কুলের গ্রাম সিঙ্গা
আজাদুর রহমান খান চৌধুরী, কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৩, ২২:২৩
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কেরালকাতা ইউনিয়নের সিঙ্গা গ্রাম এখন ‘কুলের গ্রাম’ হিসাবে পরিচিত। হাইব্রীড জাতের কুল চাষ করে এ গ্রামের অনেকেই বেকারত্ব দূর করে ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। এখান থেকে ট্রাকে করে প্রতিদিন শতাধিক মণ কুল ঢাকার কাওরান বাজার, ওয়াইজঘাট ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। সুস্বাদু হওয়ায় পঞ্চগড়ের পরই এই এলাকার কুল সারাদেশে সুখ্যাতি লাভ করেছে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে সিঙ্গা গ্রামে নিজের কুল বাগানে বসে কথা হয় সফল কুল চাষী আবুল কাশেম সরদারের (৬২) সঙ্গে। তিনি জানান, পৈতৃক সূত্রে বোনদের অংশ নিয়ে তিনি ২২ বিঘা জমির মালিক। জমি উঁচু হওয়ায় তা সবজি ও ধান চাষের জন্য অনুপযোগী। গ্রামের নূরুল হক, লিয়াকত আলী, আবুল হোসেন ও মন্তেজসহ কয়েকজনের দেখাদেখি ২০০৬ সালে অনাবাদি আট বিঘা জমিতে হাইব্রীড জাতের কুল চাষ শুরু করেন। এরপর থেকে তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। কুল চাষ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। প্রতি বছর খরচ বাদ দিয়ে গড়ে চার লাখ টাকা লাভ হয় তার।
আবুল কাশেম জানান, সাধারণত তাদের এলাকায় গাব, নারিকেল, আপেল ও বাউ কুলের চাষ হয়। তবে অধিক ফলনশীল হওয়ায় প্রথম থেকেই তিনি গাব ও নারিকেল কুলের চাষ করে আসছেন। তিনি জানান, বর্ষকালে চারা লাগানোর পর মূলত ১২ মাস ধরেই কুল গাছের পরিচর্যা করতে হয়। ভাদ্র মাসের প্রথম দিকে গাছে (নারিকেল জাত) ফুল আসে। পৌষ মাসের প্রথম দিকে কুল পাকে। তবে গাব জাতের কুল গাছে ফুল আসে আরো দেরিতে। ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি এ কুল পাকে। তিনি আরো জানান, বিঘা প্রতি ২৫ থেকে ৩০টি কুলের চারা লাগানো যায়। গ্রামের কয়েকটি নার্সারী থেকে প্রতি চারা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় কিনতে হয়। ফুল আসার পর থেকে কুল শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্কোর, ক্যারাটিল ও টিল নামের কীটনাশক সাত থেকে আট বার সেপ্র করতে হয়। নিজের এক বিঘা জমিতে কুল চাষে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। কুল ওঠার পরপরই এক কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেন। তবে বর্তমানে দাম একটু কমেছে।
দুই স্ত্রী শাহীদা খাতুন ডালিম ও মমতাজ বেগম এবং চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আবুল কাশেমের সংসার। কুল চাষ করে তিনি ছয় কক্ষ বিশিষ্ট পাকা বাড়ি করেছেন। কিনেছেন পাঁচ বিঘা জমি। পাকা পায়খানা, বাথরুমের পাশাপাশি টিউব ওয়েল ও শ্যালো মেশিন বসিয়েছেন। চার ছেলের পড়াশুনার খরচ চালানোর পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েছেন। কিনেছেন নিজের ও চার ছেলের জন্য পাঁচটি মোটর সাইকেল। মেয়ের পড়াশুনা শেষ করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংকে রেখেছেন পাঁচ লক্ষাধিক টাকা। তার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই হাইব্রিড কুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কাশেম অভিযোগ করে বলেন, সরকারি বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় চাষীরা কুলের ন্যায্য দাম পায় না। তাছাড়া সরকারিভাবে কোন ঋণ না পাওয়ায় অধিকাংশ চাষী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে থাকেন। এতে চাষীদের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্বপন কুমার খাঁ জানান, সিঙ্গা গ্রামের দেখাদেখি উপজেলার হুলহুলিয়া, সাতপোতা, বেড়বাড়ি, দরবাসা, বহুড়াসহ বেশকয়েকটি গ্রামে কুল চাষ হয়েছে। চাষীরা চাইলেই কৃষিবিভাগ পরামর্শ দিয়ে থাকে। আবেদন করলে চাষীরা যাতে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পান সে ব্যাপারে তিনি উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।