আমার কথা : লুত্ফর রহমান রিটন

ঊনিশ শ বায়াত্তর সালের রোদেলা এক বিকেল। এইমাত্র একটা ঘুড়ি বাকাট্টা হলো ওয়ারির আকাশে। ছাদ থেকে সেই দৃশ্য দেখামাত্র দ্রুত পায়ে সিঁড়িভাঙা শুরু। আমার পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট। পায়ে স্যান্ডেল নেই। সেই অবস্থায় দে ছুট ঘুড়ির পেছনে। ওটাকে ধরতেই হবে। ছুটে যাচ্ছি আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে। র্যাংকিন স্ট্রিট সিলভারডেল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সামনে এক লোক খপ করে ধরে ফেলল আমার হাত—এই ছেলে ওরকম ছুটছ যে, এ্যাকসিডেন্ট করবে তো! মহাবিরক্ত আমি লোকটার দিকে না তাকিয়ে, তাকিয়ে আছি ঘুড়ির দিকে। ঘুড়িটা তার সাপের মতো লেজটা দোলাতে দোলাতে আমার মন খারাপ করে দিয়ে ধরা দিল আমারই বয়েসী একজন কিশোরের হাতে। লোকটা শক্ত হাতে আমার কব্জি ধরে আছে তো আছেই। ছাড়েই না! লোকটা বলল—তোমাদের বাসা কোনটা? আমি ঘাড় বাঁকিয়ে খুব বিরক্ত ভঙ্গিতে দেখালাম—অই যে ওখানে। ছাড়ুন। তুমি ছবি আঁকতে পার? হ্যাঁ পারি। ফুল আঁকতে পারি। পাখি আঁকতে পারি। নৌকা মানুষ টেলিভিশন সব আঁকতে পারি। ছাড়ুন। লোকটা বলল—এই সিলভারডেল স্কুলের ভেতরে সপ্তাহে দুদিন ছবি আঁকার ক্লাস হয়। তোমার বয়েসী অনেক ছেলেমেয়ে আছে ওখানে, অই যে দেখ। ইচ্ছে হলে তুমিও এখানে ছবি আঁকা শিখতে পার। তুমি শুধু রাবার আর পেন্সিল আনবে। রং-তুলি-কাগজ সবকিছু আমরাই দেব। কি, শিখবে ছবি আঁকা? এতক্ষণ পরে আমি তাকালাম লোকটার দিকে। কোট টাই পরা লম্বা একজন মানুষ। মাথাভর্তি কালো চুল আর চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। অপরূপ হাসিমাখা মুখ। ঘুড়ি-টুড়ির কথা ভুলে আমিতো অবাক! এই লোক বলে কী! রং-তুলি-কাগজ সব দেবে! জানতে চাইলাম— কত টাকা লাগবে? লোকটা বলল—কোনো টাকা পয়সা লাগবে না। তুমি ছবি আঁকতে এলেই আমরা খুশি হব। আমাদের গানের ক্লাসও আছে। তুমি ওখানেও আসতে পার। কি, আসবে? খুশিতে টই-টম্বুর, আমি পিং পং বলের মতো প্রায় লাফিয়ে উঠলাম—হ্যাঁ আসব। আমি ছবি আঁকা শিখব। লোকটা বলল—তাহলে যাও গায়ে একটা শার্ট চড়িয়ে জুতো অথবা স্যান্ডেল পরে চলে এসো। একটা পেন্সিল আর রাবারও এনো কিন্তু! আমি এক ছুটে বাড়ি। আরেক ছুটে সিলভারডেল কিন্ডারগার্টেন। পরম আদরে সুদর্শন লোকটা আমাকে বসিয়ে দিল ছবি আঁকার ক্লাসে। কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার ছবি আঁকার ক্লাসে। এভাবেই আমার জীবন-পথের মোড়ে একজন দক্ষ ট্রাফিক সার্জেন্টের মতো দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা পরিবর্তন করে দিল আমার সারা জীবনের গতিপথ। লোকটার নাম রোকনুজ্জামান খান। তবে দাদাভাই নামেই পরিচিত তিনি সারাদেশে। শুরু হলো আমার ছবি আঁকা। টপাটপ কয়েকটা পুরস্কারও পেয়ে গেলাম জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক। দাদাভাই ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে আমার আঁকা ছবি ছাপালেন অনেকগুলো। আমার আঁকা ছবির পাশে দুই পাতা জুড়ে কচি-কাঁচার আসরে ছাপা হতো অনেকের ছড়া-কবিতা-গল্প। সেগুলো পড়ে পড়ে একদিন মনে হলো—আমি কেনো লিখিনা! যদি আমিও ওরকম ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে ছড়া কবিতা লিখতে পারি তাহলে দাদাভাই নিশ্চয়ই সেটা ছাপিয়ে দেবেন। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি। এক সন্ধ্যায় দাদাভাই-এর হাতে লজ্জা আর দ্বিধায় জড়সড় হয়ে গুঁজে দিলাম একটা ছড়া—পুতুলের বিয়ে। পরের সপ্তাহেই ছাপা হলো ছড়াটা কচি-কাঁচার আসরে। দাদাভাই ছড়াটা ছাপালেন এভাবে—পুতুলের বিয়ে, রিটন (বয়স ৯)। ছড়াটি ছিল এরকম—‘খুকুর পুতুলের বিয়ে/পোলাও কোরমা পেয়ে/বর আসবে পালকি চড়ে/বকুল তলা দিয়ে।/সঙ্গে আসবে লোক-লস্কর/ঢোল ঢক্কর বাজিয়ে।’—আজ একচল্লিশ বছর পর সেই স্মৃতি মনে করে আমাকে বলতেই হবে যে, সেদিন দাদাভাই ৯ বছর বয়েসী এক কিশোরের অতি নিম্নমানের দুর্বল ছড়াটি ছেপে না দিলে ছড়াকার লুত্ফর রহমান রিটনের জন্মই হতো না। ইত্তেফাকের পাতায় নিজের নামটি একজন কবি হিসেবে মুদ্রিত দেখতে পেয়ে কী যে আনন্দ হয়েছিল। বাড়িতে ইত্তেফাক রাখা হতো। কচি-কাঁচার আসরের সেই পাতাটি মেলে ধরে টেবিলের ওপর পেপার ওয়েট দিয়ে চেপে রেখেছি কিছুক্ষণ পর পর। আমি চাইছিলাম সবাই ওই পাতাটা দেখুক। তারপর অবাক বিস্ময়ে বাড়ির সকলে আবিষ্কার করুক—তাদের বাড়িতে একজন কবিও বাস করে। ছেলেবেলায় আমার স্বপ্ন ছিল আমি একজন পেইন্টার মানে শিল্পী হব। মস্ত বড় শিল্পী। জয়নুল আবেদিনের মতো শিল্পী। বালক বয়েসে কচি-কাঁচার মেলার ছবি আঁকার ক্লাসে ইজেলে কার্টিজ পেপার সাঁটিয়ে ছবি আঁকার সময় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কতোদিন আমার আঁকা ছবি কারেকশন করে দিয়েছেন—এইভাবে আঁকবা। গরুর ল্যাজটা আঁকবা এইভাবে। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ডায়ালেকেট বলতেন—লালের সঙ্গে এইভাবে হলুদ মিশাইয়া কমলা রং বানাবাইবা তারপর তুলিটা এইভাবে ধইরা এইভাবে রং করবা। তুলি চালাইতে হয় এইভাবে। আহারে কী অসাধারণ ছিল জয়নুল সান্নিধ্যের সেই রংঝলমল স্মৃতিগুলো! এর অনেক পরে আমি ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। চারুকলা ইনস্টিটিউটের টিচাররা আমাকে নেননি। লিখিত পরীক্ষায় আমাকে ফেল করাতে না পারলেও ফেল করিয়ে দিয়েছিলেন মৌখিক অর্থাত্ ভাইভা পরীক্ষায়। আমার তাই আর শিল্পী হওয়া হলো না। হতে চাইলাম শিল্পী কিন্তু নিয়তি আমাকে বানিয়ে ছাড়ল— ছড়াকার। দীর্ঘদিন আমি আঁকিয়ে হতে না পারার এই কষ্টটা বুকের মধ্যে বাজতে দেখেছি। এখন আর কষ্ট পাই না। দু’জন শিক্ষকের ষড়যন্ত্রে আমি চারুকলায় ভর্তি হতে না পারলেও শতাধিক বইয়ের লেখক হিসেবে শিশুদের অনিন্দ্যসুন্দর জগতেই তো বসবাস করছি। খুদে পাঠক বন্ধুদের বিপুল ভালোবাসা পাচ্ছি। এ প্রাপ্তিও তো অনেক বড় প্রাপ্তি। ছোটদের ভালোবাসা পাওয়া খুব সহজ কাজ নয়, আমি জানি। আর তাই আজ আমার কোনো দুঃখ নেই। লেখালেখির জন্য বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও সিকান্দার আবু জাফর সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেকগুলো পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু আমার কাছে সবচে বড় পুরস্কার ছোট্ট বন্ধুদের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার কারণেই আরো ১০০টি বই লিখতে চাই আমি ছোটদের জন্য। উল্লেখযোগ্য বই—ধুত্তরি, হিজিবিজি, শেয়ালের পাঠশালা, নাই মামা কানা মামা, বাঘের বাচ্চা, পান্তাবুড়ি, হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা, অনেকগুলো মামা, ধিতাং ধিতাং, ভূতের বিয়ের নিমন্ত্রণে, গনেশ ধনেশ রণেশ এবং ভূতের বাচ্চা।