‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার শ্রেণিশিক্ষা

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘কপোতাক্ষ নদ কবিতাটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্রছাত্রীরা প্রবন্ধের মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে প্রবন্ধটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন বাংলা বিষয়ের রোমানা আফরোজ। লেখক পরিচিতি: বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল ভাস্বররূপী নক্ষত্র ও প্রথম প্রথা বিরোধী লেখক মাইকেল মধুসূদন দত্ত ২৫ জানুয়ারি ১৮২৪ সালে যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। শৈশব কাল থেকেই তাঁর কবি হবার বাসনা ছিল। তিনি জীবনের প্রারম্ভে ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইংরেজি সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। আর এ লক্ষেই বিলেত গমন করে ধর্মান্তরিত হন এবং নামের সাথে মাইকেল উপাধি যুক্ত করেন। কিন্তু কিছুকাল পর তাঁর এ ভ্রান্তি কেটে যায় এবং বুঝতে পারেন বাংলা সাহিত্যেই রয়েছে রতনের রাজি। এ পথ ধরেই পরবর্তীতে মাইকেল বাংলা সাহিত্যে স্বর্ণোজ্জ্বল আসন লাভ করেন। এই মহামানব ছিলেন পাশ্চাত্য কাব্য পুষ্ট, প্রতিবেশ-নিরপেক্ষ কবি কল্পনার অধিকারী। তিনি আধুনিক কাব্য ও নাট্য সাহিত্যের প্রবর্তক। তিনি “রত্নাবলী” নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে বাংলা নাটকের দীনতা অনুভব করেন। আর তখনই কলম ধরেন “শর্মিষ্ঠা” রচনায়। এ নাটকে পৌরাণিক কাহিনী সংস্কৃতাশ্রয়ী ভাষণ এবং পাশ্চাত্য রোমান্টিক নাট্যকলার আদর্শ স্থান পেয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় নাটক “পদ্মাবতী” এবং বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্রাজেডি নাটক “কৃষ্ণকুমারী(১৮৬১)”।“মায়াকানন” তাঁর অসমাপ্ত সর্বশেষ বিয়োগান্তক নাটক। প্রহসনের মধ্যে রয়েছে- একেই কি বলে সভ্যতা, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ। কাব্যের মধ্যে রয়েছে- ব্রজাঙ্গনা,বীরাঙ্গনা ও প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত “তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য”। তাছাড়া “The captive ladie” ও “Vision of the Past” তাঁর দুটি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ। মহাকাব্য-মেঘনাদবধ(১৮৬১),হেক্টরবধ(অসমাপ্ত)। তিনি বাংলা সনেটের সার্থক রূপকার;তাঁর সনেটের মধ্যে রয়েছে চতুর্দশপদী কবিতা। অবশেষে সাহিত্য সাধনার অবসান ঘটিয়ে তিনি ২৯ জুন ১৮৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। শ্রেণি শিক্ষা: বাংলা কাব্য সাহিত্যের আধুনিকতার প্রবর্তক মধুকবি মাইকেল রেনেসাঁ যুগের অগ্নিপুরুষ। ‘কপোতাক্ষ নদ’ তাঁর একটি বিখ্যাত চতুর্দশপদী কবিতা। এ কবিতায় কবির স্মৃতি কাতরতার আবরণে অত্যুজ্জ্বল দেশপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে। মাইকেলের জন্মভূমি যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। এ নদটি কবির শৈশব, বাল্য, কৈশোরের নিত্যসহচরী। আর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এ কপোতাক্ষের প্রতি কবির যে প্রেম তারই বাণীরূপ দিয়েছেন ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায়। মহাকবি মাইকেল প্রথম জীবনে নিজ ভাষার প্রতি বিরাগভাজন ছিলেন। তাই বিদেশে গিয়েছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য। কিন্তু বিদেশি সাহিত্যে সফলতা লাভে ব্যর্থ কবির মনে পড়েছে স্বদেশের কথা। ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে আত্মীয়স্বজনহীন জীবনযাত্রার মাঝে যখন আশা-আকাঙ্ক্ষার দোলাচলে দোল খাচ্ছিলেন, তখন অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়ে কবি কুল কুল ধ্বনিতে বয়ে যাওয়া স্রোতস্বিনী কপোতাক্ষের কথা মনে করেছেন। দূর দেশে বসেও তিনি কপোতাক্ষ নদের মায়ামন্ত্র ধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। তাইতো রোদন পিয়াসী কবির মন রূপসী বাংলার ধানসিঁড়ির বুকে যেখানে হংস বলাকা খেলা করে সেখানে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে ছিলেন। কবি বহু দেশে ঘুরে বহু নদী দেখেছেন, বিভিন্ন নদীর বুকে নৌকা ভাসিয়েছেন তখন তাঁর কপোতাক্ষের কথা মনে পড়েছে। কপোতাক্ষের সাথে তাঁর যে আকর্ষণ তা অন্য কোন নদে পান নি। কপোতাক্ষের স্তনে দুগ্ধ-স্রোতোরূপী যে ধারা তা কবি পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পান নি। কেননা মাতৃভূমির স্তন্যের স্বাদ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। শিশুকাল থেকেই এ নদের সাথে ছিল কবির সুগভীর মিতালী। এ নদের জল পান করেই কবি পরম তৃপ্তি পেয়েছেন। মাতৃরূপে পরম স্নেহে কবির তৃপ্তি নিবারণ করেছে এ নদ। তাই শয়নে, স্বপনে, কল্পনায় অনুক্ষণ কবি কপোতাক্ষের অমিয়ধারায় অবগাহন করতে ব্যাকুল হয়েছেন। তাই বঞ্চিত জীবনের জ্বালা বুকে নিয়ে সুদূর প্রবাসে বসেও কবি গভীর শ্রদ্ধাভরে কপোতাক্ষ নদকে স্মরণ করেছেন।