গণজাগরণ মঞ্চের কাছে ককটেল বিস্ফোরণ

রাজধানীর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের পাশে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল শুক্রবার বিকালে মঞ্চের উদ্যোগে নারী জাগরণ সমাবেশ চলাকালে এ বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রাথমিকভাবে অন্তত আটজনকে আটক করা হয়েছে। বিস্ফোরণে এক র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। শাহবাগ এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে এবার জেগে উঠেছে সর্বস্তরের নারীরা। আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তরুণদের সাথে পথচলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা। সব বাধা-বিপত্তি এবং ষড়যন্ত্র পেরিয়ে আন্দোলনের বিজয় ছিনিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। শাহবাগ থানা পুলিশ এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল শুক্রবার বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের উত্তর-পূর্ব পাশের সড়কে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে মঞ্চে তখন নারী জাগরণী সমাবেশে বক্তব্য চলছিল। মঞ্চ থেকে ৭৫-১০০ গজ দূরে এ ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। শিশু পার্ক থেকে কাঁটাবনগামী সড়কে এ বিস্ফোরণ স্থলে র্যাব সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ককটেলের আঘাতে র্যাব-৩’র ডিএডি জালাল উদ্দিন আহত হয়েছেন। তিনি মুখে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। বিএসএমএমইউ হাসপাতালে তিনি চিকিত্সাধীন বলে জানিয়েছেন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান জিয়াউল আহসান। বিস্ফোরণের পর শাহবাগে সমবেত জনতার একটি অংশ আতংকিত হয়ে পড়ে। তারা ছুটোছুটি করতে থাকে। মঞ্চের বক্তব্য প্রায় পনের মিনিটের জন্য থেমে যায়। এরই মধ্যে মঞ্চের কয়েকজন সংগঠক এবং প্রায় শ’খানেক তরুণ বাঁশের লাঠি নিয়ে মিছিল বের করেন। তাদের সাথে রড-বাঁশ নিয়ে আরো শ’খানেক তরুণ-কিশোর যোগ দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যায় হাসপাতালের (বিএসএমএমইউ) এ ব্লকের ৫ম তলা থেকে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়েছে, এমন ধারণা করে তারা সেদিকে ছুটে যান। তবে পুলিশ, হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী এবং মঞ্চের সংগঠকদের বাধায় তারা ভবনের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি। সেখানে কিছুক্ষণ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা শাহবাগ ও পার্শ্ববর্তী সড়কে মিছিল করেন। বিকাল ৫টার পর আবারো মঞ্চে বক্তব্য শুরু হয়। সন্দেহভাজন আটক আট: এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ অন্তত আট জনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে বিকালে শাহবাগ এলাকা থেকে দুইজনকে আটক করে পুলিশ। রাতে শাহবাগ থানায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলে। আটক দুইজন হলেন নেছার উদ্দিন (২২) এবং রুবেল (১৮)। ঐ দুইজন নিজেদের বংশাল এলাকার জুতার দোকানের শ্রমিক বলে দাবি করেছেন। এছাড়া গতকাল বিকালে বিস্ফোরণের পর বিএসএমএমইউ’র এ ব্লকের ভিতর থেকে ছয় জনকে আটক করে পুলিশ। সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে আটককৃত ছয় জনকে ভবন থেকে নামিয়ে পুলিশের একটি গাড়িতে করে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এমএ জলিল। তবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় চার জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি’র গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মাসুদুর রহমান। ককটেল ছুঁড়ল কোন স্থান থেকে: কোন স্থান থেকে ককটেল ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে তা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। সুনির্দিষ্টভাবে গতকাল কিছু বলতে পারেনি পুলিশ। শাহবাগে অবস্থানরত কয়েকজন দাবি করেন, বিএসএমএমইউ’র পাঁচ তলা থেকে ককটেলগুলো নিক্ষেপ করা হয়েছে। আবার কয়েকজন দাবি করেন, হেঁটে এসে ককটেল ছুঁড়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় এক দুর্বৃত্ত। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাংস্কৃতিক কর্মী বিউটি সাংবাদিকদের বলেন, পাঁচ তলা থেকে কালো গেঞ্জি পরা এক লোক দুই হাত উঁচিয়ে কিছু ছুঁড়ে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে নিচে বিস্ফোরণ ঘটে। পরপর দুই হাত দিয়েই ঐ ব্যক্তি ককটেল ছুঁড়েছে। প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছেন অন্তত তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী। এদিকে অজ্ঞাতনামা এক যুবককে ককটেল ছুঁড়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন আসলাম নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। বিএসএমএমইউ’র এ ব্লকের ৫ তলা থেকে ককটেল ছুঁড়ে মারা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে চূড়ান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঐ ভবনের পাঁচ তলার ক্যান্টিনের লোকজনসহ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তদন্তশেষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মামলা দায়ের করা হবে। রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত ঐ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি বলে জানা গেছে। সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা: গণজাগরণ মঞ্চের ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচী ঘোষণা করেছেন সংগঠকরা। গতকাল সন্ধ্যায় নারী জাগরণ সমাবেশে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আগামীকাল রবিবার বিকাল ৩টায় উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের চৌরাস্তায় সমাবেশ, ১৩ মার্চ সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ, একই দিন বিকাল তিনটায় চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে মহাসমাবেশ, ১৫ মার্চ বিকাল ৩টায় আশুলিয়ায় সমাবেশ এবং ১৬ মার্চ সকাল ১১টায় জামায়াত-শিবিরের নৃশংসতার প্রতিবাদে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্প্রীতি সমাবেশ। এর আগে বিকালে নারায়ণগঞ্জের গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম কর্মী তানভীর মোহাম্মদ ত্বকীর নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ছয় দফা আদায়ে নারী-পুরুষ পথ চলবে একসাথে: যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসিসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে শাহবাগে চলমান আন্দোলনে নারী-পুরুষ একসাথে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন গতকালের নারী জাগরণী সমাবেশ থেকে। বিকাল সোয়া চারটার দিকে সমাবেশ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। শাহবাগের আন্দোলনের সাথে শুরু থেকেই একাত্ম হয়ে কাজ করছেন তরুণী-নারীরা। গতকাল সমাবেশে এসে আন্দোলনের সাথে তারা নতুন করে প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন। সমাবেশে এসে সংহতি জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়া, বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন, অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার, জাসদ নেত্রী শিরিন আখতার, ডাকসু’র সাবেক ভিপি মাহফুজা খানম, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সভাপতি সুলতানা কামাল, মেহের আফরোজ চুমকি, নারী নেত্রী খুশি কবির, এডভোকেট হাবিবা আঞ্জুম লিজা, সালেহা সুলতানা, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান প্রমুখ। সমাবেশে বক্তব্য না রাখলেও দীপু মনি সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। কিন্তু ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই চেতনাকে ধ্বংসের প্রচেষ্টা চালানো হয়। স্বাধীনতার পর ৪২ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতাবিরোধীরা। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। আজ তরুণ সমাজ জাগ্রত হয়ে একাত্তরের সেই চেতনা ফিরিয়ে এনেছে। এই গণজাগরণের চেতনা, একাত্তরের চেতনা। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বলেন, এ প্রজন্মের গণজাগরণ আমাদের সাহসী করেছে। এখন আমরা অনেক আশাবাদী। একাত্তরে নারীদের প্রতি যে লাঞ্ছনা করা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেয়ার মাধ্যমে সে লাঞ্ছনার কিছুটা হলেও শোধ হবে। কর্মসূচি: আগামীকাল রবিবার বিকাল ৩টায় উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের চৌরাস্তায় সমাবেশ, ১৩ মার্চ সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ, একই দিন বিকাল তিনটায় চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে মহাসমাবেশ, ১৫ মার্চ বিকাল ৩টায় আশুলিয়ায় সমাবেশ এবং ১৬ মার্চ সকাল ১১টায় জামায়াত-শিবিরের নৃশংসতার প্রতিবাদে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্প্রীতি সমাবেশ।