আদর্শ একজন দাদী

আমাদের সমাজে অনেক মেধাবী নারী আছেন যারা শুধু গৃহিণী হয়ে অনেক প্রতিকূল পরিবেশে থেকে তাদের সংসার এবং সমাজে আদর্শ ভূমিকা রেখেছেন, দিয়েছেন নানা শিক্ষা ও মহত্ কিছু। তাদেরই একজন, যান নাম হাসিনা আক্তার (হাসি)। তার পরিবারে, গ্রামে, সমাজে সবাই জানেন ত্যাগ দিয়েই এই মহীয়সী মহিলা জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু হাসি নামের মাঝেও লুকানো রয়েছে কান্না। মাত্র তের বছর বয়সে বিধবা হয়েছেন এই মহীয়সী নারী। বিধবা হয়ে তাঁর জীবনটা কাটিয়েছেন স্বামীর বাড়িতে। যে স্বামীর বাড়িতে স্বামীর কবর ছিল না। হঠাত্ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার অনেকদিন পরে জানতে পেরেছেন যে, তার স্বামী মারা গেছেন। ৯ মাস বয়সী একমাত্র পুত্রকে নিয়ে এই মহীয়সী মহিলাই স্বামীর পরিবারের জীবনমঞ্চে আদর্শ ও ত্যাগে দীর্ঘ সময় পার করে এক সময় হয়ে যান দাদী। আর এই পরিবারই হলো দাদী প্রধান পরিবার। দাদী সৈয়দ পরিবারের মেয়ে ছিলেন। দাদীর পরিবার, সমাজ, গ্রাম ছাড়াও তার আত্মীয়-স্বাজন, চেনা-জানা সবাই তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করেন। দাদী সবার দুঃখ-কষ্টে, হাসি- আনন্দে বন্ধু হয়ে আছেন। দাদীর শ্বশুরবাড়ি ছিল জমিদার পরিবার। স্বামী মারা যাবার পর তাঁর শ্বশুরসহ স্বামীর পরিবারে কেউ কম বয়সী ছেলের বউকে রাখতে চায়নি। বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল এবং বাবা, মা, ভাই, বোনেরাও তাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে বলেছিল। কিন্তু দাদী সে পথে যাননি। প্রত্যেকেই নিখুঁত মমতা দিয়ে আগলে রেখেছেন তাকে এবং নিজের আদর্শে পথ চলতে শিখিয়েছেন। এক সময় ছেলের বউ, ভাসুরের ছেলেদের বউ, নাতি-নাতনি, ভাসুরের মেয়েদের নাতি-নাতনি ও তাদের ছেলে-মেয়েদের নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য সদস্য হয়ে যায় তাঁর পরিবারে। আর এই নাতি-নাতনিদের নিজ হাতে, নিজ জ্ঞানে শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলেন। নিজে ছিলেন শিক্ষিত, সুন্দরী, রাঁধুনি ও শিল্পকর্মে পটু, পর্দানশীল, স্মার্ট এবং সদা হাস্যোজ্জ্বল নারী। গুণবতী এই দাদী পারেন নানা শিল্পকর্ম, যেমন- হাতের সেলাই, চট ও সুতার কাজ, বেতের কাজ, বিভিন্নরকম রান্না, মাটি দিয়ে ফুলদানিসহ নানারকম জিনিস বানানো, কাগজের ফুল, পরিত্যক্ত কাগজ দিয়ে নানারকম সাজানোর জিনিস, পাট দিয়ে নানা ফুল, শিকা, মোম দিয়ে খেলনা ইত্যাদি। সেকাল থেকে দাদী মেশিন দিয়ে জামা কাপড় বানাতে শুরু করেন, এখনও ৭০ বছর বয়সে দাদী মেশিনে সেলাই করেন। এতে গ্রামের অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছেন। দাদী প্রধান পরিবারে দাদীর সিদ্ধান্তই হয়ে থাকে তাঁর পরিবারের নিয়ম-নীতি, আয়-উন্নতি, চাকরি, ব্যবসা, পড়ালেখা, বিয়ে, আনন্দ-উত্সব পার্বণ সবকিছুই। তাঁর গ্রামের অনেক মানুষ তাঁর সিদ্ধান্তে নিজেদের পরিবারে অনেক কিছু করে থাকেন। গ্রামে তাঁকে একজন মহত্, ত্যাগী, নিরপেক্ষ, ধার্মিক মহিলা হিসেবে মহিলা মহলে তিনি দৃষ্টান্তকারী। পর্দানশীল হয়েও তিনি তাঁর পরিবার, সমাজ, গ্রাম, আত্মীয়-স্বজন চেনা-জানা সবার কাছে অনেক ভূমিকা রেখেছেন এবং বিভিন্ন শিক্ষা দিচ্ছেন। সে সময় তিনি মাত্র ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর উত্সাহে ভাগ্নীরা আছেন অনেকজন এবং তারা বড় বড় পদে আছেন। সেসব ভাগ্নে-ভাগ্নী সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করেন এবং তাদের জীবনযাত্রার অনেক সিদ্ধান্ত দাদীকে নিয়েই করে থাকেন। নিঃস্বার্থভাবে নানা সাহায্য করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং গ্রামের মানুষকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাই তাঁর গ্রামে তিনি সবার সম্মানের পাত্রী। স্মার্ট নেতৃত্বশীল, সদা প্রফুল্ল, জ্ঞানী, সুন্দরী এই মহীয়সী দাদীকে একবার চোখে দেখলেই মনে হবে শ্রদ্ধা করি। বর্তমানে ধীরে ধীরে দাদীর ব্যস্ততা কমে যাচ্ছে। প্রায় সর্বগুণে গুণান্বিত এই দাদী এমন কোন শিল্পকর্ম, রান্না, সৌখিনতা জানেন না, সেটা বলা যাবে না। অনেক গুণ, রূপ ও যোগ্যতা থাকার পরও নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন সেবা ও ত্যাগের মাধ্যমে। তাই দাদীর শ্লোগান হলো মানুষের সেবা, শান্তি, ত্যাগ! আর আমরা সাধারণ মানুষ দাদীর জীবন থেকে যা শিখি তা হচ্ছে নারীরা অসহায় হওয়ার পরও প্রতিকূল পরিবেশে থেকে ত্যাগ ও মহত্ত্ব দিয়ে কিভাবে নিজেকে শ্রদ্ধা এবং সম্মানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। পরিবারে অনেকে দাদীর আদর্শে বড় হয়ে বিভিন্ন কর্মে, সংসার করে দূরে চলে যাচ্ছে।