আগামী দশকের জন্য চীনে নতুন নেতৃত্ব
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৩
চীনে আগামী এক দশকের নেতৃত্বের পরিবর্তন হতে চলেছে। আগেই নেতা নির্বাচিত করা হয়েছিলো। এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের চূড়ান্ত আয়োজন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) বার্ষিক পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ অধিবেশনেই আগামী দশ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও-এর স্থলাভিষিক্ত হবেন কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান শি জিনপিং আর প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও’র স্থলে আসবেন লি কেকিয়াং। গত বছরের নভেম্বরেই পদ দুটিতে তাদের মনোনীত করা হয়েছিল।
সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে গত মঙ্গলবার শুরু হয় পার্লামেন্ট অধিবেশন। অধিবেশনে এনপিসির প্রায় ৩ হাজার নেতৃবৃন্দ যোগ দিচ্ছেন যাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা, জেনারেল, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। তিব্বতের বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও রয়েছেন। সরকারের অন্যান্য শীর্ষ পদগুলোতে কারা নিয়োগ পাচ্ছেন তাও জনগণ প্রত্যক্ষ করবে এ অধিবেশনের ওপর চোখ রেখেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হু জিনতাওয়ের সময়ে বৃদ্ধি পাওয়া অর্থনৈতিক অসমতা ও দুর্নীতির চাপ শি জিনপিংয়ের সরকারকে মোকাবেলা করতে হবে। বলা হচ্ছে, এবারের পার্লামেন্ট অধিবেশনে সরকারের উচ্চাভিলাসী অর্থনৈতিক নীতির কথা তুলে ধরা হবে। যেখানে নতুন প্রবৃদ্ধি মডেল, রপ্তানি বৃদ্ধির সাথে সাথে অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বৃদ্ধি ও সামাজিক কল্যাণে অর্থ বৃদ্ধির মতো বিষয় থাকবে। এ অধিবেশনের বিষয়ে সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, ১০ দিনের এ অধিবেশন হবে গণতান্ত্রিক এবং অগ্রগতিশীল। আইন প্রণেতারা প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে নির্বাচন করবেন। প্রধানমন্ত্রীসহ দশ বছরের জন্য দেশের নেতৃত্ব দেবেন এমন মন্ত্রীদেরও নির্বাচন করা হবে।
চীনের নির্বাচনকে একটি তাত্ত্বিক বিষয় বলা চলে। প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীরা ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতাশালী নেতাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আগেই নির্বাচিত হন। এখানে পলিটব্যুরো ও পলিটব্যুরো স্টান্ডিং কমিটির সদস্যরা থাকে। এনপিসি থেকে শুধু নেতাদের সিদ্ধান্তের বৈধতা দেয়া হয়। দশ বছরের জন্য পার্টির প্রধান হচ্ছেন শি জিনপিং। পার্টির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং। যদিও প্রধানমন্ত্রী চীনের শীর্ষ প্রশাসনিক পদ। ৫৭ বছর বয়সী লি কেকিয়াং হেনান প্রদেশের পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। অর্থনীতিতে ডক্টরেট এ নেতা দেশটির অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।
চীনে সদ্য বিদায়ী নেতারা ছিলেন টেকনোক্র্যাট। প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও হাইড্রোইলেকট্রিক (জলবিদ্যুত্) ইঞ্জিনিয়ার। আর প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও ছিলেন একজন জিওলজিস্ট (ভূতত্ত্ববিদ)। সাংহাইভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য বিশ্লেষক ওয়াং লি’র মতে দেশের অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার অভাব ছিলো। তবে শি জিনপিং এবং লি কেকিয়াং ছিলেন অর্থনৈতিক মন্ত্রী পরিষদের সদস্য। আইন ও অর্থনীতিতে তাদের দক্ষতা রয়েছে। এছাড়া নতুন চীনা নেতাদের বেশির ভাগই বেড়ে উঠেছেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব, কারখানায় কাজ আর গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র পরিবারের মাঝে। তাই তারা ভালো করে জানেন কারা দেশটির বিকাশমান অর্থনীতিতে পেছনে পড়ে রয়েছে। এজন্য অতীতের ‘যেকোনো মূল্যে প্রবৃদ্ধি’ অর্জনের ধারণা থেকে সরে আসতে পারেন তারা। পরিবেশ রক্ষা এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে যে ব্যবধান বেড়েছে তা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে জোর দিতে পারেন।
এমন সময় চীনা নেতৃত্বে পরিবর্তন আসলো যখন দেশটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বর্তমানে চীনের অনেক এলাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ। ২০১২ সালে দেশটিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিলো ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ গত দশ বছরে চীনের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমতে থাকায় দেশটির রফতানিও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় দেশটির সরকার ২০১৩ সালে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
চীনে বর্তমানে ৩১৭ জন বিলিওনিয়ার রয়েছেন। যা বিশ্বের মোট বিলিওনিয়ারদের এক-পঞ্চমাংশ। দেশটি ২০১৬ সালের মধ্যে বিলাসী গাড়ির বাজারে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ এখনো দৈনিক সোয়া ডলারের বেশি আয় করতে পারে না। এ অর্থনৈতিক বৈষম্য এখন চীনের বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সামাজিক কল্যাণ খাতে অর্থ ব্যয় দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদ লি গ্যান বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে আরো বড় পরিসরে পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্থনীতি ছাড়াও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে নগরায়ন। বর্তমানে চীনের ১৩০ কোটি মানুষের ৩০ শতাংশ শহরে বাস করে। যা ২০২০ সালে দ্বিগুণ হবে। তাই চীন সরকার নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ব্যয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। চীনের নতুন নেতৃত্ব মনে করছে নগরায়নের ফলে লাখ লাখ কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন হবে এবং দেশি ভোক্তা বৃদ্ধি পাবে। যদিও অনেক বিশ্লেষকের মতে, এ জন্য অযৌক্তিভাবে ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। নগরায়নের কারণে নতুন সংকটও তৈরি হবে। জনসংখ্যা চীনের অন্যতম বড় সমস্যা। ৭০ দশকের শেষ দিক থেকে ১ শিশু নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছে সরকার। তবে এখন যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তাহলো লিঙ্গ পক্ষপাত। ছেলে সন্তানের দিকে এ ঝোঁক রয়েছে। আর একটা সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে নতুন সরকারকে। সেটা হলো চীনের বায়ু, পানি ও খাদ্য নিশ্চিত ও নিরাপদ করা। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে পরিবেশ দূষণও বাড়ছে।
চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে দুর্নীতি। চীনের নতুন শীর্ষ নেতা শি জিনপিং দুর্নীতি প্রতিরোধকে তার এক নম্বর লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। জিনতাওয়ের মতো তিনিও কয়েকটি ভাষণে বলেছেন, দুর্নীতি দেশের পতনেরও কারণ হতে পারে। গত নভেম্বরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে ওয়াং কিশানকে দেশটির সর্বোচ্চ দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশনের (সিসিডিআই) সচিব করা হয়েছে। সিপিসি সেন্ট্রাল কমিটির পলিট ব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এখন দেখার বিষয়, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুতি রয়েছে এই নতুন নেতৃত্বের।