সক্রেটিস :দর্শন শাস্ত্রের জনক

যে মানুষ সত্, ইহলোকে বা পরলোকে তার কখনো কোন ক্ষতি হতে পারে না — সক্রেটিস। সক্রেটিস এক দরিদ্র কারিগরের ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন। গ্রিসের তত্কালীন সমৃদ্ধ শহর এথেন্সে ৪৬৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা লাভের তেমন সুযোগ হয়নি।কিন্তু তিনি স্বীয় বুদ্ধি- বিবেক, মেধা- মননের সাহায্যে সৃষ্টি করেছিলেন এক গভীর জ্ঞানভাণ্ডার । সক্রেটিস দেখতে ছিলেন খুব সাদামাটা গোছের। পোশাকের ব্যাপারেও ছিলেন খুব সাদামাটা।তিনি কখনও জুতো পায়ে দিতেন না। পোশাকের ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন— ‘পোশাক দিয়ে কী হবে?’। পোশাক তো বাহিরের আবরণ মাত্র। জ্ঞানই হল আসল সৌন্দর্য। যৌবনে তিনি সৈনিক ছিলেন । তাঁর ধৈর্য এবং কষ্টসহিষ্ণুতা ছিল প্রচণ্ড । পরে তিনি সৈনিক বৃত্তি ত্যাগ করে এথেন্স শহরে স্থায়ীভাবে বাস করেন । সারাজীবন কাটিয়েছেন দারিদ্রের মধ্যে । রোগীর সেবা,পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য। কোন্ আহার স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী প্রভৃতি বিষয় ছাড়াও কিছু নীতিকথা তিনি বন্ধুদের আড্ডায় বলতেন । তাঁর বন্ধু বা শিষ্যদের মধ্যে প্রধান ছিলেন প্লেটো। প্লেটোর বিখ্যাত শিষ্য এরিস্টটল।এঁদের মধ্যে দিয়েই সক্রেটিস বেঁচে আছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন শিক্ষাই মানুষের শ্রেষ্ট সম্পদ। শিক্ষার দ্বারাই মানুষের অন্তরের অজ্ঞতা দূর হয়। জ্ঞানের জ্যোতি মানুষকে সত্যের স্বরূপ চিনতে শেখায়। অজ্ঞানতাই সমস্ত পাপের জন্ম দেয় । অনেকের কাছেই সক্রেটিস ঈর্ষণীয় ছিলেন। কারণ সে সময় এথেন্সে জ্ঞানী বলে বিবেচিতজনেরা সক্রেটিসের যুক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতেন । কিন্তু সক্রেটিসের প্রধানতম বাণী ছিল— Think deeper । অনেকের জ্ঞানের অহঙ্কার সক্রেটিসের কাছে চূর্ণ হয়েছিল । সক্রেটিসের জ্ঞান আর বিচক্ষণতা তথাকথিত জ্ঞানীদের ক্রুদ্ধ করে তোলে এবং তাঁরা সংঘবদ্ধ হয়ে সক্রেটিসের বিরূদ্ধে কতিপয় মিথ্যে অভিযোগ আনেন এবং একসময় বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়। সক্রেটিস প্রতীয়মান করেছিলেন যে যাঁরা বেশি খ্যাতিমান তাঁরাই সবচেয়ে অল্প জানেন। ঠিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এমন একটি উক্তি করেছেন—যাহার যোগ্যতা যতকম তাহার আড়ম্বর তত বেশি। সক্রেটিস কবি ,রাজনীতিজ্ঞ,শিল্পী,শ্রমিক সকলের কাছেই গেছেন । কিন্তু দেখেছেন যিনি যতটুকু জানেন তার চেয়ে তাদের অহঙ্কার অনেক বেশি। আর এরাই ছিলেন সক্রেটিসের শত্রুর তালিকায়। মৃত্যুর দিন সকালে হেমলকের পাত্র এগিয়ে ধরল জল্লাদ । সক্রেটিস অত্যন্ত ধীরে , স্বাভাবিকভাবে হেমলক (তীব্র বিষ) পান করলেন । তাঁর মৃত্যু হলো। সময়টা ছিল ৩৯৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ। সক্রেটিস মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অমৃতলোকে গমন করেছেন আর তাঁর দর্শন,আদর্শ আজও চিরন্তন হয়ে আছে ।