে। আর এর লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়েই বিতর্ক: ইতালি একটি গণতান্ত্রিক দেশ। প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার বিদ্যমান। এর সংসদে দু’টি কক্ষ রয়েছে। এর নিম্নকক্ষ চেম্বার অব ডেপুটিস এবং উচ্চকক্ষ সিনেট নামে পরিচিত। নিম্নকক্ষে ৬৩০ জন নির্বাচিত সদস্য রয়েছে এবং উচ্চকক্ষে ৩১৫-এর বেশি নির্বাচিত সদস্য রয়েছে। এতে আজীবন সিনেটর হচ্ছেন চারজন। উভয়কক্ষে পাঁচ বছরের জন্য সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। সিনেটে আসনগুলো বণ্টন হয় অঞ্চলের ভিত্তিতে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১৫৮টি আসনের প্রয়োজন। দু’টি কক্ষের ক্ষমতা সমান। কোনো আইন পাস করতে উভয় কক্ষের সমর্থন প্রয়োজন। নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৩৪০ আসন প্রয়োজন। সিনেটে অঞ্চলভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ২০টি অঞ্চলে আসনের কমপক্ষে ৫৫ শতাংশ জয়ী জোটের থাকতে হবে। দেশটির নির্বাচন পদ্ধতি দুর্বোধ্য এবং বিতর্কিত। এই পদ্ধতির পরিবর্তন নিয়ে রাজনীতিবিদরা একমত হলেও এর পরিবর্তে কোন পদ্ধতি আসবে সেই বিষয়ে কেউ একমত হতে পারছে না। একজন বারলোসকুনি: সাবেক প্রেসিডেন্ট বারলোসকুনির বিরুদ্ধে রয়েছে যৌন কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ। ৭৬ বছর বয়সী বারলোসকুনি বিশ্বের ১১৮তম ধনী। রিয়েল স্টেট ব্যবসাসহ তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে তার। তিনি ইতালির সর্বশ্রেষ্ঠ ধনীর খেতাব পেয়েছেন। ফোর্বস ম্যাগাজিনের জরিপে তার সম্পদের পরিমাণ ৬.২ বিলিয়ন ডলার। এসি মিলানের মতো বিশ্বসেরা ফুটবল ক্লাবের মালিক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী আলোচিত বারলোসকুনি। এই নির্বাচনে তিনি নাগরিকদের করের বোঝা থেকে মুক্তি দেয়ার কথা বলেছেন। অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বের হওয়া, করপোরেট ট্যাক্স বাদ দেয়ার কথা বলেছেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক গ্যাড লার্নার বলেছেন, বারলোসকুনির কথার ফুলঝুরি ইতালির রাজনীতিকে খাদে ফেলেছে। তিনি সবসময়ই মিথ্যা প্রচারণা করতে ভালবাসেন। তার খ্যাতি রয়েছে যে তিনি যা বলেন তা তিনি রক্ষা করতে পারেন না। এক মডেলের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক থাকার অভিযোগে তার দ্বিতীয় স্ত্রী ভেরোনিকা ল্যারিও তাকে ত্যাগ করেছেন। এছাড়া ১৮ বছর বয়সের কারিমা এল মাহরগ নামের এক নর্তকীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে যার সঙ্গে তিনি ১৩ বার যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এরকম অনেক যৌন কেলেঙ্কারির নায়ক দুই দশক আগে রাজনীতিতে প্রবেশ করা বারলোসকুনি। গত ২০ বছরে তিনি বিভিন্ন মামলায় ১০৬ বার আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। গত অক্টোবরে কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে তার চার বছরের কারাদণ্ড হয়।