নয়াপল্টনে পুলিশের গুলি বিএনপির সমাবেশ পণ্ড

গতকাল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যা-লয়ের সামনে দলের বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব আমানুল্লাহ আমান ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালামসহ ৩১ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশের গুলি, টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও লাঠিপেটায় পাঁচ সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন শতাধিক। এদের অধিকাংশ ছররা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। বিএনপি কর্মী কালাম, জাহেদ, রফিকুল, শামীম, নাসিম, জিয়াউল, জায়েদা, সোহেলের অবস্থা গুরুতর। আহত সাংবাদিকরা হলেন- দৈনিক ইত্তেফাকের ফটো সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম, নয়া দিগন্তের রিপোর্টার নূর হোসেন, বাংলানিউজ ২৪ এর ফটোসাংবাদিক বাদল, ইন্ডিপেন্ডেন্টের নাইম আহমেদ জুলহাস ও নিউ এজের আলী হাসান মিন্টু। পুলিশি হামলায় বিক্ষোভ সমাবেশ পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ-র্যাবের সঙ্গে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে নয়া পল্টন হয়ে কাকরাইল-বিজয়নগর-মালিবাগ, অপরদিকে ফকিরেরপুল পর্যন্ত বিরাট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে যোগ দেয় জামায়াত-শিবির কর্মীরাও। সৃষ্টি হয় চরম আতংকজনক পরিবেশের। যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ নজরুল ইসলাম খানকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে পুলিশের ‘নারকীয় তাণ্ডবের’ প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার সারাদেশে বিএনপি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয় বেলা তিনটায়। তার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা-কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে এখানে জমায়েত হন। চারটার মধ্যে এক বিশাল সমাবেশে রূপ পরিগ্রহ করে। সমাবেশের বিস্তৃৃতি একদিকে পলওয়েল মার্কেট অপরদিকে স্কাউট মার্কেট সম্মুখস্থ অবধি পৌঁছে। বিকাল সাড়ে চারটায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য দিচ্ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র নেতারা। এসময় অদূরে স্কাউট ভবনের সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এরপরই নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তার মধ্যেই সমাবেশকে লক্ষ্য করে ফকিরাপুল মোড় এবং নাইটিংগেলের মোড় থেকে পুলিশ আমর্ড কার থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সভার মঞ্চের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। একইসঙ্গে পুলিশ-র্যাব বিএনপি নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে। এসময় বিএনপির সমাবেশে উপস্থিত লোকজন দিগ্বিদিক ছুটাছুটি শুরু করে। ফলে সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। মঞ্চে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব আমানুল্লাহ আমান ও মহানগর বিএনপি’র সদস্য সচিব আবদুস সালাম সহ ৩১ জন গুলিবিদ্ধ হন। আবদুস সালামের ঘাড়ে গুলি লেগেছে। জামায়াত দায়ী : পুলিশ :মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত কমিশনার মেহেদি হাসান সাংবাদিকদের কাছে বিএনপির সমাবেশ ভণ্ডুল হওয়ার জন্য জামায়াত শিবিরকে দায়ী করেছেন। মেহেদি হাসান জানান, সমাবেশ চলার সময় স্কাউট ভবনের সামনে জামায়াত শিবিরের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় পুলিশ পাল্টা অ্যাকশনে যায়। তিনি বলেন, আমাদের সকাল থেকেই আশঙ্কা ছিল জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা বিএনপির সমাবেশ থেকে নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা নাশকতার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছিলেন। ফিরে দেখার কিছু নেই:ফখরুল :বিএনপির সমাবেশে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি। গতকাল তাত্ক্ষণিক ব্রিফিং করে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে এই হামলায় অংশ নেয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ক্যাডার বাহিনী। তারা বিভিন্ন গলির ভেতর থেকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর গুলি চালায়। মির্জা ফখরুল বলেন, গত কয়েকদিনে সারাদেশে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সশস্ত্র যুবলীগ, ছাত্রলীগের হত্যা, নির্যাতন, উত্পীড়ন, মামলা, হামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে গতকাল ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। দলের নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বক্তব্য রাখার পর সভার শেষ পর্যায়ে আকস্মিকভাবে বিনা উস্কানিতে পুলিশ-র্যাব সমাবেশের ওপর উন্মত্তের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশ-র্যাবের পাহারায় আওয়ামী যুবলীগ-ছাত্রলীগ সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও আজকের এই হামলায় অংশগ্রহণ করে। তারা বিভিন্ন গলি থেকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে ও বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। সমাবেশকে লক্ষ্য করে ফকিরাপুল মোড় এবং নাইটিংগেলের মোড় দুই দিক থেকে পুলিশ আমর্ড কার থেকে বৃষ্টির মত গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সভার মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসে। এরই সাথে পুলিশ-র্যাব বিএনপি নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে অবিরাম টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে থাকে। মির্জা ফখরুল বলেন, পুলিশের গুলিতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, ঢাকা মহানগর বিএনপি’র সদস্য সচিব আবদুস সালাম, যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি এডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীসহ দেড় সহস্রাধিক নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন। গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, সর্বব্যাপী দুর্নীতি, লুটপাট এবং দখলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে হত্যা আওয়ামী লীগের নিত্যদিনের খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন কঠিন ও চূড়ান্ত প্রতিরোধে এদের পতন ঘটানো ছাড়া মানুষের আর কোনো গত্যন্তর নেই। আর ফিরে দেখার কিছু নেই। গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে আহবান এখন দেশের সর্বত্র ব্যারিকেড গড়ে তুলতে হবে।