আরো তিন প্রাণ কেড়ে
নিলো সহিংস হরতাল
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০১৩, ২২:৪৯
দেশজুড়ে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থকদের তান্ডব অব্যাহত রয়েছে। দলীয় নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির দন্ডের প্রতিবাদে ডাকা হরতালের শেষ দিন গতকাল সোমবার বিভিন্ন স্থানে বিজিবি-পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে কমপক্ষে তিন জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। এর মধ্যে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় দুই সহোদর ও সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় এক স্কুলছাত্র মারা গেছে। ওই দুই উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। হরতাল চলাকালে কয়েকটি জেলায় রেললাইন উপড়ে ফেলে ট্রেন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হয়। সন্ধ্যায় গাজীপুরে দুটি বাসে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা। রাতে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে একাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতংক সৃষ্টির চেষ্টা করে তারা।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বন্দর নগরীর পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনে পরপর ৫টি হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্টেশনের ৩ ও ৪ নাম্বার প্লাটফরমের পাশে বোমাগুলো নিক্ষেপ করা হয়। বিকট শব্দে এসময় ব্যস্ততম এ স্টেশনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বোমা বিস্ফোরণে কেউ হতাহত হয়নি। পরে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তল্লাশী চালান। ঘটনার পর পুরো রেলস্টেশনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাওজোর এলাকায় গতকাল রাতে দু’টি বাসে আগুন দিয়েছে হরতাল সমর্থনকারীরা। খবর পেয়ে পুলিশ এলাকাবাসীর সহায়তায় আগুন নিভিয়ে ফেলে। কর্তব্যরত জয়দেবপুর থানার এসআই খোরশেদ আলম জানান, আগুনে পুড়ে বাস দু’টির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে সন্ধ্যার পর নগরীর জোড়পুকুর, রাজবাড়ি মাঠ, জজ র্কোট সড়ক, কেন্দ্রীয় বাসষ্ট্যান্ড, চান্দনা চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় পটকা বিস্ফোরিত হয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এতে শহরে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৮টার পর শহরের পুলিশ, আর্মড পুলিশ ও র্যাবকে টহল দিতে দেখা গেছে।
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, হরতালকারীরা বিকালে দর্শনা-চুয়াডাঙ্গা রেলপথ অবরোধ করে দর্শনা রেলস্টেশনে কপোতাক্ষ গোধুলী এক্সপ্রেস থামিয়ে দেয় এবং ট্রেন লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।
ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহে জামায়াত-শিবির গ্রামের মহিলা ও শিশুদের মাঠে নামিয়েছে। তারা গ্রামের সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করছে। গতকাল জেলায় বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে গাছ কেটে ও গুড়ি ফেলে অবরোধ করে জামায়াত-শিবিরের পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি মহিলা কর্মীরা। সাথে শিশুরাও ছিল। মহিলারা ঝাটা ও লাঠি নিয়ে সড়কে মিছিল ও অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ভাংচুর করে।
এদিকে ভোরের দিকে জেলায় কোটচাঁদপুরে রেল লাইন উপড়ে ফেলে নাশকতার চেষ্টা করে হরতাল সমর্থকরা। তাছাড়া উপজেলার বলুহর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে রেললাইনের কয়েকটি ক্লিপ খুলে ফেলে। খবর পেয়ে র্যাব-পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা পালিয়ে যায়। পরে রেলকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় রেললাইন মেরামত করে।
এছাড়া হরিণাকুণ্ডুতে হামলা চালিয়ে এক পুলিশ হত্যা ও ১০ পুলিশকে আহতের ঘটনায় প্রায় দুশ জনের নাম উল্লেখ করে ৬ হাজার জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ ১২ জন গ্রেফতার করেছে। এদিকে কর্তব্যে অবহেলা ও ব্যর্থতার দায়ে হরিণাকণ্ডু থানার ওসি রেজাউল ইসলামকে পুলিশের খুলনা রেঞ্জ অফিসে ক্লোজ করা হয়েছে বলে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, শহরের বাসটার্মিনাল এলাকায় হরতাল সমর্থনকারী ও বিরোধীদের মধ্যে হামলা পাল্টা হামলা, বাড়ি-ঘর ভাংচুর, মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসময় মহিলা শিশুসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে যুবলীগ কর্মী মাসুম ও মিন্টুকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের স্থানীয় বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
রাঙ্গুনিয়া সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর এবং ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে হরতাল পালিত হয়েছে। সকালে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের পোমরা আমিরাত গেটের নিকটে একটি পিকআপে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে পিকেটাররা। এছাড়া মরিয়মনগর ডিসি সড়কের ছাগলখাইয়া দীঘির নিকেট একটি জীপ ভাংচুর করে তারা।
চান্দিনা ও বুড়িচং (কুমিল্লা) সাংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার চান্দিনায় ফের পুলিশের উপর হামলার চেষ্টা চালায় জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা। এসময় পুলিশ ৩৪ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তবে এ ঘটনায় হতাহত হয়নি এবং কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দাগনভূঞা (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, বসুরহাট সড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ ও ফেনী-মাইজদী সড়কের বাংলাবাজারে বেশ কিছু গাড়ি ভাংচুর করেছে পিকেটাররা। দাগনভূঞা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নিজামউদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পুলিশ-বিজিবির সংঘর্ষের ঘটনায় পৃথকভাবে গোদাগাড়ী থানায় ২টি মামলা হয়েছে। রবিবার রাতে থানার উপ পরিদর্শক আতাউর রহমান ও নুরুজ্জামান বাদি হয়ে পুলিশের উপর হামলা ও দুইজনকে হত্যার অভিযোগ এনে মামলা দুটি দায়ের করেন। দুই মামলায় ৪-৫ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এদিকে উপজেলায় ১৪৪ ধারা বহাল রয়েছে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার ঘটনায় সদর থানায় ৭টি এবং শিবগঞ্জ থানায় ২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ১১ হাজার ২২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর থানায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে মোট ১২ জন।
জেলা পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক জানান, সদরের ৫টি পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনায় আরো মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনায়ও মামলা করা হবে।
গফরগাঁও সংবাদদাতা জানান, সন্ধ্যায় উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ইসমাইল হোসেন সোহেল ও জামায়াতের রোকন টাংগাব ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিনের বাসায় হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগে তারা আলাদা সশস্ত্র মিছিল বের করে। পরে পৌরশহরের পাটমহল মোড়ের উপজেলা বিএনপি কার্যালয় এবং শিবগঞ্জ রোডের বিএনপি কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে তারা।
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই সহোদর ঘটনাস্থলেই নিহত ও গুরুতর আহত হয়েছেন। সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে কলারোয়ায় সরসকাটি সড়কের ওফাপুরে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন উপজেলার কামারালী গ্রামের মৃত রহিম বক্স মোড়লের ছেলে স্থানীয় ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি মো. আরিফ বিল্লাহ (৪০), তার বড় ভাই কৃষক মো. রুহুল আমীন (৪৫)। গুলিবিদ্ধ অন্যারা হলেন সামসুর রহমান, আবু রহমান, মতিয়ার, মোতালেব ও মিলন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে গুলিতে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা ওফাপুর গ্রামের আ’লীগ নেতা মুনছুর গাজীর বাড়িতে, সরসকাটি সোনার বাংলা ক্লাবে ও বৈদ্যপুর গ্রামের শহরআলী খাঁর বাড়িতে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। আইন-শৃংখলা স্বাভাবিক রাখতে বেলা ১২টা থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কলারোয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও কলারোয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) সরদার মোশাররফ হোসেন জানান, সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ওফাপুরে রাস্তার উপর কাঠের গুঁড়ি ফেলে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করে। খবর পেয়ে সরসকাটি ফাঁড়ির পুলিশ অবরোধ তুলে দেয়ার চেষ্টা করলে হরতাল সমর্থকরা তাদের উপর ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এ সময় তারা পুলিশ ফাঁড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিলে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সরে আসে। পরে সাতক্ষীরার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামিম হাসানের নেতৃত্বে কলারোয়া থানা পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ওফাপুর মোড়ে পৌঁছলে ৮/৯শ’ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও সমর্থক তাদের উপর হামলা করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে বিজিবি সদস্যরা ১৯ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। বিজিবির ছোঁড়া গুলিতে আরিফ বিল্লাহ ও রুহুল আমীন মারা যান ও অপর ৫ জন আহত হন।
কলারোয়া থানার অফিসার ইনচার্জ সিকদার আক্কাস আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ঘটনার সময় পুলিশ ২৭ রাউন্ড রাবার বুলেট, ০৭টি টিআর সেল ও বিজিবি ১৯ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, উল্লাপাড়ার পাবনা-বগুড়া মহাসড়কের পূর্ব দেলুয়া জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্কুলছাত্র মাহফুজুর রহমান (২২) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো ৩ জন গুলিবিদ্ধিসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। হরতাল চলাকালে সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মাহফুজ উপজেলার ফলিয়া গ্রামের আব্দুল আজিজের পুত্র এবং কালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। এ ঘটনায় বগুড়া-আরিচা মহাসড়কের বালসাবাড়ী থেকে শুরু করে বোয়ালিয়া এলাকা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে জামায়াত-শিবির কর্মীরা লাঠি মিছিল বের করলে পুলিশ বাধা দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি করে। এ সময় গুলিবিদ্ধি হয়ে ঐ শিবির কর্মী নিহত হয়। আহতদের উল্লাপাড়া জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে হরতাল সমর্থকরা সদর উপজেলার বা ঐতারা এলাকায় মসজিদের মাইক দিয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীকে ডেকে উত্তেজিত করে একটি সেতু অচল করে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পিকেটারদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। জেলা সদরের ৪টি পয়েন্টসহ রায়গঞ্জ, তাড়াশ, উল্লাপাড়া ও কাজিপুরে ১৪৪ ধারা বলবত্ রয়েছে।
বরিশাল অফিস জানায়, জেলা সদরের লাকুটিয়া সড়কের বাঘিয়ায় জামায়াত-শিবিরের সাথে পুলিশ-ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষে পুলিশ ও ছাত্রলীগ কর্মীসহ ২০ জন আহত হয়েছে। এসময় পিকেটাররা দু’টি মোটর সাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের গাড়িসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে। হামলায় আহত বিমানবন্দর থানার সেকেন্ড অফিসার আবুল খায়ের ইত্তেফাককে জানান, সকাল ৭টার দিকে হরতাল সমর্থনকারীরা লাঠিসোঁঠা নিয়ে মিছিল বের করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় মিছিলকারীরা পুলিশের উপর হামলা চালায়। এতে তিনিসহ এএসআই খোকন ও কনস্টেবল রহমান আহত হন। পুলিশ ৩ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে পিকেটাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
পরে জামায়াত-শিবির কর্মীরা পুনরায় সংঘটিত হয়ে পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে সেখানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থান নিলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে যুবলীগ নেতা সোলায়মান, ফয়সাল, লিখন, রিয়াজ ভূইয়া, টিটুসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তাদেরকে শিবির কর্মীরা কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। মুমূর্ষ অবস্থায় সোলায়মান ও ফয়সালকে শেবাচিম হাসপাতলে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশের গাড়ি ভাংচুর ও হামলার ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের কমলগঞ্জ উপজেলার বালিগাঁও এলাকায় রেলপথে আগুন এবং ভাটেরা রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে হরতাল সমর্থনকারীরা গাছ কেটে ফেলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। রবিবার রাতে এ ঘটনা ঘটলে রাত ১টায় পুলিশ আগুন নিভিয়ে দেয়। সোমবার ভোরে গাছ সরিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হতে দুই ঘন্টা বিলম্ব হয়। এ সময় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর কালনি এক্সপ্রেস মাইজগাঁও স্টেশনে, সিলেটগামী জালালাবাদ এক্সপ্রেস কুলাউড়া স্টেশনে ও সিলেটমুখী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন শমশেরনগরে আটকা পড়ে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, হরতাল চলাকালে শহরে হরতাল সমর্থকরা কমপক্ষে ২০টি হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এ সময় ৪/৫ রাউন্ড গুলির শব্দ পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হরতাল সমর্থকরা ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট রেলপথের স্লিপারে আগুন দেয়। এতে কয়েকটি স্লিপার আগুনে পুড়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভায়। এর পরই শহরের টিএ রোড, কলেজ রোডসহ বেশ কয়েকটি স্থানে হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আনোয়ার হোসেন (৫০) নামে এক পথচারী আহত হন। রেলগেট এলাকায় পর পর বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ পাওয়া যায়। এ সময় ২০টি অটো রিক্সা ভাংচুর করে পিকেটাররা। এ ঘটনায় শহর জুড়ে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
কুলাউড়া সংবাদদাতা জানান, হরতাল সমর্থকরা কুলাউড়া-ছকাপন রেলস্টেশনের মধ্যে ফানাই রেল ব্রীজের স্লিপারে অগ্নিসংযোগ করে। ফলে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী আন্তঃনগর উপবন ট্রেন কুলাউড়া স্টেশনে আটকা পড়ে। খবর পেয়ে রেল পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলে ২ ঘন্টা বিলম্বে উপবন গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করে। এছাড়া সকালে কুলাউড়া-সিলেট সেকশনের ভাটেরা রেলস্টেশনের মুমিনছড়া চা-বাগানের কাছে হরতাল সমর্থকরা রেললাইনের উপর গাছের গুঁড়ি, পাথর ও লাইনের পাশে রাখা রেলপাত ফেলে ট্রেন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে । ফলে ঢাকাগামী আন্তঃনগর কালনি ট্রেনসহ এই সেকশনে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর চলাচল ৩ ঘন্টা বন্ধ থাকে।
পাবনা প্রতিনিধি জানান, সকাল ১০টার দিকে পাবনা সদর উপজেলার বাঙ্গাবাড়িয়ায় ঝাড়ু মিছিল করেছে মহিলা জামায়াত কর্মীরা। সাঈদীর মুক্তির দাবিতে মহিলা জামায়াত কর্মীরা মিছিল নিয়ে পাবনা-নগরবাড়ি মহাসড়ক অবরোধ করে।
সকাল থেকে পাবনা-নগরবাড়ি ও দাশুড়িয়া-লালন শাহ সেতু মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে রাস্তার মাঝে গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ইট পাটকেল ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখে হরতালকারীরা।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে আনোয়ার (২৪) ও রেজাউল করিম (২৩) নামে ২ ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া উভয় পক্ষের ১০ জন আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধরা শিবির কর্মী বলে দাবি করেছেন উপজেলা জামায়াত আমীর আবু তাহের। হরতালে উপজেলায় আরো কয়েকটি স্থানে পুলিশের সাথে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা হরতালের বিরোধী মিছিল সমাবেশ করেছেন।
এছাড়া রবিবার গভীর রাতে মহাসড়কের এস কে এম জুট মিল গেইটের সামনে একটি তেলের ড্রামে আগুন লাগিয়ে দেয় হরতাল সমর্থনকারীরা। সোমবার সকালে নুনাছড়া এলাকায় উত্তর ইয়াকুব নগরের একটি মুরগির ফার্মেও আগুন দেন তারা।
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রবিবার রাত সাড়ে ১০টায় জামায়াত-শিবিরের লোকজন হঠাত্ ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় তারা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে ৫-৬টি হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে তারা মহাসড়কের উপর টায়ার ও খড়-কুটো জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। এ সময় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধাওয়া দিলে ওরা পালিয়ে যায়। পরে রাত সাড়ে ১১টায় যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, হরতাল চলাকালে বিকালে শহরে ৭/৮ মোটর সাইকেলসহ কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করেছে বিএনপি নেতা-কর্মীরা। এ সময় তারা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে টাঙ্গানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। হরতাল সমর্থনকারীরা জেরপা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টার মার্কেটে হামলা চালালে পুলিশ ১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে তারা ২টি ব্যাংকসহ ৬টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। কোতয়ালী থানার ওসি শাহবুদ্দিন খলিফা ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও ফুলবাড়ী সংবাদদাতা জানান, উপজেলার নাওডাঙ্গা বালারহাট বাজারে সকালে ঝটিকা মিছিল করে ভাংচুর ও তাণ্ডব চালিয়েছে জামায়াত-শিবির। এ সময় তারা বাজারের ১৫/২০টি দোকান ভাংচুর ও মালামাল লুট করে। তারা উপজেলার সদর থেকে বালারহাট পর্যন্ত রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে জামায়াত কর্মী আব্দুল জলিল ও ভারতীয় নাগরিক আব্দুল কুদ্দুস খন্দকারকে (৫৮) গ্রেফতার করে। তাদের দ্রুত বিচার আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী বাদী হয়ে ফুলবাড়ী থানায় দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেন। মামলায় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।