চিত্রপ্রদর্শনী

কোমল রেখার সৌন্দর্য

রেখা, রং ও বুনটের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে সাঁকো গ্রুপের ‘আমাদের কথা’ শীর্ষক যৌথ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে নারীর বিবিধ অভিব্যক্তিসহ প্রকৃতির নানাবিধ অনুষঙ্গ প্রাধান্য পেয়েছে। সংগত কারণেই ছবিগুলোর বিষয় হিসেবে নারীর উপস্থিতির কারণ, নির্মাতাগণ প্রায় সকলেই নারী শিল্পী। এবং ঠিক এই কারণেই নারীর একান্ত গল্পগাথার এক দ্বিমাত্রিক প্রকাশ এই ছবিগুলোতে রয়েছে। বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ, রৈখিক বিন্যাস এবং আধাবাস্তবতার সাথে পটভূমিতে একপ্রকার গল্প সৃষ্টির প্রয়াস নতুন নয়। তবে এটা সত্যি যে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে কেন্দ্র করে এই প্রয়াস তথাকথিত মিডিয়া উল্লম্ফনের বাইরে একটা নতুন মাত্রা। ফরিদা জামান এবং কনক চাঁপা চাকমার কাজ তাঁদের প্রথাসিদ্ধতার বাইরে নতুন কোনো সংলাপ নয়। নিজেদের সৃষ্ট স্টোরিওটাইপের বাইরে নতুন কোনো গল্পও তাঁরা উপস্থাপন করেননি, যদিও মাধ্যমগত ভিন্নতায় নতুন একটা গন্ধ পাবেন দর্শককুল। ফরিদা জামানের ‘সুফিয়াস ড্রিম’ বিপরীত রেখার সমন্বয়ে সৃষ্ট। সারফেসের সাথে লেপ্টে থাকা রেখা এবং প্রোফাইল আকারে জেগে ওঠা রেখার ভেতর টানটান অনুভূতি এবং অঙ্গবিন্যাসে রয়েছে এক পরম আত্মবিস্তারের বাসনা। লক্ষ করলে বোঝা যায়, নারীর অবস্থান এবং তার সপ্নের ভেতর রয়েছে বিস্তর ফারাক। কনক চাঁপার কাজে যথারীতি পাহাড়ি ললনার উপস্থিতি, তার অলঙ্কার, পেছনে বিপর্যস্ত রেখার ঘরবাড়ি, কাটাকাটা আলো—এসব। নাসরিন বেগমের ‘মালালা’ এবং নাঈমা হকের ‘শি’ এই দুটি ছবির নারীচোখ এবং অভিব্যক্তি অভিমানী এবং মৃদু সংক্ষুব্ধ। নাঈমা হকের কাজে নারীদেহের পোশাক লতানো এবং আলঙ্কারিক। নাসরীন বেগমের কাজে আবক্ষ নারীমুখ অত্যন্ত সরল। পোশাকের গড়ন রেখা ও ডটে। পটভূমিতে কাঁথার নকশা এবং টোন ব্যবহূত হয়েছে। কুহু প্লামন্দনের নারীমুখ ট্র্যাডিশনাল—বৌদ্ধিক নির্লিপ্ততায় চোখের ধরন অনেকটাই ধ্যানস্থ। একটা সার্কেলের ভেতর অবস্থিত নারী এবং তার নৌকা ভাসানোর গল্প আছে ফারিহা জেবার কাজে। ফারজানা ইসলাম মিল্কির ‘ওয়েটিং’ অনেকটাই আমাদের পরিচিত ফরম্যাটের ধারায় উপস্থাপিত। দর্শকমাত্রই এ জাতীয় ঘরের সম্মুখভাগ, দরজা এবং ইটের টেক্সচারের সাথে পরিচিত। ফিগারের উপস্থাপনকে আউট লাইন করে দেখলে মুরের রিক্লাইন ফিগার সিরিজের কাজের কথা মনে পড়বে। রেবেকা সুলতানা মলির ‘আননোন লাভ-১’-এর নারীমুখ, পোশাক-পরিচ্ছেদের অলঙ্করণ এবং গাছ-পাতার ব্যবহারে নতুনত্ব নেই। সুলেখা চৌধুরীর ‘বিউটিফুল লাইফ’ নারীর মুখাবয়ব এবং তার চুলের ব্যাকগ্রাউন্ড পর্ণাচ্ছাদিত; প্রকৃতি-ঘনিষ্ঠ জীবনাচরণের স্মারক। যদিও ঠোঁট নির্মাণে যে রেখা ব্যবহূত হয়েছে, তাতে স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব চোছে পড়ে—অনেকটা আঁটোসাঁটো। সান্ত্বনা শাহরীনের ‘রিসম্বলেন্স টু অরিজিনালিটি’ ছবিটি বৃক্ষ, বিবিধ পাতা এবং জলের ভেতর রাজহাঁসের মগ্নতা—প্রভৃতি প্রকৃতির এক নিবিড় পাঠ। বৃক্ষ বা এই ছবির যাবতীয় অনুষঙ্গ ঠিক আমাদের দেখা জগতের মতো নয়। এক প্রকার মায়াবি নিস্তব্ধতা আছে এখানে। আফরোজা জামিল কঙ্কার ‘ফ্রম দ্যা পেজ অব মাই ডাইরি’তে মা ও শিশুর একান্ত ঘনিষ্ট মুহূর্ত প্রতিবিম্বিত। রেখা এই ছবিতে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় না থাকলেও পুরো অবয়বটিতে সুলতানের প্রভাব স্পষ্ট। ফারজানা রহমান ববির ‘সিজন-৪’ বৃক্ষ ও লতা-গুল্মের ভেতর দিয়ে আকাশ প্রকৃতি ও দিগন্ত উন্মোচিত। এই ছবিতে সেই অর্থে কোনো গল্প বলা হয়নি। একটি মুহূর্তকে যেন ধরে রাখা হয়েছে ফ্রেমের বাধ্যবাধকতায়। তাঁর সব ছবির মাধ্যম হচ্ছে এচিং অ্যাকোয়াটিন্ট। ২০০৩ সালে এই গ্রুপের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে বিবিধ ডালপালা বিস্তার করে এগিয়ে চলছে এক মহীরূহের দিকে। সম্ভবত এটাই বাংলাদেশের একমাত্র নারী শিল্পী সংগঠন, যা ধারাবাহিকভাবে শিল্পচর্চা এবং প্রদর্শনী করে যাচ্ছে। বর্তমান প্রদর্শনীটি ঢাকা আর্ট সেন্টার এবং গ্যালারি কসমসের যৌথ প্রযোজনায় আয়োজিত। গ্যালারি কসমস-২-এ পয়লা মার্চ শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ১২ মার্চ পর্যন্ত।