‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় মুঘল ইতিহাস
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৩, ১৮:৩৯
‘পাইক পহল ভালা থাকে গাছত্ বাসা বাঁধি।/ বাদশার পোলা দেশে দেশে ঘুরে কাঁদি কাঁদি\’ গাছে বাসা বেঁধে পাখিরাও ভালো থাকে, অথচ বাদশার ছেলে কেঁদে কেঁদে দেশ-দেশান্তর ঘোরে। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র চতুর্থ খণ্ডের দুটি পালা ‘পরীবানুর হাঁহলা’ এবং ‘সুজা তনয়ার বিলাপ’-এ আমরা মুঘল শাহজাদা সুজাকে পাই। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইসলাম খান মাসহাদীর পর সম্রাট শাহজাহান তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মদ সুজাকে ১৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলার সুবাদার করে পাঠান। ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে উড়িষ্যা প্রদেশেরও শাসনভার দেওয়া হয় সুজাকে। তিনি দীর্ঘ কুড়ি বছর বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন।
১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর সম্রাট শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তিনি জ্যেষ্ঠ পুত্র দারাশিকোকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন এবং সাম্রাজ্যের শাসনভার তাঁর ওপর ন্যস্ত করেন।
সুজা সে সময় রাজমহলে ছিলেন। শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের এবং চতুর্থ পুত্র মুরাদ গুজরাটের সুবাদার ছিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র সিংহাসন লাভের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম ছিল না মুঘল ইতিহাসে। কাজেই স্বাভাবিকভাবে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ভাইদের মধ্যে। আওরঙ্গজেব ও মুরাদ সংঘবদ্ধ হন। সুজার সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু রাজমহল বহু দূরে থাকায় তাঁরা সুজাকে তাঁদের সংঘের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি।
১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে সুজা রাজমহলে নিজেকে সম্রাট বলে ঘোষণা করেন এবং সসৈন্যে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি বিহারে নিজের আধিপত্য স্থাপন করেন। তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য দারাশিকো তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সুলায়মান শিকো ও রাজা জয়সিংহকে পাঠান। বাহাদুরপুর যুদ্ধে সুজা পরাজিত হন এবং মুঙ্গেরে আশ্রয় নেন। ইতিমধ্যে আওরঙ্গজেব এবং মুরাদের মিলিত বাহিনী দারার সেনাপতি যশোবন্ত সিংহ ও কাসিম খানকে ধর্মঘটের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং আগ্রার দিকে অগ্রসর হন।
১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মে দারাপুত্র সোলায়মান সুজাকে বাংলা, উড়িষ্যা ও মুঙ্গের পর্যন্ত বিহার ছেড়ে দিয়ে সন্ধি করেন। সামুগড়ের যুদ্ধে দারার শোচনীয় পরাজয়ের কথা শুনে জয়সিংহ সুলায়মানের পক্ষ ত্যাগ করেন। দিল্লি ও পাঞ্জাবের দিকে যাওয়ার পথ আওরঙ্গজেবের সেনাদের দ্বারা রুদ্ধ থাকায় সুলায়মানকে শেষপর্যন্ত কাশ্মীরের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিতে হয়। মুরাদের বিরুদ্ধ মনোভাবের পরিচয় পেয়ে মুরাদকে বন্দী করেন আওরঙ্গজেব এবং দারাকে দিল্লি থেকে বিতাড়িত করে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন।
সুজাকে বাংলা, উড়িষ্যা ও বিহারের শাসনভার অর্পণ করে সম্রাট আওরঙ্গজেব চিঠি লেখেন সুজাকে। কিন্তু সুজা তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে সিংহাসনলাভের জন্য বিহার থেকে এলাহাবাদের দিকে অগ্রসর হন। এলাহাবাদের নিকট খাজুয়া নামক স্থানে আওরঙ্গজেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র মুহাম্মদ তাঁর অগ্রগতি রোধ করেন। ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জানুয়ারি খাজুয়া প্রান্তরে আওরঙ্গজেব ও সুজার মধ্যে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে সুজা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। শাহজাদা মুহাম্মদ এবং মীর জুমলার অধীনে বিজয়ী বাহিনী সুজাকে অনুসরণ করেন। ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ মার্চ সুজা রাজমহলে আশ্রয় নেন।
মীর জুমলা বীরভূমের আফগান জমিদার খাজা কামালের সাহায্যে ঝাড়খণ্ড জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত বেলঘাটায় উপস্থিত হন। তাতে সুজা রাজমহল ছেড়ে নদীর পূর্ব তীরে তানডায় সরে যান। ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ এপ্রিল মীর জুমলা রাজমহল অধিকার করেন। সুজা গোপনে লোক পাঠিয়ে শাহজাদা মুহাম্মদকে হাত করতে চেষ্টা করেন। তিনি মুহাম্মদের সঙ্গে তাঁর বাগদত্তা কন্যার বিয়ে দিতে ও মুহাম্মদকে মুঘল সিংহাসনে বসাতে অঙ্গীকার করেন।
মুহাম্মদ ৮ জুন রাতে নদী পার হয়ে সুজার সঙ্গে যোগ দেন। বিহারের সুবাদার দাউদ খানের নৌবহরের সাহায্যে মীর জুমলা রাজমহল থেকে গঙ্গা পার হয়ে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি সামদাহে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি সুজাকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করেন। এ সময় শাহজাদা মুহাম্মদ শ্বশুর সুজাকে ত্যাগ করে সস্ত্রীক মীর জুমলার সৈন্যদলে ফিরে আসেন। সম্রাটের আদেশে মুহাম্মদকে বন্দী করে রাজধানীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
একদিকে মীর জুমলা ও অন্যদিকে দাউদ খানের সৈন্যবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুজার অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে ওঠে। সুজা তানডা থেকে জাহাঙ্গীরনগর পলায়ন করেন ১৯ এপ্রিল। এ সময় সুজার সেনাপতিরা ও স্থানীয় জমিদাররা সুজার পক্ষ ত্যাগ করেন। মীর জুমলাকে বাঁধা দেওয়ার মতো শক্তি না থাকায় এবং আরাকান রাজ্যের সাহায্যের প্রত্যাশায় সুজা জাহাঙ্গীরনগর ত্যাগ করেন ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ মে। কিন্তু আরাকানে আশ্রয় নিয়েও শেষপর্যন্ত বাঁচতে পারেননি সুজা। আরাকানিদের হাতেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়।
হতভাগ্য সুজা এবং স্ত্রী-কন্যাদের জীবনের করুণ কাহিনি সে সময় লোকের মুখে মুখে ফিরত। পরবর্তীকালে তাদের করুণ পরিণতি নিয়ে গড়ে ওঠে পালাগান বা গীতিকা। ‘সাইগরে ডুপালি পরীরে।/ হায় হায় দুঃখে মরিরে\/ কীভাবে গাহিব আমি দুঃখের বিবরণ!/ যে হালে হইল সেই পরীর মরণ\’ এভাবেই পালাগান ‘পরীবানুর হাঁহলা’র কাহিনি শুরু। পরীবানু শাহজাদা সুজার স্ত্রী। ভাইয়ে ভাইয়ে সিংহাসন নিয়ে লড়াইয়ে হেরে গিয়ে সুজা সপরিবারে চলে আসেন চট্টগ্রাম। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে চট্টগ্রাম থেকে আরও দক্ষিণ দিকে আসেন সুজা। মুড়ার (পথ) ধরে এগোন তাঁরা। পরীর ফিনফিনে পোশাক থেকে চুমকি ঝরে ঝরে পড়ে। তাদের দক্ষিণ দিকে যেতে কেউ কেউ মানা করে—‘চালার মুয়ত্ চান্যায় বাঘ্যা ঘুরায় লেজুড়ি।/ সেই পন্থে গেলে বাইঘ্যা খাইব ধরি ধরি\’ গিরিবর্তের মুখে বাঘ লেজ ঘুরায়। সে পথে গেলে বাঘে খাবে। সেখানে সাগরও আছে। সাগরে সাপ আছে—দংশন করবে। রোসাঙ্গ গেলে ধন-দৌলত সব লুট হয়ে যাবে, এমনকি প্রাণ পর্যন্ত হারাবে। পশ্চিম দিকে হার্মাদ (পর্তুগিজ দস্যু) থাকে, গলায় দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবে।
কিন্তু কারও কথা শোনে না সুজা। তের দিন তের রাত ভ্রমণ করে তারা। শেষ পর্যন্ত এক রোসাঙ্গের সহযোগিতায় সুজা-পরিবার রোসাঙ্গ এসে উপস্থিত হয়। রোসাঙ্গরাজ ভয়ে অস্থির—‘বার বাঙ্গলার বাদশা’ সুজা নিশ্চয়ই রোসাঙ্গ আক্রমণ করতে এসেছে। পরে সুজার অসহায় অবস্থার কথা জানতে পেরে দোস্তি করে রোসাঙ্গরাজ। সুজা সপরিবারে রাজার আশ্রয়ে থাকেন। একদিন হাওয়া খেতে বের হয়ে পরীকে দেখে ফেলে রাজা। দুষ্টমতি রোসাঙ্গরাজ পরীকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠে—‘আসকের মন জাইন্য বরিষার ঢল।/ পরীর লাগিয়া রাজা হইল পাগল\’ প্রেমিকের মন বর্ষার ঢলের মতো—পরীর জন্য রাজা পাগল হয়ে ওঠে। জানতে পেরে সুজা শেষ রাতে পরীকে নিয়ে পালায়। দুই কন্যা পড়ে থাকে রোসাঙ্গে। সামনে বিশাল সাগর। নৌকা দিয়ে পার হতে গিয়ে রাত শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কোথায় যাবে নতুন মাঝি—‘কন্ডে যারগর নয়া মাঝি নাইরে জ্ঞান।’ মনে মনে স্রষ্টাকে স্মরণ করেন সুজা। পরীর সাথে বোধহয় আজই শেষ দেখা। প্রচণ্ড ঢেউ ওঠে সাগরে—আকাশে লালবর্ণ সূর্য ওঠে। সুজা-পরীর জীবনের অবসান ঘটে—‘ডুপিল ডুপিল নুকা সুজা পরীজান।/ দরিয়ার মাঝে হায় দিলরে পরাণ\’
‘সুজা তনয়ার বিলাপ’-এ আমরা দেখি সুজা-কন্যার দুর্দশা। রোসাঙ্গরাজের লোভের শিকার সে। সাগরে ডুবে আত্মহত্যা করেছে সুজা-পরী, আর এদিকে তাদের অসহায় কন্যাকে বিয়ে করতে চায় রোসাঙ্গরাজ। সুজা বেঁচে থাকতে বন্ধু সেজে সুজা-পুত্রীকে নাইয়র নিয়েছিল রাজা—‘বারে বারে কইলাম বাপ নাইয়র ন-দিস মোরে’। নাইয়র যেতে চায়নি মেয়েটি অথচ আজ তাকে মগরাজার বাড়ির খাবার খেতে হচ্ছে—‘এক সোনাই রাঁধেরে ভাত বাড়ি হুদা খায়।/ বাছন ভরা নাপফি পোঁচা গিলা যে ন-যায়\’ মুঘল শাহজাদী নাপফি পোঁচা (পচা মাছ দিয়ে তৈরি একপ্রকার খাদ্য) খেতে পারে না। পরতে পারে না কারও থামি, (রোসাঙ্গ মেয়েদের পোশাক) সোনার নাধং (মগ নারীর কানের অলংকার)। অসহায় সুজাতনয়া কাঁদে—হার্মাদের দেশে কে তার খবর নেবে—‘সাইগরের তলে মা-বাপ করিলি কয়বর।/ হার্মাদ্যার মুল্লুকে আমার কে লৈব খবর\’ হার্মাদ যদিও পর্তুগিজ দস্যুদের বলা হতো আর পর্তুগিজদের দেশ পর্তুগালে আরাকানে নয়, তার পরও হার্মাদ দস্যুদের এত ব্যাপক পরিচিতি ছিল যে, সে সময় হার্মাদ বোঝাতে শত্রুকেও বোঝাত। শুধু বাংলায় নয়, আরাকানেও ছিল দস্যুদের আনাগোনা। পালাকারেরা নিরক্ষর থাকায় এবং ইতিহাস সম্পর্কে অনেকাংশে অজ্ঞ থাকায় এ বিভ্রান্তি ঘটত।
‘পরীবানুর হাঁহলা’র রস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শ্রীযুক্ত আশুতোষ চৌধুরী লিখেছেন, ‘পালাগানটাতে অতি সংক্ষেপে করুণ রসের ধারা অব্যাহত রাখিয়া সুজা বাদশাহের শেষ কয়েকটা দিনের কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। ঘটনাগুলি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক কিনা বলা যাইতেছে না, কিন্তু পরীবানুর অনুপম সৌন্দর্যই যে সুজার জীবনের এই বিসদৃশ পরিণতি ঘটাইয়াছিল, তাহাতে সংশয় নাই।’