মেলে স্বপ্নের ডানা...

পরিসংখ্যান ‘কোনো ক্ষেত্রে প্রথম না হয়ে দ্বিতীয় হলে মনের মধ্যে খারাপ লাগা কাজ করতো। তাই ছোটবেলা থেকেই চেষ্টা করেছি জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রথম হওয়ার জন্য। আর শিক্ষাজীবনের কথা বলতে গেলে দ্বিতীয় হওয়ার ঘটনা ঘটেছে খুব কমই।’ এভাবেই নিজের সফলতা এবং এই সফলতার পেছনে লুকিয়ে থাকা বাসনার কথা জানাচ্ছিলেন সদ্যসমাপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম সমাবর্তনে ‘স্বর্গীয়া অনিমা রাণী সাহা স্মৃতি স্বর্ণ পদক’ পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ফারজানা জাহান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের সবগুলো বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে প্রতিবছর প্রথম স্থান অধিকারীকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ফারজানা পড়াশুনার পাশাপাশি নিজের খরচ নিজেই জুগিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই। ২০০৫ সালে এইচএসসি পাস করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে। ভর্তি পরীক্ষার মেধাক্রম অনুযায়ী তিনি পরিসংখ্যান ছাড়া আরো বেশ কিছু বিষয়ে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও ভর্তি হন পরিসংখ্যানেই। এর কারণ সম্পর্কে একটু রসিকতা করে বললেন, ‘আসলে এসএসসি এবং এইচএসসিতে তো বিজ্ঞানের অন্য বিষয়গুলো পড়েছি। তাই ভাবলাম নতুন কোনো বিষয়ে পড়ি যেটা পড়া হয়নি আগে।’ পরক্ষণেই বললেন, ‘আমার মামা পরিসংখ্যান নিয়ে পড়েছেন। তিনিই মূলত আমাকে সেই সময় এই বিষয় নিতে উত্সাহ যোগান।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুধুমাত্র প্রথম বর্ষে দ্বিতীয় হন। এরপর থেকে প্রতিবছরই নিয়ম করে প্রথম স্থানটি দখল করে আসছেন তিনি। মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করে থিসিসের কাজ করছেন এখন তিনি। আশা করেন মাস্টার্সেও আশানুরূপ ফল করতে পারবেন। তিনি জানালেন, তার সব থেকে ভালো লাগার বিষয় হলো তিনি ফ্যাকাল্টিতে প্রথম স্থান অধিকার করতে পেরেছেন। প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর দূরদ্বীপের মতো মিটিমিটি প্রজ্বলিত স্বপ্নের ছোঁয়া পেয়ে উদ্বেলিত ফারজানা। তিন বোন আর বাবা-মাকে নিয়ে সংসারে অর্থের টানাপোড়েন ছিল বলে পড়াশুনার পাশাপাশি গৃহশিক্ষকের কাজ করে নিজের খরচ নিজেই যোগান তিনি। সেই ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় থেকে। এছাড়া আবৃত্তি, বিতর্ক করছেন স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। আর এতোসব করেও ভালো ফল করতে পারার জন্য বার বার করে বাবা এবং মায়ের কথা বললেন তিনি। কারণ তারা কখনো তার কোনো কাজে বাধা দেননি বরং উত্সাহ যুগিয়েছেন। ফারজানা স্বপ্ন দেখেন দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর গবেষণা করে দেশে ফিরে শিক্ষকতা এবং গবেষণার সাথে যুক্ত থাকবেন। কিছুদিন আগে বিয়ে হয়েছে তার। স্বামী আসিফ আরো পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা যোগান। তবে একটু বিষণ্নতার সুরেই বললেন, আমাদের দেশে নারীদেরকে পুরুষের তুলনায় একটু বেশিই বাধা পেরোতে হয়। এই দিকটি আমাদের সবার খেয়াল করা দরকার। এছাড়া ইভটিজিং কিংবা যৌন হয়রানির মতো ঘটনা রোধ করতে হবে। এর জন্য নারীদেরকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে শিক্ষার বিকাশ ঘটাতে হবে।তাসনুভা শারমিন ফার্মেসী ফ্যাকাল্টি অব ফার্মেসী থেকে তাসনুভাই একমাত্র শিক্ষার্থী যিনি প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণ পদক লাভ করতে পেরেছিলেন। সেটা ৪৬তম সমাবর্তনের কথা। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে গ্রহণ করলেন এসিআই আব্দুল মুকিত স্বর্ণ পদক। এই দিক থেকে নিজেকে দুর্লভ ভাগ্যবান বলে মনে করেন তিনি। ২০০৪ সালে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ক-ইউনিটে ৭০তম হন তাসনুভা। সেই সময় পরিবারের সিদ্ধান্ত এবং নিজের ইচ্ছার কারণেই ফার্মেসীতে ভর্তি হন তিনি। ফার্মেসীতে ভর্তি হওয়ার পর বরাবরই প্রথম স্থান অধিকার করেছেন তিনি। বি.ফার্মে তার সিজিপিএ ছিল চারে ৩.৯৫ আর এম.ফার্মে জিপিএ চারের মধ্যে পেয়েছেন ৪। তার এই ঈর্ষণীয় ফলাফলের কারণ সম্পর্কে বলেন, আমার বড়ো দুই বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েছেন। তাদের অনুপ্রেরণাতেই আমি এখানে পড়ার স্বপ্ন দেখি এবং প্রথম থেকেই তারা আমাকে উত্সাহ যুগিয়েছেন। নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া আমার বাবা- মা এবং শিক্ষকরা আমাকে অনেক উত্সাহ যুগিয়েছেন। এছাড়া স্বপ্ন ছিল একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবো। আমার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে এই রেজাল্টের কোনো বিকল্প ছিল না। এখনো স্বপ্ন দেখেন একদিন এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করবেন। সেই স্বপ্নের খুব কাছাকাছি অবস্থান এখন তাসনুভার। বর্তমানে তাসনুভা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। নারী হিসেবে কখনো নিজের চলার পথে কোনো বাধার সম্মুখীল হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে আমি নিজে কখনো এমন পরিস্থির শিকার হয়নি। কিন্তু অন্যকে দেখেছি এরকম পরিস্থিতির শিকার হতে। আমার মনে হয় কোনো নারী যখন ইভটিজিং কিংবা যৌন হয়রানির শিকার হন তখন মানবতা লঙ্গিত হয়। এছাড়া এই ধরনের আচরণ যে নারীর সাথে করা হয় তার মনোবলকে একেবারে ধ্বংস করে দেয়া হয়। এতে তার মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটে। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র— কোনো স্থানেই নারী নিরাপদ না। তাই এই বিষয়ে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। পরিবার থেকে শিক্ষা শুরু করতে হবে সবার আগে। আর কোনো নারী যৌন হয়রানির শিকার হন তাহলে চুপ করে না থেকে সাথে সাথে রুখে দাঁড়াতে হবে। নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে বিচার করতে হবে কর্মক্ষেত্রে। তাসনুভা স্বপ্ন দেখেন একদিন বড়ো গবেষক হবেন। দেশের ঔষধ শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যতোটুকু পারেন অবদান রাখবেন।