বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা চুক্তি ভবিষ্যতের পথনির্দেশিকা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম সমাবর্তনে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেছেন, মানবতা ও আস্থার অসাধারণ চেতনাই বাংলাদেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠেছে। সার্বিক মানব উন্নয়নের অর্জনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ও বাংলাদেশের জনগণ প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। অনেক সামাজিক মাপকাঠিতে বাংলাদেশ দৃষ্টান্তমূলকভাবে এগিয়ে আছে। এ দেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সের তরুণদের মধ্যে সাক্ষরতার হার এখন ৭৭ শতাংশ। মানুষের গড় আয়ু ৬৯ বছর। দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা নিরসন ও সার্বজনীন শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুন নজির স্থাপন করেছে। বাংলাদেশে বিদ্যালয়ের পাঠ্যবই প্রণয়ন ও প্রকাশ কর্মসূচি পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ শিক্ষাজনিত কর্মসূচি বলে পরিচিত। এ দেশের অর্জন বিশ্বমানের। এর ওপর ভিত্তি করে সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশের সৌধ নির্মিত হবে। বাংলাদেশের তরুণরা, নিষ্ঠার সাথে এই মহান দায়িত্ব পালন করবেন। গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তার ভাষণে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এ কথা বলেন। ভারতের প্রথম এই বাঙালি রাষ্ট্রপতিকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব ল’জ’ প্রদান করা হয়। সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সভাপতি রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. জিল্লুর রহমানের হাত থেকে তিনি এ ডিগ্রি গ্রহণ করেন। সমাবর্তনে ৩৮ জন গবেষককে পিএইচডি, ৩৪ জনকে এমফিল ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ৩০ জন গ্রাজুয়েট স্বর্ণপদক লাভ করেন। আর সাত হাজার ৩৮৪ জন গ্রাজুয়েটকে সনদ ও ক্রেস্ট দেয়া হয়। প্রণব মুখার্জি বলেন, আজ বাংলাদেশ যে গণতন্ত্রকে বরণ করেছে সেটি হলো ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে জনগণ যে নীতিমালার সমাদর করতেন তার কারণে। গণতন্ত্রের অর্থ হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান প্রদর্শন এবং অভিন্ন কল্যাণের জন্য জনগণের ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দেয়া। এর অর্থ হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং স্বাধীন উক্তি ও স্পন্দিত সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করে তোলা। আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো শক্তিশালী হবে এবং আপনারা গণতন্ত্র রক্ষায় সদা সতর্ক থাকবেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এই সমাবর্তন বক্তা বলেন, আপনাদের মত তরুণ-তরুণীরাই আমাদের এই অঞ্চলের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ আপনাদের হাতে। আপনাদের একটি মহিমান্বিত অতীত ও প্রতিশ্রুতিভরা ভবিষ্যত্ রয়েছে। জাতি গঠনে বাংলাদেশের তরুণদের বিচক্ষণতা, সচেতনতা ও সংশ্লিষ্টতা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। এটি একটি ভালোবাসার শ্রম। ভারতের রাষ্ট্রপতি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ যেভাবে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত, বিশ্বে এমন আর দুটি দেশ নেই। আমাদের নিয়তি আমাদের ইতিহাস এবং ভূগোলের মতই একত্রে বোনা। আমাদের সাধ্যের মধ্যে ভারত বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নতি ও তার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সমর্থন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা বিশ্বাস করি, ভারত ও বাংলাদেশকে একযোগে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে এবং এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, আমাদের প্রবৃদ্ধি যেন আমাদের দু’দেশের জনগণের জন্য আরো সুযোগ সৃষ্টি করে। আমরা উভয়েই একই বাধার মোকাবিলা করছি। আমাদের একই শত্রু— সেই শত্রু দারিদ্র্য। আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতার শক্তি সর্বাধিক করতে আমাদের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। একটি দ্রুতপ্রজ আধুনিক অর্থনীতির দেশ হিসেবে উঠে আসতে বাংলাদেশ তার প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ কাজে লাগাবার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। স্থল ও জলসম্পদের শক্তি ছাড়াও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি আশীর্বাদ যা অনুসন্ধান করা এবং লাভজনকভাবে কাজে লাগানো দরকার। বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা বাংলাদেশে জন্মলাভ করে। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আবার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে। এর বাস্তব ফল পাওয়া যাবে সুষ্ঠু জল ব্যবস্থাপনা, অধিক বিদ্যুত্ ও গ্রিড সংযুক্তি, আরো বাণিজ্য এবং দুদেশের মধ্যে জনগণ ও পণ্যের আরো আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে। ভারত ও বাংলাদেশ এই অঞ্চলে এবং এর বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৃহত্তর সমন্বয়ের পথে নেতৃত্ব দিতে পারে। প্রণব মুখার্জি বলেন, ২০১৩ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফর এবং ২০১১ সালের মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক নতুন জোয়ার এসেছে। এখন আমাদের মধ্যে যে সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে তা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য পথনির্দেশিকা। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই; ভারত সকল চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। তিস্তা চুক্তি শিগগিরই চূড়ান্ত হবে জানিয়ে তিনি বলেন,ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল চুক্তি বাস্তবায়ন করার জন্য সংসদে একটি বিল আনছে। সীমান্তে যাবতীয় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা রোধে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সীমান্ত রেখাকে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং প্রবেশের ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করতে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে। অভিন্ন নদীর পানি বন্টনের ক্ষেত্রে আমরা পূর্বে অনেক চুক্তি করেছি। আমরা আশা করি তিস্তা ও পানি বন্টনের ক্ষেত্রেও এরকম একটি চুক্তিতে শিগগিরই উপনীত হতে পারবো। রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের উন্নয়ন ও আধুনিকতার পথে এগিয়ে যেতে হবে। তথ্য প্রযুক্তি ও জীব প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের রুপকল্প এবং এর ফলাফল দেশের মানুষের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তন ছাত্র বলেন, আমি আপনাদের অভিনন্দন জানাই। সাফল্য কামনা করি। সমাবর্তন মেধা ও যোগ্যতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। সাথে সাথে আগামী দিনে দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে রাখবেন, নিজের কল্যাণ নয়, অন্যের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমে নিজের জীবনকে মহিমান্বিত করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন ছাড়া ব্যক্তির উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। শুধু আর্থিক ও বৈষয়িক উন্নতি জাতি বা ব্যক্তিকে সামগ্রিক কল্যাণ দিতে পারে না। তিনি দক্ষ মানব সম্পদ হিসাবে গড়ে ওঠার পাশাপাশি মানবসেবা ও দেশসেবার মানসিকতা গড়ে তোলার জন্য গ্রাজুয়েটদের প্রতি আহবান জানান। এর আগে দুপুর সাড়ে ১১টায় ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ পাঠের মাধ্যমে সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুরু হয়। তবে দেশে চলমান সহিংসতাকে ‘পরিকল্পিত গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের যথার্থ পরিবেশই নেই দাবি করে সমাবর্তন বর্জন করেন বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান সমাবর্তন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদ, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক সহিদ আকতার হুসাইন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক কামাল উদ্দিন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এমপি, দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, ড. মশিউর রহমান, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার রঞ্জন মাথাই, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের কেএম শফিউল্লাহ, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহফুজা খানম প্রমুখ।