মৃত্যুর ১৫ মিনিট আগে স্ত্রীকে জানান দুর্বৃত্তরা হামলা করেছে
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৩, ২২:২০
দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হবার মাত্র ১৫ মিনিট আগেই শিবগঞ্জে দায়িত্বপালনরত নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী খালেদা বেগমের সঙ্গে শেষ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, দুর্বৃত্তদের হামলায় আক্রান্ত হয়ে গেছি। আমার জন্য দোয়া করো। এরপর আর কিছু বলার সুযোগ পাননি। তার টেলিফোন খোলাই ছিল। স্ত্রী অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছেন। সাড়া নেই। একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। সাড়া নেই। তবে ফোনটি খোলা থাকায় হামলাকারিদের হৈ হুল্লোড় ও গালিগালাজের শব্দ স্ত্রী এবং পরিবারের লোকজন শুনতে পান। তৌহিদুল বলেছিলেন, ভাই আমরা সরকারি চাকরি করি, আমাদের মারছেন কেন। উত্তর আসে, আরে তুই এখনো বেঁচে আছিস! এরপর আবার হামলা।
তৌহিদুল ইসলাম ১৯৮৯ সালে পর্যটন কর্পোরেশনে যোগদান করেন। সর্বশেষ তার কর্মস্থল ছিল বগুড়া পর্যটন মোটেলে। তিন মাস আগে তাকে সেখানে বদলি করা হয়। বগুড়া কর্মস্থলে যাবার পর তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সোনা মসজিদ এলাকায় নির্মিতব্য মোটেলের কাজ তদারকি করতেন। এখানেই তিনি থাকতেন। মোটেল নির্মাণ হওয়ার আগ পর্যন্ত পাশে ডাক বাংলায় থাকতেন। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর সোনামসজিদ মোটেলটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় ছিলো। পর্যটন কপোরেশনের দুই কর্মকর্তা বলেন, ২৮শে ফেব্রুয়ারি অর্থাত্ ঘটনার দিন ডাকবাংলা থেকে বিছানাপত্র নিয়ে প্রকৌশলী তৌহিদুল সকালে সোনা মসজিদ মোটেলের তিনতলার একটি কক্ষে উঠেন। এর আগে পর্যটনের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে বলেছিলেন ২৬শে মার্চের মধ্যে উদ্বোধন হয়ে যাবে। আপনি মোটেলে থাকবেন। সেই আদেশ অনুযায়ী তিনি মোটেলে ওঠেন। সেখানে ওঠার ঘন্টাখানেক পরে হামলার শিকার হন বলে কর্মকর্তারা জানান।
সূত্র জানায়, হামলাকারিরা একযোগে সেদিন সোনা মসজিদে মোটেলে ভাংচুর শুরু করে। ঐ সময় তৌহিদুল আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ে ৪র্থ তলার ছাদে গিয়ে লুকান। কিন্তু হামলাকারিরা তাকে সেখানে ধাওয়া করে ধরে ফেলে ৪র্থ তলা থেকে ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দেয়। এরপর হামলাকারিরা মোটেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহীনবাগে তৌহিদের বাসায় গিয়ে স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে আলাপ করলে তারা কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে ইত্তেফাকের কাছে সেই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের বর্ণনা দেন। ঐ সময় স্ত্রী, দুই পুত্র ও শিশু কন্যার বুক ফাটা কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে ওঠে।
ঘটনার পর শিবগঞ্জ থানার এসআই শহীদুল ইসলাম বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত দুই থেকে তিন হাজার হামলাকারিকে আসামি করা হয়। গতকাল শনিবার পর্যন্ত এ হত্যা ও অগ্নিকান্ডে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি বলে চাপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন। সন্ধ্যায় ঢাকার ইত্তেফাক অফিস থেকে শিবগঞ্জ থানায় যোগাযোগ করা হলে ওসি মিজানুর রহমান জানান, কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।কাউকে সনাক্ত কিংবা গ্রেফতার করতে না পারায় এলাকাবাসী ও তৌহিদুলের পরিবার হতাশ। খুনিরা এলাকার পরিচিত মুখ। তারা এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে জানা গেছে।
মৃত্যুর আগে বাঁচার জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন :ঘটনার দিন ২৮শে ফেব্রুয়ারি তৌহিদ স্ত্রীকে প্রথম ফোন করে বলেছিলেন, এখানকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত। জামায়াত-শিবির হামলা করছে বিভিন্ন স্থানে। এই ফোনের ঘন্টা খানেক পর দ্বিতীয় দফা ফোন করে তিনি স্ত্রীকে বলেন, আমি হামলার শিকার। মোটেলে ভাংচুর শুরু হয়ে গেছে।
মোটেলে তৌহিদের সঙ্গে ম্যানেজার মতিয়ার রহমান ছিলেন। মতিয়ার কোন রকমে আত্মরক্ষা করেন। তৌহিদ ঢাকায় পর্যটন কর্পোরেশনের পরিচালক (প্লানিং) কালী রঞ্জন বর্মনকে ফোন করে বলেছিলেন, স্যার আমাকে রক্ষা করেন, হামলাকারিরা আমাকে মেরে ফেলবে।
সন্তানদের কি হবে :পর্যটন কর্পোরেশনে নিষ্ঠাবান ও সত্ প্রকৌশলী হিসাবে তৌহিদের পরিচিতি ছিল। রাজধানীর শাহীনবাগের ৬ নম্বর গলিতে তিনকক্ষ বিশিষ্ট একটি ভাড়া বাসায় কোন রকমে স্ত্রী, দুই পুত্র ও এক কন্যা নিয়ে বসবাস করতেন। তৌহিদ যা বেতন পেতেন তা দিয়ে সংসার চালাতেন। বড় ছেলে খালেদ হাসান ফামিদ বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ছোট ছেলে মুসফিক হোসাইন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। একমাত্র কন্যা নাজিফা তাবাসুম ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ বসুন্ধরা শাখার দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। প্রত্যেকেই মেধাবী। তৌহিদ নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর তার সংসার ও সন্তানদের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত। এ পরিস্থিতিতে খালেদা তার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার এবং সন্তানদের পড়াশুনা চালিয়ে যাবার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।