বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজন আছে কী
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৩, ২২:২১
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়কে ঘিরে চলমান ডামাডোলের মধ্যেই আবার আলোচনায় উঠে এসেছে আগামী নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের বিষয়টি। আর এই আলোচনার সূত্রপাত করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে যে কোনো ইস্যুতে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। তার এই বক্তব্যের জবাবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনা হতে পারে, তবে তা শুধুমাত্র নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে। কিন্তু সরকার মনে করছে, তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটেছে। এই ইস্যু ছাড়া অন্য কোনো ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে সেটি সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই হতে হবে বলেও মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউও বলছেন, আগামী নির্বাচন কিংবা নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে আসলেই আলোচনার প্রয়োজন আছে কি? এই প্রশ্নের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তারা এ-ও বলছেন, আলোচনার সুযোগ-ই বা কোথায়? দেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন ও নির্বাচনী বিধি-বিধান নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে-এনিয়ে আলোচনার প্রয়োজন-ই নেই। কারণ বর্তমান সংবিধানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট করেই বলা আছে- কখন, কার অধীনে কীভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাত্ নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বাতলানো আছে সংবিধানে।
আলোচনার প্রয়োজন কেন, এরকম প্রশ্ন উত্থাপন করে পর্যবেক্ষকমহল বলছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকা না থাকা নিয়েই সরকার ও বিরোধী দলের মতবিরোধ। বিরোধী দল বলছে, তারা কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। কিন্তু বর্তমান জাতীয় সংসদ নিজে উদ্যোগী হয়ে কিংবা স্বপ্রণোদিতভাবে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে তুলে দেয়নি। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতেই সংসদকে তা বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। সংবিধানের বিষয়ে আদালতের এখিতয়ার সম্পর্কেও প্রচলিত আইন ও সংবিধানে বলা আছে। সে মোতাবেকই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রশ্নে আদালতের রায় বাস্তবায়ন করেছে দশম জাতীয় সংসদ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গত দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবেই বলে আসছেন যে, সংবিধান অনুযায়ী-ই যথাসময়ে নির্বাচন হবে। সংবিধানে যেভাবে বলা আছে সেভাবেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে নির্বাচন কমিশন। তিনি এ-ও বলেছেন, পৃথিবীর অন্যান্য সংসদীয় পদ্ধতির রাষ্ট্রে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেভাবেই নির্বাচন হবে। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, আওয়ামী লীগের অন্য শীর্ষ নেতারাও এ পর্যস্ত বহুবার বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ীই নির্বাচন হবে।
নির্বাচিত না অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, এ প্রশ্নের মীমাংসার জন্য সাম্প্রতিক সময়ে কেউ কেউ গণভোট আয়োজনের কথাও বলেছেন। এ ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাত্ক্ষণিকভাবেই বলেছেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। তাই যে ফর্মুলায়-ই হোক, নির্বাচিত সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হতে হবে। তবে সরকার ও বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। যা বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব। বিরোধী দল এই ধরনের কোনো প্রস্তাব দিলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বিভক্তি ভোটে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে বর্তমান সংবিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সংবিধান অনুযায়ী নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সুযোগ নেই। পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) বিলুপ্তির কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এর ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিলুপ্তি ঘটেছে বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ যার সরল অর্থ দাঁড়ায়, বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনে দশম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রিসভা ও বর্তমান সংসদ সদস্য সবাই ওই ৯০ দিনে স্বপদে বহাল থাকবেন। স্ব-স্ব পদে বহাল থেকেই তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
অবশ্য এনিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটেরই কেউ কেউ প্রশ্ন তুললে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, সংসদ ভেঙ্গে দিয়েই নির্বাচন করা হবে।