সঞ্চয়পত্রে উেস করের সিদ্ধান্তে অনড় এনবিআর

সরকারের অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের অন্যতম উত্স সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমে গেছে ব্যাপক হারে। নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও নীতিগত কিছু জটিলতার কারণে এই খাতে বিক্রি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব হয় নি। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অর্থায়নের লক্ষ্য ঠিক করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) এই খাতের নিট বিক্রি লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮ শতাংশ অর্জন করা গেছে! ফলে অর্থায়নের জন্য বিকল্প পন্থা খুঁজতে হচ্ছে সরকারকে। এই অবস্থায় সঞ্চয় পরিদপ্তর থেকে এ খাতের কর উেস কর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়া হলেও আগামী বাজেটের আগে এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দিতে নারাজ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এনবিআর সূত্র বলছে, যৌক্তিক কারণে সঞ্চয়পত্রের উেস কর কর্তনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চাচ্ছে না এনবিআর। তারা কেবল সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল থেকে চাইলেই তারা উেস কর কর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে পারেন। এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার জন্য বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানে সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছিল জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তর। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এ খাতের উপর বিদ্যমান উেস কর কর্তন প্রথা বাতিল করা। সঞ্চয় পরিদপ্তরের যুক্তি, বিনিয়োগকারীর উপর থেকে উেস কর কর্তন করা হলেও কার্যত তাদের বেশিরভাগই করের আওতার মধ্যে পড়েন না। তারা পরবর্তীতে এনবিআরের কাছ থেকে তা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে (যাদের করদায় তৈরি হয় না) অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। অনেকে এই টাকা ফেরত নিতেও পারেন না। সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থায়নের এ দীনতা ভাবিয়ে তুলেছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকেও। তিনি সমপ্রতি এনবিআরের কাছে সঞ্চয়পত্রের উেস করের প্রয়োজন রয়েছে কি না তা জানতে চেয়েছেন। কিন্তু সঞ্চয় পরিদপ্তরের এই যুক্তি মানতে নারাজ এনবিআর। এনবিআর মনে করছে, সঞ্চয়কারীদের এই ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হলে ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এ দাবি তুলে বসতে পারে। এর পর একে একে দাবির সারি দীর্ঘ হতে থাকবে। এক পক্ষকে ছাড় দেয়ার কারণে অন্য পক্ষেরও এ দাবির যৌক্তিকতা তৈরি হবে। বিপাকে পড়ে এনবিআরের রাজস্ব আয়েই নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত মার্চ মাসে সরকার এ খাতের সুদের হার কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন সুদের হার অনুযায়ী পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। প্রতি লাখে বিনিয়োগকারী পাবেন (উেস কর ও অন্যান্য চার্জ কর্তনের পর) ১ হাজার ৭০ টাকা। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ সুদ হারে বিনিয়োগকারী প্রতি লাখে পাবেন নিট ৩ হাজার টাকা। ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ সুদে এককালীন ৬২ হাজার ৯০০ টাকা। আর পেনশনার সঞ্চয়পত্রে (তিন মাস অন্তর) ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ সুদে ৩ হাজার ১৪৫ টাকা। তবে এত উদ্যোগের পরও এ খাতের প্রকৃত বিক্রয় না বাড়ার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারছে না অর্থ মন্ত্রণালয়। সঞ্চয় পরিদপ্তরের প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে ১৩ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। একই সময়ে বিনিয়োগকারীরা উত্তোলন করেছেন ১৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। অর্থাত্ এই সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট জমা হয়েছে ৩৬৩ কোটি টাকা যা চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় (৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) অতি নগণ্য। একই সময়ে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা।