‘মুখ না ধুয়ে লেখা কবিতা’
অতৃপ্ত আকুতির মূর্ছনা
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪০
মুখ না ধুয়ে লেখা কবিতা
মিঠুন রাকসাম
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১২
প্রকাশক :শুদ্ধস্বর
প্রচ্ছদ :শ্রাবণ
মূল্য :পঁচাত্তর টাকা
‘মুখ না ধুয়ে লেখা কবিতা’ গ্রন্থটির শিরোনাম অনেকের কাছেই অভিনব ঠেকবে। এ যাবত্কালে মুখ না ধুয়ে অনেক কবিই হয়তো কবিতা লিখেছেন, ঘুম থেকে উঠেই। কিন্তু সরাসরি সহজভাবে ‘মুখ না ধুয়ে লেখা কবিতা’ এতদিন আমাদের সামনে মেরুদণ্ডসমেত হঠাত্ দাঁড়িয়ে যায়নি কেন? এ নিয়ে যদি মনে সামান্যতম প্রশ্নের উঁকি দেখা দেয়, তাহলে কবি আমাদের জন্য হয়তো করে দিয়েছেন সেই ভাবনার অবকাশ। ২০১২ সালের একুশে বইমেলায় শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি মিঠুন রাকসামের কাব্যগ্রন্থটি। গ্রন্থের শিরোনামে দুটি কবিতা রয়েছে। প্রথমে হদিস পাবার চেষ্টা করা যাক কেন কবি মুখ না ধুয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। ‘ঘুমের ঘোরেই বুকটা ধক্ করে ওঠে/ সারাটা সকাল ঘিরে থাকে একটি মুখ/ সারাটা সকাল ঘিরে থাকে একটি প্রেম।’ একটি মুখ আর একটি প্রেমের দেখা পাওয়াতে আমরা হয়তো বা পেলাম কোনো সূত্রের সন্ধান—এ কবিতা মুখ না ধুয়ে লেখা/ ঘুমের ভাব আছে স্বপ্ন আছে
দাঁতের সাথে মাড়ি কিংবা ঠোঁটের একাত্মতা আছে।/ এ কবিতা মুখ না ধুয়ে লেখা/ ওষুধ ওষুধ ভাব আছে/ যেমন মুখ না ধোয়া থুতুর দাম আছে/ প্রতিটি সকালে মালিশ দেয়/ মাজায়-পিঠে হাতের কব্জিতে গ্রাম্য কবিরাজ/ মুখ না ধুয়ে লেখা কবিতা/ স্বপ্নের আকুতি থেকে নিজেকে বাঁচায়/ মন ভাল করে দেয়!’
স্বপ্নে যাকে হারিয়ে খোঁজেন কবি, যে ভালোবাসার মানুষটিকে ছুঁতে গিয়ে অন্যকে ছোঁন, ঘূর্ণি তোলে যে ঘোর দ্রুত ছড়ায় স্বপ্নের লালা—বাসীমুখে কেউ খেয়েছে চুমু?/ বাসী হৃদয়ে সঙ্গম?—আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়তে ছুড়তে নিজ মন্ত্রবলে স্বপ্নের আকুতি থেকে বাঁচতে, মন ভালো করতে ‘কিছুই করতে পারি না’ স্বীকার করলেও কবি আমাদের জন্য উপহার দিলেন ভালো দুটি কবিতা? প্রথম কবিতা ‘বাবার হাত’সহ অনেক কবিতাই উদ্ধৃতি দেবার মতো—বাবার হাতটা/ শৈশবের ঝিনুক/ ভেতরে আমার মুখটি আঁকা।’
মিঠুন রাকসামের কবিতায় আমরা সচারাচর অব্যবহূত উপমার সাক্ষাত্ পাই কিন্তু মনে হয় যুতসই। যেমন—উদাস হলেই/ চাগিয়ে উঠে/ পুষে রাখা স্মৃতি/ পুষে রাখা দাউদের মতো ধীরে ধীরে/ গ্রাস করে বিশ্বস্ত হূদয়! এখানে দাউদের উপমা। কবির কবিতার আরেক বৈশিষ্ট্য তাঁর স্মৃতিচারণা, স্মৃতিচারণা মান্দিপাড়ার গারো গ্রামের চুয়ের পাশাপাশি থাকা মুসলমান গ্রামের। দৃষ্টি দিলে কাব্যগ্রন্থের ভেতর এ বিষয়ক নয়টি কবিতা মেলে। এই ধারায় গারো পাড়ার মেঘ, দখলের পতাকা, গারো মদ ও প্রেম ইত্যাদি—নিচ থেকে কে যেন ডাকলো/ ‘মিটুন’ আচো’। খুব চেনা মান্দিপাড়ার স্বর (গারো বাঙাল বেয়ায় বেয়ায়) বা মান্দি গ্রাম আর চু একসাথে বেড়ে ওঠে কিংবা ‘ঠিক গারো আর মুসলমান পাড়া/ পূর্ণিমায় দেখতে ভালো/ যমজ ডালের মতো দুদিকে দুটি/ মাথা রেখে শুয়ে আছে/ অথবা রাত পোহালেই ভাসমান/ গারোপাড়া কোচপাড়া হাজংপাড়া...’ (গারোপাড়ার মেঘ)।
মিঠুনের কবিতায় ট্রেন সুন্দরী নারীর মতো ঘোর সৃষ্টি করে, যত কামরায় ঢোকে, তত নিয়ে যায় গভীরে, ঘোরায়-ভাবায় ঝকঝক করে চলে যায়। প্রেম ও কাম কবির প্রিয় অনুষঙ্গ—কখনো তা ইঙ্গিতে, কখনো প্রকটভাবেই পাঠকের চোখে ধরা পড়ে।
‘প্রেমের কবিতা ১’-এ ফসল ওঠা ক্ষেতের মতো খাঁ খাঁ করে গারো ছেলের বুক, দ্বিতীয় কবিতায় আবার দেখা হলে জানতে চাইত, এখনও কবিকে ভালোবাসে কি না। কিন্তু সেই সুযোগ কোথায় বিএসসির বউ তো এখন আর দেউড়ির বাইরেই আসে না। গারো মদ আস্তে আস্তে ধরে, প্রেমে পড়ার মতো চুমুকের পর চুমুক দিলেও মন ভরে না। পাওয়া না পাওয়ার ফারাকে মানুষের থাকে নানা আফসোস—এর থেকে কবিরও নিস্তার নেই। কবির দৃষ্টিতে মদ আর মাংস ঠিক নারীর মতো নেশা ছুটে গেলে আফসোস! ‘আমি গারো সেরা মুখে মদ আর মাংস, বুক ভরতি জ্বালা’—এই আফসোসের বিস্তার হয়তো ছড়াতে ছড়াতে গিয়ে পৌঁছায় মিঠুনের কবি মানসের বিস্তীর্ণ গারো গ্রাম পর্যন্ত যেখানে উত্সবে চলত কলাপাতা সংগ্রহ, ঘুরে ঘুরে ঢুলে ঢুলে অবিরাম ‘রেরে আজিয়া’ নাচ-গান। একদিন সাংসারিক ছিল, আজ সে গারো খ্রিষ্টান! বেদনার ইতিহাস বলার জন্য কিম্মাগুলো ভাঙাচোরা বিলুপ্তপ্রায় হয়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু হায়রোগ্লিফিকসের মতো দুর্বোধ্য অক্ষর পড়তে না পারা অবস্থায় এসব বেদনার কথা আজ কে বুঝতে পারবে, কে বুঝতে চায়?
‘বর্ষাকালের আকাশ/ সদ্য প্রেমেপড়া যুবতী/ সকালে ভালো তো বিকেলে অন্ধকার’ (শরীর জুড়ে বৃষ্টির ঘ্রাণ) মিঠুন রাকসামের কবিতায় উদাহরণ দেবার মতো এ ধরনের অনেক লাইন রয়েছে, যা সহজেই পাঠকের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। ‘দখলের পতাকা’, ‘গত শীতের জিইয়ে রাখা ময়লা’, ‘ট্রেন, সুন্দরী নারীর মতোই’, ‘বাবার হাতটি’, ‘শরীর জুড়ে বৃষ্টির ঘ্রাণ’ প্রভৃতি কবিতা পাঠকের দৃষ্টি-মন কাড়বে নিশ্চয়ই।