বাংলাদেশের পাশে থাকব একাত্তরের মতোই
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০১৩, ২২:৫০
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদান ও সহায়তার স্বীকৃতি হিসাবে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণব মুখার্জিকে সম্মাননা তুলে দেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মাননার জবাবে প্রণব মুখার্জি বলেন, একাত্তরের মতোই ২০১৩ সালেও ভারতের জনগণ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে থাকবে। আমরা আপনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত মিলিয়ে চলব। আমরা উভয়েই একই অবিভক্ত সভ্যতার উত্তরসূরী।
রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান অনুষ্ঠানে বলেন, একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য প্রণব মুখার্জিকে জাতি শ্রদ্ধাভরে ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করবে। জাতীয় ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে প্রণব মুখার্জিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রণব মুখার্জি অসামান্য অবদান রাখেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিভিন্ন মহলের বাধা উপেক্ষা করে প্রণব মুখার্জি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় ও সাহসী অবস্থান নেন। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।
সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বঙ্গভবনে উপস্থিত হয়ে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
পরে দরবার হলে শুরু হয় ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠান। শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হয়। সাইটেশন পড়েন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভুঁইয়া। অনুষ্ঠানে দুই দেশের রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন।
রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি অনুষ্ঠানের মধ্যমণি বন্ধুপ্রতীম ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির প্রতি।
তিনি এসময় বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ১৯৭১ সালে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, “আমি এ অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি-হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, আমি স্মরণ করছি-ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে এবং সেইসঙ্গে ভারতের সেই সকল বীরসেনা ও সাধারণ নাগরিকদের, যারা আমাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন উত্সর্গ করেছেন।”
এ সময় রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান প্রণব মুখার্জিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “হে মহান অতিথি! আপনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনার অবিস্মরণীয় অবদান জাতি কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করে থাকে।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসে আপনার নাম, অমূল্য অবদানের কথা স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাই, আজকের এই সম্মাননা আপনার অবদানের বিনিময়ে নয়, বরং সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সবিনয় প্রয়াস মাত্র!”
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, “এ সম্মাননা ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করতে এসে এতে আবারও আপনি (প্রণব মুখার্জি) আমাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করলেন।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের দুঃসময়ের অকৃত্রিম বন্ধু! তাঁর অবদানের কথা বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।”
প্রণব মুখার্জি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সম্মাননা প্রদানের জন্য আমি আপনাদের শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যদিও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমার অবদান ছিল যত্সামান্যই! তার পরও আমি বিনম্র চিত্তে এ সম্মাননা গ্রহণ করছি।”
তিনি বলেন, “ভারত চায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকুক। ভারত দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক উন্নয়নে বিশ্বাসী। সে হিসেবে বাংলাদেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে ভারত।”
তিনি এ সময় বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান উচ্চারণ করে তিনি বলেন, “যতদিন রবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বহমান, ততদিন রবে তোমার কীর্তি শেখ মুজিবুর রহমান।”
রাতে বঙ্গভবনের ব্যাঙ্কুয়েট হলে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ও ফার্স্ট লেডি শুভ্রা মুখোপাধ্যায়।
সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন
প্রত্যাশা করেন প্রণব
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাক্ষাত্সফররত ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে জাতীয় সংসদের স্পিকার এডভোকেট আবদুল হামিদ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। গতকাল সোমবার বিভিন্ন সময়ে অন্যান্যের মধ্যে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন জাতীয় পার্টি (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রধান কাদের সিদ্দিকী। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান ও ড. গওহর রিজভী সাক্ষাত্ করেন। সোনারগাঁ হোটেলে গতকাল সন্ধ্যায় প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে স্পিকার আবদুল হামিদ সাংবাদিকদের বলেন, সংসদের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি নিজে বাঙালি। তাকে নিয়ে গর্ববোধ করি আমরা।
প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে এইচএম এরশাদ সাংবাদিকদের বলেন, সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন প্রণব মুখার্জি। তার মতে, এমন নির্বাচন হলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা সহায়ক হবে। তবে নির্বাচন কিভাবে হবে তা বাংলাদেশকেই ঠিক করতে হবে। এইচএম এরশাদের সঙ্গে পার্টির নেতা কাজী জাফর আহমেদ, রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন বাবলু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশিদ উপস্থিত ছিলেন।
রাশেদ খান মেনন বৈঠক প্রসঙ্গে বলেন, সীমান্ত হত্যা, তিস্তা ইস্যু নিয়ে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আলোচনা ও সমঝোতার উপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাক্ষাত্ প্রসঙ্গে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, শান্তিপূর্ণ সীমান্ত, বহুপাক্ষিক ট্রানজিট ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। ইতিবাচক ভূমিকার জন্য তথ্যমন্ত্রী ভারতীয় রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানান।
বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন :ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি গতকাল দুপুরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন করেন। তিনি জাদুঘরে পৌঁছলে স্বাগত জানান বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা। প্রণব মুখার্জি জাদুঘর ঘুরে দেখেন ও পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।