প্রা ন্তি ক ক র্ম জী বী

নারীদের কথা

রং মিস্ত্রি নূর বানু নূর বানু রং মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন ৭ বছর যাবত্। এ কাজে বলা যায় কেরানীগঞ্জ ও মতিঝিল এলাকায় তার অনেক সুনাম। তিনি শুধু ঢাকা শহরেই কাজ করেন। ঢাকার বাইরে থেকে ভালো কাজের অর্ডার পান; কিন্তু যেতে পারেন না। কারণ ঘরে বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবা-মা। তাদের দেখার কেউ নেই। ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন নূর বানু। ছোটবেলা বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু স্বামীর অত্যাচারে সেই বিয়ে ভেঙ্গে দিল। আর সংসার করেননি। ৭ ভাই-বোনের মধ্যে নূর বানু দ্বিতীয়। ছোট দুই ভাই-বোনকে নিয়ে বাবা-মাসহ থাকেন তিনি। পরিবারের সব দায়িত্ব তার। এই পেশায় আসায় প্রথম প্রথম নানা যন্ত্রণা ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। রং মিস্ত্রি কাজ করে তার সংসার বর্তমানে ভালো চলছে। মানুষের বাজে কথায় তিনি কান দেন না। এক সময়ের অভাবের সংসারে এই সমাজের কেউ সাহায্য করেনি। আর কাজের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে বিভেদ নেই বলে মনে করেন তিনি। কাজ করতে গিয়ে এখনো মাঝে মাঝে মানুষ নামক বন্য পশু পুরুষের মুখোমুখি হন নানা পরিস্থিতিতে। কিন্তু তিনি ভয় পান না। সব পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার সাহস বর্তমানে তার মাঝে আছে। ৮ মার্চ নারী দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে জানতে পারলাম তিনি এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তবে জানার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন। কারণ দেশে সব কিছুতে উন্নতি হলেও নারী নির্যাতন কমছে না। রাজমিস্ত্রি রহিমা বেগম বিল্ডিং নির্মাণ শ্রমিক রহিমা বেগম কমলাপুরে থাকেন। বরিশালে জন্ম রহিমা ১২ বছর আগে ঢাকা শহরে এসে প্রথমে মানুষের বাসায় বুয়ার কাজ করেছেন। এতে তার ৪ সন্তানের সংসারের অভাব দূর হতো না। তারপর রাস্তায় ইট ভাঙ্গার কাজ নিয়েছেন এবং কয়েক বছর এই কাজ করে সাথে থাকা রাজমিস্ত্রিদের দেখে দেখে বিল্ডিং নির্মাণ কাজ শিখেছেন। রহিমা শুধু নাম লিখতে ও হিসেব করতে পারেন। বর্তমানে রাজমিস্ত্রির কাজ করে তার সংসার ভালো চলছে। অসুস্থ স্বামীর সামান্য আয় তার সংসারে দেয়। বাকিটা রহিমার উপার্জনে চলে। একটা রাজমিস্ত্রি গ্রুপের সাথে তিনি জড়িত আছেন। সেই গ্রুপে তিনি একাই নারী। প্রথম প্রথম এই কাজ করতে ভয় পেতেন এবং মানুষের অনেক নিন্দা শুনতে হয়েছে। এখন আর ভয় নেই এবং মানুষের কথা সয়ে গেছে। গ্রুপে থাকা পুরুষদের সমান কাজ করেন। এই কাজ করে সংসারে সচ্ছল ও সুখ আছে। প্রথমে বস্তিতে ছিলেন, এখন ছোট একটা বাসা ভাড়া করে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে থাকেন। শ্রমিক হিসেবে নারী-পুরুষের সমান মজুরি পাওয়া নিয়ে বহু মালিকের সাথে তার ঝগড়া হয়েছে। এখন যদিও সমান টাকা পান তবে সেটা অনেক ঝামেলা করার পর। ৮ মার্চ সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। তবে দেশবাসীকে বলতে চান বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ কাজের নারী- পুরুষ শ্রমিকের মজুরির দিকে যেন একটু নজর দেন। নারী-পুরুষ সমান মজুরি পেতে যেন কোন নারীকে সংগ্রাম করতে না হয়। গাড়িচালক আনোয়ারা বেগম ১৭ বছর ড্রাইভিং জীবনে একটি দুর্ঘটনা হয়নি আনোয়ারা বেগমের হাতে। গাজীপুরে জন্ম আনোয়ারা বেগম ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে সংসারের অভাব দূর করতে গাড়ি চালানোর কাজ নেন। বাবা-মা, ভাই-বোনসহ বড় সংসারে তখন উপার্জন করার কেউ ছিল না। অনেক ভেবে আনোয়ারা এই চাকরি নেন। চাকরি প্রথমে নারী চালক হিসেবে তার যে অপমান ও অপবাদের সময়ের কথা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু আনোয়ারা মনে করেন গাড়ি চালানোর কাজে মেয়েদের জন্য পরিশ্রম কম এবং টাকা বেশি। তাই শত সমস্যার পর তিনি তার কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে তার কর্মক্ষেত্রে তিনি সাফল্যময় একজন নারী গাড়িচালক। গণস্বাস্থ্য সংস্থার ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকের গাড়িচালক হিসেবে বর্তমানে প্রেসক্লাবে সাংবাদিক চিকিত্সার সেবার গাড়িটি তিনি চালাচ্ছেন। ১০ বছরের একমাত্র ছেলে ও গণস্বাস্থ্যে চাকরিজীবী স্বামীকে নিয়ে তার সুখী সংসার। বিয়ের ক্ষেত্রে আনোয়ারা বেগমের কোন সমস্যা হয়নি। তার স্বামী তার পেশা দেখেই বিয়ে করেছেন। পেশার কাজে সারাদেশে ঘুরে বেড়ান তিনি। কিন্তু এই সময়টুকু আসতে আনোয়ারা বেগমের বিগত দিনের কথা ও সময়গুলো খুবই ভয়ঙ্কর। ৮ মার্চ সম্পর্কে তিনি জানেন যে, এদেশে নির্যাতিত নারীদের নিয়ে মিছিল-মিটিং। তবে তার একটি কথা যে, আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় নারী গাড়িচালক নেই বললেই চলে। নারী গাড়িচালকরা খুব সতর্ক ও সত্ভাবে গাড়ি চালান এবং আমাদের দেশের অনেক পরিবারও চায় নারী গাড়িচালক। তাই তিনি চান নারীরা গাড়িচালক হিসেবে অনেক বেশি বেশি থাকুক। এতে আমাদের ঘর, সমাজ ও দেশ নারীদের গাড়িচালক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে আসুক।