ইরানের সাথে আস্থার সম্পর্ক
তৈরি করছে পশ্চিমা বিশ্ব!
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০১৩, ১৯:৪৩
গত সপ্তাহে কাজাখস্তানে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়জাতির আলোচনার বিষয়বস্তু ও ফলাফল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে শোরগোল শুরু হয়েছে বেশ জোরেশোরেই। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তেহরানের পরমাণু ইস্যুতে দুই দিনের ঐ সংলাপ শেষে দুই পক্ষের রাগঢাকে এই শোরগোল আরো বেড়েছে। তাত্ক্ষণিকভাবে শুধু বোঝা যায় উভয় পক্ষের সন্তুষ্টি। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই এ ব্যাপারে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তাহলে কি ইরানের সাথে পশ্চিমা শক্তির বৈরী ও অনাস্থার সম্পর্ক ঘুচতে যাচ্ছে! গত এক বছর ধরে কয়েক দফা আলোচনার সব ক’টি ব্যর্থ হলেও এবারের বিষয়বস্তু এমন কীই বা ছিলো, যাতে দুই পক্ষই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লো! তাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি আর মনোভাবই বা কী? এ নিয়েই চলছে নানামুখি বিশ্লেষণ।
ইরানের পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বহুদিনের। এ লক্ষ্যেই নাতাঁজ ও ফর্দোসহ ভূগর্ভের একাধিক পরমাণু স্থাপনায় চুল্লি তৈরি করে তেহরান। সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলছে। ইরানের দাবি, তাদের এ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং তা বিদ্যুত্ ও জ্বালানি তৈরিসহ বেসামরিক খাতে ব্যবহারের জন্য। তবে পশ্চিমা বিশ্বের আশঙ্কা, গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে তেহরান। এ জন্যে ইউরেনিয়াম এবং তা সমৃদ্ধকরণের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানিতে ইরানের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ। দফায় দফায় বাড়ানো হয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের পরিধি। তা সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি এ কার্যক্রম, বরং জোরদার করা হয়েছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরমাণু কর্মসূচির গতি। চুল্লীগুলোতে বাড়ানো হয়েছে ইউরেনিয়াম পাত্র সেন্ট্রিফিউজের পরিমাণ। এ অবস্থায় সময়-সুযোগ বুঝে ইরানের পরমাণু স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার প্রকাশ্য হুমকিও দেয় ইসরাইল। সবশেষ গত মাসে বিপুল ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে, এমন নতুন এক খনির সন্ধান পায় ইরান। এমন বাস্তবতায় ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ইরানের সাথে ইতিবাচক আলোচনা করে ছয় জাতি। এরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স ও জার্মানি। যাকে বলা হচ্ছে, ফাইভ প্লাস ওয়ান। অর্থাত্ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পাঁচ পরাশক্তি এবং জার্মানি।
ইরান বা ছয় জাতির কোন আলোচক বিস্তারিত কিছু না জানালেও ঐ সংলাপকে মাইলফলক ও মধ্যস্থতার টার্নিং পয়েন্ট বলে দাবি করেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর সালেহী। বুধবার ভিয়েনায় অস্ট্রিয়া প্রেস এজেন্সি-এপিএ’কে দেয়া তার সাক্ষাত্কারে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো, ইউরেনিয়ামের ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ বা বিশুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে তেহরান। আর তাতেই উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন। এর কারণ হলো, বিদ্যুত্ তৈরিতে ইউরেনিয়ামের এতো উচ্চমাত্রার বিশুদ্ধতার দরকার হয় না। পশ্চিমা বিশ্বের তাই আশঙ্কা, আর কয়েক ধাপ এগুলেই পরমাণু অস্ত্র হাতের মুঠোয় পেতে পারে ইরান।
বিভিন্ন গণমাধ্যম জানায়, ছয়জাতির সংলাপে ইরানকে এই ধরনের স্পর্শকাতর কর্মসূচি বন্ধের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে তেহরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতেও রাজি ছয়জাতি। রয়টার্সকে এক মার্কিন কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইরানকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের একটি পথ বাতলে দেয়া হয়েছে। যেটাতে স্বর্ণ ও পেট্রোকেমিকেলসহ অন্যান্য মূল্যবান পদার্থ আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। এর ফলে ইরানের ব্যাংকিং খাতের উপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা অনেকটা উঠে যাবে। তেহরান যেটুকু ইউরেনিয়ামের ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ করেছে, তা নিজে না রেখে দেশের বাইরে কোথাও পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে ছয়জাতি। ২০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ইরানি আলোচকরা জানিয়েছেন, একটি গবেষণা চুল্লির জ্বালানির জন্যই উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন পড়ছে। তারা স্বীকার করেন, প্রায় একশ’ কেজি ইউরেনিয়ামকে ঐ মাত্রায় সমৃদ্ধ করতে পেরেছে ইরান।
কৌশলগত কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ব্যাপারে কিছুটা নমনীয়। তাই আগে যেখানে ওয়াশিংটন তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের কথা বলতো, এখন সেখানে বলা হচ্ছে ইউরেনিয়ামের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধকরণ বন্ধের কথা। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বিশ্বের এই নীতিগত পরিবর্তনই ইরানের বিজয়। বিশ্বকে তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, শান্তিপূর্ণ কাজে পরমাণু কর্মসূচি জায়েজ। তবে ইরানের ব্যাপারে নমনীয় হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন পশ্চিমা দেশের এক সিনিয়র কূটনীতিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রস্তাবনায় পারিভাষিক কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে মাত্র। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে কাজাখস্তানের বৈঠকে অবিশ্বাস ও অনাস্থা দূর করতে দুই পক্ষই আন্তরিক ছিলো।
ইরানের সাথে ছয়জাতির আরো দুই দফা বৈঠকের দিনক্ষণ ধার্য হয়েছে। আগামী ১৮ মার্চ ইস্তাম্বুলে দুই পক্ষের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক বসবে। এরপর ৫ এপ্রিল আবার আলমাতিতে শুরু হবে ইরান ও ছয়জাতির রাজনৈতিক সংলাপ। ঐ দিনের আগে তাই আগাম কিছু বলাটা বেশ কঠিন।