চিরনিদ্রায় শায়িত আব্দুল জলিল

সকলকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মোঃ আব্দুল জলিল এমপি। গতকাল শুক্রবার বাদ আছর নওগাঁ সদর উপজেলার চকপ্রাণ মহল্লায় সর্বশেষ জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা ও মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। এর আগে বেলা ১১টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তৃতীয় নামাজে জানাজা শেষে আব্দুল জলিলের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার আব্দুল হামিদ। গতকাল সকাল ৯টায় মতিঝিল দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকার মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সামনে আব্দুল জলিলের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দ্বিতীয় জানাজা, বেলা ১১টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তৃতীয় জানাজা, বেলা ১২টায় হেলিকপ্টারযোগে নওগাঁ নিয়ে যাওয়ার পর শহরের এটিম মাঠে চতুর্থ নামাজে জানাজা এবং বাদ আছর চকপ্রাণ মহল্লায় পঞ্চম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটিতেই সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিটে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন আওয়ামী লীগের এই সাবেক সাধারণ সম্পাদক। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে আব্দুল জলিল ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশেষ বিমানযোগে তাঁকে সিঙ্গাপুর নিয়ে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত সোমবার বিকালে তাঁর হূদযন্ত্রে বাইপাস অস্ত্রোপচার হয়। পাঁচ ঘণ্টার অস্ত্রোপচার সফল হয় এবং তিনি কথাও বলেন। কিন্তু কিডনি জটিলতায় গত বুধবার ভোর থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ২০০০ সালেও তার হূদযন্ত্রে একবার বাইপাস অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। গতকাল বেলা ১১টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আব্দুল জলিলের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের এই সংগঠককে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, জাতীয় সংসদের স্পিকার মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবর্গ, মন্ত্রিসভার সদস্যগণ, হুইপবৃন্দ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও মরহুমের আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহীরা জানাজায় অংশ নেন। জানাজা থেকে সর্বস্তরের মানুষ আব্দুল জলিলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার ছাড়াও ফুল দিয়ে মরদেহে শ্রদ্ধা জানান সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা। জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও মহাসচিব রুহুল আমিন হালদারের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির (এ) সংসদ সদস্য ও নেতারা শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকসহ আরো অনেকে মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সকাল ১০টায় আব্দুল জলিলের দ্বিতীয় নামাজে জানাজা বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা পরিচালনা করেন ওলামা লীগের সভাপতি মাওলানা ইলিয়াস হোসাইন বিন হেলালী। জানাজা শেষে দলের নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে মরহুমের কফিনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা দিয়ে ঢেকে দেন। রাজধানীর তিনটি স্থানে জানাজায় শরীক হন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, জাসদের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নুরুর রহমান সেলিম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাতীয় পার্টির (জেপি) অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ, সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, বিশিষ্ট অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানা, সম্মিলিত বঙ্গবন্ধু সমর্থক ঐক্য জোটের সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন মাসুদসহ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, আব্দুল জলিল সারাটা জীবন আওয়ামী লীগের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর মতো রাজনীতিবিদ খুবই প্রয়োজন। তিনি শুধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতীয় নেতা এবং আমাদের অহঙ্কার। ছোটবেলা থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে তিনি গড়ে উঠেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক একদিকে যেমন নিরহঙ্কারী, অন্যদিকে ছিলেন তেমনই উদার। তথ্যমন্ত্রী ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি বলেন, বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন আব্দুল জলিল। সবক্ষেত্রে তিনি সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। দেশকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করতে তিনি সারাজীবন লড়াই করে গেছেন। পাশাপাশি মহাজোটের ঐক্য গড়া এবং টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাই তাঁর এই চলে যাওয়া আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজায় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, আব্দুল জলিলের চলে যাওয়া আমাদের মর্মাহত করেছে, তাঁর এ শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়। এরশাদ বলেন, শেষ মুহূর্তে অনেক দুঃখ নিয়ে চলে গেলেন আব্দুল জলিল। তাঁকে আরও সম্মানিত করা যেতো। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে, মন্ত্রী-এমপি হিসেবে তিনি দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। নওগাঁর জানাজায় লক্ষাধিক মানুষের ঢল :আমাদের নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, গতকাল শুক্রবার বিকালে নওগাঁ শহরের এটিম মাঠে অনুষ্ঠিত আব্দুল জলিলের দুই দফা নামাজে জানাজায় লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেন। নওগাঁর ইতিহাসে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে কোনো ব্যক্তির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠানের ঘটনা এই প্রথম বলে মত দিয়েছেন অনেকেই। মহান এই নেতার নামাজে জানাজায় অংশ নিতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা শহরসহ নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলা থেকে দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়াও ঢাকা থেকে মরদেহের সঙ্গে আসেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মামুন, বাহাউদ্দিন নাছিম ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়াও জানাজায় অংশ নেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন, সাবেক মেয়র ও কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু এবং রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান প্রমুখ। দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন নওগাঁর পৃথক পাঁচটি সংসদীয় আসনের সাংসদ ইসরাফিল আলম, শহিদুজ্জামান সরকার, আকরাম হোসেন চৌধুরী ও ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক ও সাধনচন্দ্র মজুমদার। বর্ষীয়ান এই আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুতে নওগাঁ শহর জুড়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। তাকে শোক জানিয়ে বিভিন্ন ব্যানার টাঙানো হয়। অতিরিক্ত মানুষের চাপে শহরে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এর আগে দুপুর পৌনে দুইটার দিকে বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে আব্দুল জলিলের মরদেহ নওগাঁয় নিয়ে আসা হয়। নওগাঁ স্টেডিয়াম মাঠে অবতরণ করা হেলিকপ্টার থেকে আব্দুল জলিলের মরদেহ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় তার নিজ বাসভবন শহরের চকদেবপাড়া মহল্লায় ‘ফয়েজ ভিলা’য়। এ সময় সেখানে এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। মরহুমের স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাসহ দলীয় নেতা-কর্মীদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। পরে মরদেহ নেয়া হয় নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে। এখানে দলীয় নেতা-কর্মীদের শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপনের পরে বিকাল সোয়া তিনটায় আব্দুল জলিলের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় শহরের এটিম মাঠে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষজন নওগাঁর এই প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় নওগাঁর স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের হাজার-হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থক আব্দুল জলিলের কফিনে ফুলের মালা ও পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে সরকারি পর্যায়ে নওগাঁ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুল জলিলকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। এ সময় নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পৃথকভাবে আব্দুল জলিলকে গার্ড অব অনার দিয়ে সম্মান জানান। পরে একই মাঠে দুই দফায় মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় নওগাঁর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নেন। এটিম মাঠের জানাজা শেষে মরহুমের মরদেহ নিয়ে যাওয়া তার গ্রামের বাড়ি শহরের চকপ্রাণ মহল্লায়। সেখানে মাগরিবের নামাজের পর পৃথক একটি জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয় মরহুম আব্দুল জলিলকে। আব্দুল জলিল: পেছন ফিরে দেখা :১৯৪১ সালের ২১ জানুয়ারি আব্দুল জলিল নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ফয়েজউদ্দিন আহমেদ এবং মায়ের নাম জারিনা ফায়েজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১৯৬৯ সালে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন বাঙালির অধিকার অর্জনের আন্দোলনে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে আব্দুল জলিল নওগাঁর আপামর জনসাধারণ, কর্মরত ই.পি.আর. পুলিশ আনসার বাহিনীকে সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর আব্দুল জলিল নওগাঁ থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যান। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় বেশ কয়েকটি ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালনা করেন। নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জলিলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এসব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৭৩ সালে আব্দুল জলিল নওগাঁ সদর আসনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ৪ বছর কারাভোগের পর ১৯৭৯ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হন। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি হলে আব্দুল জলিলকে আবার গ্রেফতার করা হয়। ১৫ দিন অজ্ঞাত স্থানে বন্দী রেখে নির্যাতন চালানো হয় তাঁর ওপর। জেলে থাকা অবস্থায় তাঁর মায়ের মৃত্যু হলেও সামরিক জান্তা মায়ের মুখখানা এক নজর দেখার কোন সুযোগ তাঁকে দেয়নি। ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি পর পর দু’বার নওগাঁ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন এবং সংসদে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে বাণিজ্যমন্ত্রী ও ২০০২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সরকারে টেকনোক্র্যাট কোটায় বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেফতার হন এই আওয়ামী লীগ নেতা। মুক্তি পাওয়ার পর আবদুল জলিলকে আর দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নওগাঁ-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি তাঁর। তবে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য পদে তাঁকে স্থান দেয়া হয়। আব্দুল জলিলের বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, দুই ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। তাঁর দুই মেয়ে চিকিত্সক। বড় ছেলে লন্ডনে বার-অ্যাট-ল করছেন। ছোট ছেলে স্কুলে পড়াশোনা করছে।