লক্ষ্য এখন চলচ্চিত্র
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪১
শোবিজ জগতে তার পথচলা দীর্ঘ সময়ের। শুধু মডেলিং ও অভিনয় নয়, উপস্থাপনাতেও ফারাহ রুমা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় অভিনয় করেন নারগিস আকতারের পরিচালনায় ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ চলচ্চিত্রে। ছবিটি শিগগিরই মুক্তি পাবে। সেইসাথে নতুন আরেকটি চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হতে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিভাময়ী এই অভিনেত্রীর বর্তমান কাজ ও আগামীর ভাবনা নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
অভিনয়কে ভালোবাসেন যারা, তাদের সবারই একটা স্বপ্ন থাকে একদিন চলচ্চিত্রে অভিনয় করবেন। তেমনি স্বপ্ন ছিল ফারাহ রুমার মনেও। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতেই তিনি রুপালি পর্দায় নাম লিখিয়েছেন। তবে কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মতো যোগ্য করে তোলার পর। অভিনয় ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তিনি নিজের একটা দর্শন মেনে পথ চলছেন। আর তা হলো অনেক বেশি কাজ করার চেয়ে একটু কম কাজ করবেন। সংখ্যার চেয়ে তিনি কাজের মানের দিকে বেশি নজর দেন। এর ফলে কাজ নিয়ে কখনও তার মাঝে কোনো অস্থিরতা দেখা যায়নি। ফারাহ রুমার ভাষ্যে, ‘আমি কখনও এমনটি চাইনি যে, আমাকে অনেক অনেক নাটকে অভিনয় করতে হবে, সব সময় টিভিপর্দায় নিজেকে দেখতে হবে—এই ভাবনা আমাকে কখনও তাড়া করেনি। আমি আসলে নিজেকে দেখতে চেয়েছি ভালো কাজের একজন অভিনেত্রী হিসেবে।’ অভিনয় ও মডেলিং দুই এরিনাতে কাজ করে সফল হয়েছেন ফারাহ রুমা। ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রুপালি পর্দায় তার যাত্রা শুরু হয়েছে। নারগিস আকতারের পরিচালনায় এই ছবিতে রুমার বিপরীতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন ওমর আয়াজ অনি। সেই সাথে অভিনয় করেছেন ববিতা। বর্তমানে ছবিটি মুক্তিপ্রতীক্ষায় রয়েছে। চলচ্চিত্রে অভিনয় সম্পর্কে রুমা বলেন, ‘অনেক দিন ধরে চলচ্চিত্রের কাজ করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেভাবে ব্যাটে-বলে মিল না হওয়ার কারণে অভিনয় করা হয়নি। তবে সিদ্ধান্তটি হঠাত্ করেই নেওয়া হয়েছে। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খুবই ভালো লেগেছে। আর গল্পটা অসাধারণ লেগেছে। তা ছাড়া প্রথম ছবিতে নারগিস আকতারের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’ কাজের প্রতি শ্রদ্ধা আর সময়ের ব্যাপারে তার সচেতনতাই তাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। একজন অভিনেত্রী হিসেবে নাটকের কোনো স্ক্রিপ্ট হাতে এলে তখন কাজটা নিয়ে স্বপ্ন কেমন থাকে জানতে চাইলে ফারাহ রুমা বলেন, ‘নতুন কাজ হাতে এলে অবশ্যই তা নিয়ে একটা স্বপ্ন তৈরি হয়। তবে আমাদের দেশে মিডিয়ায় নিজের মতো করে কাজ করতে চাইলেও তা সম্ভব হয় না। তারপরও চরিত্র নিয়ে ভাবি। শুটিংয়ের সময় চরিত্রটা নিজের মধ্যে লালন করে ভালো কিছু করার চেষ্টা করি।’ কাজ নিয়ে স্বপ্ন পূরণ না হলে তা কীভাবে মেনে নেন? জবাবে রুমা মৃদু হেসে বলেন, ‘সব কাজেই যে অতৃপ্তি থাকে তা নয়। কিছু কিছু নাটকে কাজ করে আত্মতৃপ্তি হয়েছে। কোনো কাজ করতে গিয়ে যদি বুঝতে পারি যে এখানে আত্মতৃপ্তির জায়গা নেই, তখন ওভারঅল কাজ করে চলে আসি। আর অতৃপ্তির জায়গাটা আমার কিছুটা বেশি, কারণ কাজ নিয়ে আমার স্বপ্নের জায়গাটা অন্যরকম। যে রকম স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে চাই, তা হয়তো নানা কারণে করতে পারি না।’
অভিনয় না মডেলিং কোনটি বেশি ভালো লাগে? উত্তরে রুমা বলেন, ‘আমি প্রতিটি এরিনাতে কাজ করে আনন্দ পাই। মডেলিংয়ে অল্প সময়ে দর্শকের কাছে যাওয়া যায়। উপস্থাপনায় নিজস্ব স্টাইলে স্বাধীনভাবে কাজ করা যায়। আর অভিনয় হলো আমার ভালো লাগার জায়গা। অভিনয়ের ক্ষেত্রটি হলো—একটি পূর্ণ প্যাকেজ। এখানে সবকিছু জানতে হয়। তাই অভিনয়টা বেশি ভালো লাগে।’ আপনি তো অনেক দিন থেকে মিডিয়ায় কাজ করছেন। সময়ের সাথে সাথে ভাবনার বদল হয়। বর্তমানে কাজ নিয়ে আপনার ভাবনাটা কেমন? রুমা স্বভাবসুলভ সুন্দর একটি হাসি উপহার দিয়ে বলেন, ‘ভাবনার অবশ্যই অনেক চেঞ্জ হয়েছে। প্রথমের চেয়ে অনেক পরিবর্তন হয়েছে ভাবনা ও কাজের। প্রথম দিকে পরিচালকদের ওপর পুরোটা নির্ভরশীল ছিলাম। এখন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। নিজের প্রতি আস্থা বেড়ে গেছে। কোনো চরিত্র নিয়ে ভাবলে সহজেই তার ভেতরে ঢুকতে পারি এবং সেভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করি।’
সহশিল্পীদের অভিনয় দেখে কমপ্লিমেন্ট জানানো প্রসঙ্গে রুমা বলেন, ‘যদিও সবার কাজ দেখা উচিত। তবে শুটিং থাকলে দেখা হয় না। কোনো নাটক সুন্দর হলেই তা দেখি। ভালো লাগলে ফোন দিয়ে তাদের অভিনয় নিয়ে কমপ্লিমেন্ট জানাই।’ ছোটপর্দায় প্রথম অভিনয় করেন ২০০১ সালে আফজাল হোসেনের বিপরীতে টেলিফিল্ম ‘সাঁকো’তে। পরবর্তীতে অভিনয় করেন অসংখ্য মানসম্পন্ন নাটকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো ‘সম্পূর্ণ রঙিন’, ‘অনুরাগ’, ‘শ্যাওলা’, ‘প্রত্ননারী’, ‘সিন্দুক’, ‘নগরে দৈত্য’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘শুভদৃষ্টি’, ‘নদিয়া’, ‘ফ্রেমে বাঁধানো ফ্রেম’, ‘সম্পূর্ণ রঙিন’, ‘৭৩ নম্বর’, ‘একটা কিনলে একটা ফ্রি’, ‘পথ জানা নেই’, ‘অহংকার’ প্রভৃতি। বর্তমানে ফারাহ রুমা অভিনীত চারটি ধারাবাহিক নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। এগুলো হলো—এটিএন বাংলায় ওয়াহিদুজ্জামান ডায়মন্ডের পরিচালনায় ‘কয়েকটি অমীমাংসিত গল্প’, এনটিভিতে গোলাম মোস্তাফা শিমুলের ‘মায়ানিকন’, আরটিভিতে শেখ সেলিমের ‘মাকড়সা’ ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে সাইফুল ইসলাম মান্নুর ‘থার্ড জেনারেশন’। খুব শিগগিরই প্রচার শুরু হবে আরও দুইটি ধারাবাহিক নাটক। এরমধ্যে রয়েছে সকাল আহমেদের পরিচালনায় ‘সত্য পাহাড়’, যা প্রচার হবে বাংলাভিশনে এবং দেবাশীষ বড়ুয়া দীপের পরিচালনায় ‘চার কন্যা’, যা প্রচার হবে একুশে টেলিভিশনে। সামনে আরও কয়েকটি নতুন ধারাবাহিক ও এক খণ্ডের নাটকে কাজ করবেন। অন্যদের মতো বিশেষ এক ধারার কাজের প্রতি ফারাহ রুমাও খানিকটা দুর্বলতা অনুভব করেন। আর তা হলো, এই নায়িকা সাহিত্যনির্ভর কাজকে একটু আলাদাভাবেই গ্রহণ করেন। সাহিত্যধর্মী নাটকের প্রসঙ্গটি ওঠতেই মৃদু হেসে রুমা বলেন, ‘এ ধারার কাজের সময় আমরা সাধারণত একটু আলাদা প্রস্তুতি নিই। কারণ, এ ধরনের কাজের সবকিছুই আলাদা। সময়টাকে ধরা এই জাতীয় কাজের জন্য একটু চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আমি যখন সাহিত্যনির্ভর কোনো কাজ করি, তখন অন্য কাজের চেয়ে একটু বেশিই সিরিয়াস থাকি। এ ঘরানার কাজ সব সময় আমার ভাবনার ভিন্ন জায়গায় কড়া নাড়ে। আমি যখন রবীন্দ্রনাথ বা বিভূতিভূষণের কোনো বই পড়ি, তখন কল্পনায় সেই চরিত্রে নিজের রূপদান করি। সত্যি বলতে কী, সাহিত্যের কাজের প্রতি আমার ভীষণ রকমের দুর্বলতা রয়েছে।’
অভিনয়টাকে তিনি শিল্প হিসেবেই দেখেন। তার ভাষ্যে, ‘অভিনয়টা সাধারণ কোনো কাজ নয়। এটি একটি শিল্প। আর এই শিল্প তিলে তিলে গড়ে তোলে অভিনয়শিল্পীরাই। তাই শিল্পের মান রক্ষায় অভিনয়শিল্পীদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়। মাত্রাতিরিক্ত শুটিং ব্যস্ততা কাজের মান খারাপ করে দেয় কি না এ প্রসঙ্গে রুমা বলেন, ‘কিছুটা তো করেই। তবে এর বেশির ভাগটাই নির্ভর করে শিল্পীর ওপর। শিল্পী কীভাবে তার ব্যস্ততাকে সমন্বয় করে তার ওপর এবং মানের বিষয়টি নির্ভর করে। যারা অধিক ব্যস্ত হয়েও সমন্বয়টা করতে পারে তাদের অভিনীত নাটকগুলোর মান অতটা নিচে নামে না যতটা বলা হয়। আমি চেষ্টা করি সমন্বয় করে চলার। কতটা সফল তা দর্শকরাই বলতে পারবে।’
অভিনয়ের বাইরেও ফারাহ রুমাকে সপ্রতিভ ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে উপস্থাপনায়। তার প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় এনটিভির ‘আমারও গাইতে ইচ্ছে হলো’ অনুষ্ঠানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একটি এক খণ্ডের নাটক পরিচালনা করেছিলেন বেশ আগে। আবারও পরিচালনা করার ইচ্ছা আছে কি না জানতে চাইলে রুমা বলেন, ‘নিজেকে সেভাবে যোগ্য করে তৈরি করতে পারলে পরিচালনায় আসতে পারি।’ ফারাহ রুমা অভিনীত তার প্রথম ছবি মুক্তি না পেলেও নতুন আরেকটি চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হতে যাচ্ছেন তিনি। চলচ্চিত্রে নিয়মিত হচ্ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বড়পর্দায় অভিনয় নিয়ে আমার আলাদা ধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়েছে। তাই এখন চলচ্চিত্রের দিকে আমার মনোযোগ। পাশাপাশি টিভি নাটকেরও কাজ করে যাব নিয়মিত।’