ত্বকি হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল না’গঞ্জ, সর্বাত্মক হরতাল
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৩, ২২:১৯
হরতালে ট্রেন চলাচল কিংবা খাবারের হোটেল বন্ধ রাখার কোন নজির ছিল না নারায়ণগঞ্জে। কিন্তু শনিবার সেটাই দেখলো নগরবাসী। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা রফিউর রাব্বির ছেলে মেধাবি ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি হত্যার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বন্ধ করে দেয়া হয় ট্রেন চলাচল। রাস্তায় চলতে দেয়া হয়নি কোন যান্ত্রিক যানবাহন, বন্ধ ছিল শহরের অধিকাংশ দোকান-পাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হরতাল পালন করেন। সকাল-সন্ধ্যা এই হরতালের ডাক দেয় জেলা সাংস্কৃতিক জোট। জেলা বিএনপি, বাসদ, সিপিবি ও গণসংহতি আন্দোলন হরতালে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল। হরতাল চলাকালে শহরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে ত্বকি হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে ঘাতকদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানানো হয়। এ ঘটনার জন্য প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন নিহতের বাবাসহ বিশিষ্টজনেরা। এদিকে ত্বকি হত্যার ঘটনায় মামলা হলেও শনিবার বিকেল পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
ট্রেন লাইনে আগুন, বাস ভাংচুর :হরতাল চলাকালে ভোর ৬টা হতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সামনেই আটকে দেয়া হয় রিকশা, এমনকি বাইসাইকেলও। বিভিন্ন স্থানে দফায় দফায় টায়ারে আগুন দেয়া হয়। দিনভর চলে প্রতিবাদ সমাবেশ, হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে মুহুর্মুহু শ্লোগান। সকাল ৬টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নারায়ণগঞ্জগামী ট্রেন সকাল পৌনে ৭টায় চাষাঢ়া রেল স্টেশনে আটকে দেয়া হয়। তখন হরতাল সমর্থকরা রেল লাইনের উপরে টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর পর থেকে এ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ পাহারায় সকাল সাড়ে ৭টায় ট্রেনটি নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় । এর পর থেকে এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এছাড়া হরতাল সমর্থকরা সকাল সোয়া ৬টার দিকে শহরের ২নং রেল গেট এলাকায় কয়েকটি বাস ও যানবাহন ভাংচুর করে।
পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
পুলিশ ও প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার কারণেই তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি খুন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। তাদের অভিযোগ, বুধবার বিকেল থেকে ত্বকি নিখোঁজ হওয়ার পর বিষয়টি পুলিশ, র্যাব ও প্রশাসনকে জানানোর পরেও তারা দ্রুত কোন উদ্যোগ না নেয়ায় সম্ভাবনাময় এই কৃতী ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এসব অভিযোগ করেন।
বক্তারা বলেন, ত্বকি মারা গেছে। আমরা রাস্তায় বসে মাথা ঠুকে মরে গেলেও সে আর ফিরে আসবে না। তাহলে কেন এই বসে থাকা। আর কোন মায়ের বুক যেন খালি না হয়, আর কোন ত্বকিকে যেন লাশ হয়ে ফিরে আসতে না হয়, আমাদের সন্তানদের যেন স্বাভাবিক মৃত্যু হয়- তার গ্যারান্টি প্রশাসনের কাছ থেকে পেতেই আমাদের এ হরতাল।
এদিকে ত্বকি হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রশাসনকে দায়ী করেছেন জেলা বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা। আর এ কারণেই দলটি হরতালে নৈতিক সমর্থন দেয়। জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, বুধবার বিকেলে ত্বকি নিখোঁজের পর রাতে পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে তল্লাশী চালায়। পুলিশ এ কাজে ব্যস্ত থাকায় খুনিরা সুযোগ পেয়ে যায়।
জেলা যুবদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন জানান, পুলিশ ও র্যাব যদি সচেষ্ট থাকতো তাহলে ত্বকিকে হয়তো খুঁজে বের করা যেত। মহানগর ছাত্রদল নেতা রশিদুর রহমান রশো ও শাহেদ আহম্মেদ জানান, ত্বকির মৃত্যুর দায়ভার প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।
হত্যার ঘটনায় মামলায়
শুক্রবার রাতে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকির বাবা জেলা নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি রফিউর রাব্বি বাদি হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণসহ আমার অতীত ও বর্তমান বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমার ভূমিকার কারণে কোন মহল আক্রোশবশত আমার ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকিকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে বলে তার ধারণা। তবে মামলায় কারো নাম উল্লেখ করা হয় নি।
এ ব্যাপারে ওসি এস এম মঞ্জুর কাদের জানান, মামলাটি তিনি নিজেই তদন্ত করবেন। মামলাটি খুবই স্পর্শকাতর। সঠিক তদন্ত করেই খুনিদের শনাক্ত করা হবে। তবে এ জন্য সময় প্রয়োজন। কারণ নিখোঁজের পর ত্বকির মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় ট্র্যাকিং করা যায়নি। এখন সোর্স লাগিয়ে খুনিদের খুঁজে বের করতে হবে।
পুলিশের তিন টিম মাঠে
জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, খুনিদের শনাক্ত করতে ও হত্যাকাণ্ডের কারণ বের করতে সদর মডেল থানা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও ঢাকা ডিবির ৩টি পৃথক টিম গঠন করা হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
পরীক্ষার ফল দেখে যেতে পারলো না ত্বকি
ঢাকার শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জে গড়ে তোলা গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে (১৭) অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। শুক্রবার সকালে শহরের শীতলক্ষ্যা নদীর তীর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। বুধবার বিকেল থেকে সে নিখোঁজ ছিল। বৃহস্পতিবার ত্বকির ‘এ লেভেল’ পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়। সে খুব ভাল ফলাফল করলেও তা দেখে যেতে পারলো না। পদার্থ বিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে সে ২৯৭ পেয়েছে; যা সারাদেশে সর্বোচ্চ নম্বর। এর আগে ‘ও লেভেল’ পরীক্ষায়ও পদার্থ ও রসায়ন বিষয়ে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল মেধাবী ছাত্র ত্বকি।
খুনিদের গ্রেফতারে ৩ সপ্তাহের আলটিমেটাম
এদিকে ত্বকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার বিকালে শহরের চাষাঢ়ায় সমাবেশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। সভায় চেম্বার সভাপতি সেলিম ওসমান খুনিদের গ্রেফতারে ৩ সপ্তাহের আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, এ সময়ের মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা না হলে ১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে মহাসমাবেশ ও পরে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে।
সেলিম ওসমান রাজনীতিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের রাজনীতি দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে আমাদের প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে। তবে আমরা আর হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবো না। আমাদের পেটে লাথি মারা হলে আমরাও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো।’ তিনি জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তা না হলে তোমরা তোমাদের দেশ পাকিস্তানে চলে যাও।’
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআই পরিচালক প্রবীর কুমার সাহা, বিকেএমইএ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, চেম্বারের সহ-সভাপতি মঞ্জুরুল হক, আবদুর সোবহান, শাহজালাল মিয়া, এম সোলায়মান, মজিবুর রহমান, জসিমউদ্দিন মৃধা প্রমুখ।
কুড়িগ্রামে প্রতিবাদ সভা
ত্বকি হত্যার প্রতিবাদে গতকাল কুড়িগ্রামে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট প্রতিবাদ সভা করেছে বলে খবর দিয়েছেন আমাদের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি। শ্যামল ভৌমিকের সভাপতিত্বে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এই সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিপিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান মোমিন, শিক্ষক আব্দুল খালেক ফারুক, সাংবাদিক আহসান হাবীব নীলু, সংস্কৃতি সংগঠক মানিক চৌধুরী প্রমুখ।