সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছে আফগানিস্তান
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০১৩, ১৯:৪০
আফগানিস্তানের শান্তি কতো দূর? কবে শেষ হবে যুদ্ধবিগ্রহ? এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত কেউই জানে না। ঠিক একইভাবে বলা যাচ্ছে না দেশটি সুখ ও সমৃদ্ধির মুখ আদৌ দেখবে কিনা? এখনো চরম অস্থিতিশীল রাষ্ট্র আফগানিস্তানে প্রবাদের মতোই প্রচলিত রয়েছে একটি কথা— সমৃদ্ধির রাস্তার বেশিরভাগই ভূগর্ভস্থ। এরপরও বোঝার বাকি থাকে না যে, সমৃদ্ধ হওয়ার উপায় বলতে প্রাকৃতিক সম্পদকেই বোঝানো হচ্ছে। এর পেছনে কারণও রয়েছে যথেষ্ট। দেশটিতে আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন খনিজ সম্পদ। এটি শুধু ধারণা নয়, মোটামুটি নিশ্চিত যে, আফগানিস্তানে সঞ্চিত তেল, তামা ও লিথিয়ামের পরিমাণ বিশাল, যার মূল্যমান হয়তো ট্রিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে যাবে। এগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আফগানরা পরিণত হতে পারে সমৃদ্ধ জাতিতে। সেরকম প্রত্যাশাও করছে তারা। এমন হলে অবশ্য আফগানিস্তানের রক্তশোষিত মৃত্তিকার দুর্নাম কিছুটা হলেও ঘুচবে ।
তবে স্বপ্ন পরিণত হতে পারে দুঃস্বপ্নে। সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ উত্তোলন ও ব্যবহার নাও ঘটতে পারে। ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সংঘর্ষের কারণে এটি থেকে যেতে পারে আশা হিসেবেই। উপরন্তু সার্বিক পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে আরো জটিল। উল্লিখিত তিনটি কারণেই শান্তিতে নেই হামিদ কারজাই সরকার। সাচ্চা দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করলেও প্রেসিডেন্ট কারজাইয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা পর্যন্ত করা হচ্ছে। বিক্ষুব্ধ লোকজনের হাত থেকে কয়েকবারই তিনি বেঁচে গেছেন সৌভাগ্যবশত।
২০১৪ সালে ন্যাটো বাহিনী চলে যাওয়ার পর দেশটিতে কী ঘটবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের মানুষ চিন্তিত, বিশেষত যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামান। তাদের ধারণা, তখন গৃহযুদ্ধের প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে প্রাকৃতিক সম্পদ। এতে আরো চাঙা হয়ে উঠবে আঞ্চলিক ও জাতিগত দ্বন্দ্ব। শক্তিশালী আঞ্চলিক যুদ্ধসম্রাট ও আঞ্চলিক নেতারা এরই মধ্যে খনিজ সম্পদ ইস্যুতে চোখ পাকাতে শুরু করেছে, বসে নেই তালেবানরাও; যেখানেই চলছে উন্নয়ন কার্যক্রম, সেখানেই তারা চালাচ্ছে হামলা। দাবি— ন্যায্য ভাগ তাদের দিতেই হবে, না দিলে বাধিয়ে দেবে লংকাকাণ্ড। এতো দমন-পীড়নের পরেও তাদের মধ্যে ডর-ভয়ের বালাই নেই। উল্টো অনেক স্থানেই তারা বিচরণ করে যাচ্ছে বীরদর্পে।
রাজধানী কাবুলের কয়েকটি খনিতে কাজ চলছে পুরোদমে। অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যেকটিরই ঠিকাদার হচ্ছে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের আত্মীয়-স্বজন। আফগানিস্তানে খনি আইনের বাস্তবায়ন জরুরি। দেরি হওয়ায় কয়েকটি প্রকল্প পড়ে গেছে হুমকির মুখে। আফগান সরকার পশ্চিমাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে— এ অভিযোগ অবশ্য গেল গ্রীষ্মে প্রত্যাখ্যান করেছে তার কেবিনেট। তবে এতে পশ্চিমারা অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছে। তাদের অভিমত, আসলে তারা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও চীনের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতেই বেশি আগ্রহী, এমনকি দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও। এ ব্যাপারে পশ্চিমারাও যে নাছোড়বান্দা, এমন নয়। গ্লোবাল উইটনেস নামে একটি গ্রুপ প্রাকৃতিক সম্পদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মধ্যে সংযোগ ভাঙার চেষ্টা করে। এর ক্যাম্পেইন লিডার এলেনল নিকল বলেছেন মজার কথা, ‘আপনি যদি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কোন খনিজ ক্ষেত্র উন্নয়নের চেষ্টা চালাতে চান, তাহলে নির্দ্বিধায় আফগানিস্তানকে বেছে নিতে পারেন। নির্দিষ্ট এ কাজের ক্ষেত্রে আপনি এ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হলে এর চেয়ে ভালো জায়গার সন্ধান পাবেন না। কিন্তু এটি ভুললেও চলবে না, দৈত্য এখন বোতলের বাইরে। একে বশে আনতে চাইলে পোহাতে হবে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা। এতোসব জানা সত্ত্বেও চীনাদের চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। আফগানিস্তানের বিষয়ে তারা লেগে পড়েছে আদাজল খেয়ে। চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম হামিদ কারজাইয়ের আত্মীয়-স্বজনের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে পেট্রোলিয়াম উত্তোলন করছে উত্তরের আমু দরিয়া ক্ষেত্র থেকে। আরেকটি চীনা কোম্পানি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তামা উত্তোলনের। চারটি সোনা ও তামা খনির জন্য টেন্ডার আহবান করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলোরও কাজ পাবে চীনা মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি। তাদের সঙ্গে বিড করে অন্যান্য দেশের কোম্পানি ঠিক কুলিয়ে উঠতে পারছে না। আফগান তাজিক অববাহিকায় সমৃদ্ধ তেল খনির জন্য বিড-এর অনুরোধ জানিয়েছে দেশের খনিজ মন্ত্রণালয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা ছিলো এ কাজটি তাদের ভাগ্যেই জুটবে, অন্তত সামরিক সহযোগিতার বিচারে হলেও। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ আশা কার্যত দুরাশাই।
আন্তর্জাতিক সাহায্য গ্রহণের পাশাপাশি স্বনির্ভর হওয়ার চিন্তাটা আফগানদের মাথায় ঢুকেছে বেশ ভালোভাবে। সে জন্যই খনিজ সম্পদ বিষয়ক আর্থিক প্রকল্প হাতে নিতে চাইছে সরকার। এ ব্যাপারে খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ওয়াহিদুল্লাহ শাহরানি এক প্রকার মরিয়া। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রবৃদ্ধির হার যে পর্যায়ে রয়েছে, তা থেকে ৩-৪ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব কয়েক বছরের মধ্যে এবং তা শুধু কৃষি ও খনিজ খাত থেকেই। তবে শাহরানি একটা বিষয়ে চিন্তিত, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে যথাযথভাবে প্রকৃত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারবেন কি-না। না পারলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে ব্যাপকভাবে। সে ক্ষেত্রে যথাযথ চুক্তি না হলে বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই। তিনি মনে করেন, চুক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করছে আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্।
উদ্বেগের আরো কারণ রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ চিন্তিত, মূল্যবান পাথর, মার্বেল ও ক্রোমাইটের ক্ষুদ্র খনি থেকে সম্পদ চুরি কিংবা পাচার হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র এর লাগাম টেনে ধরে রাখতে পারছে না। উল্টো উস্কে দিচ্ছে সহিংসতা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, ক্রোমাইটকে কেন্দ্র করে একটি অপরাধী চক্র বেশ সক্রিয়। চোরাচালানের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানি তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের জন্য তহবিল গঠন করছে।
বামিয়ানের প্রধান ভূতাত্ত্বিক মুহাম্মদ আমিন বিস্ময়কর তথ্য জানিয়েছেন, পাহাড়ের পাদদেশে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আকরিক লোহা সংগ্রহের ধান্দায় রয়েছে তালেবানরা। তাদের এ পরিকল্পনা সফল হলে এখানকার প্রকল্প থমকে যাবে, কাজ করতে পারবে না কেউই। নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবনার কারণ। বামিয়ান থেকে কাবুল যাওয়ার রাস্তাটা বিদেশিদের জন্য মরণফাঁদ। প্রায়ই তাদের উপর হামলা চালানো হয়। নিরাপত্তা বাহিনী কিছুতেই থামাতে পারছে না এ ধরনের আক্রমণ। এক কথায় বামিয়ানে গেলে কোনো বিদেশির ফিরে আসার নিশ্চয়তা নেই। জীবন চলে যাওয়ার আশঙ্কা কাজ করে সব সময়।
ব্যাপক আকারে খনিজ দ্রব্য তুলতে চাইলে আশ-পাশে বিদ্যুত্ কেন্দ্র থাকলে সুবিধা হয়। ভালো সড়ক ও রেলপথ থাকারও প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাস্তব তথ্য হলো- অনেক দেশই আফগানিস্তানকে পাত্তা না দিয়ে চুক্তির বরখেলাপ করছে। মেস আইনাক তামা খনির কাজটি চীনকে দেয়া হয়েছিলো পুরস্কার হিসেবে। তখন তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, পূর্বে পাকিস্তান কিংবা উত্তরে তুর্কমেনিস্তান পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করে দেবে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয়, রেললাইন নির্মাণ তো হয়ইনি, উপরন্তু শুরু হয়নি তামা উত্তোলনও। আফগানিস্তানে সড়ক পথের অবস্থাও বেহাল।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যত্ নির্ভর করছে খনিজ দ্রব্যের ওপর, কিন্তু সংশ্লিষ্ট লোকজনের ঢিলেমি লক্ষণীয়। তাদের ঠিক কত মাসে বছর যায়, বলা যায় না। তাছাড়া উঠে আসে স্থিতিশীলতার প্রসঙ্গও। কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কেউ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে চায় না। একজন পশ্চিমা কর্মকর্তার মন্তব্য, ২০২৮ সালের আগে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে অনেকেই অনীহা প্রকাশ করেছে। অরাজকতার ভয় কাজ করছে তাদের মনে। তাছাড়া সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। আপনি রাস্তাঘাট ও বিদ্যুত্ কেন্দ্র তৈরি করে সবকিছু ঠিকঠাক করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব বিফলে যাবে, তাতো মানা যায় না। মানা উচিতও নয়। নইলে আরো দ্রুত এগোনোর সুযোগ ছিলো আফগানিস্তানের, যা অনেক দেশের নেই। অপর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য তারা আফসোস করে।