গলে বাংলাদেশের মহাকাব্য

প্রকৃতি এখানে সবসময়ই বিরূপ। কখনো প্রবল উত্তাপ, কখনো আবার ঝড়ো তাণ্ডব। ঝড়, ভূমিকম্প, সুনামির তাণ্ডবে প্রায়শ কেঁপে কেঁপে উঠে শ্রীলঙ্কার উপকূলের এই শহর গল। দুর্গনগরী গল কাল আবার এক তাণ্ডবে কেঁপে উঠল। না; এবার আর সুনামি বা ভূমিকম্প নয়। এবার গল কাঁপিয়ে দিল বাংলাদেশের সর্বকালের অন্যতম প্রতিভাধর ব্যাটসম্যান বলে বিবেচিত মোহাম্মদ আশরাফুলের তাণ্ডব। আশরাফুলের মহাকাব্যিক ইনিংসের সঙ্গে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমও গলকে কাঁপালেন আরেক দানবীয় ইনিংস খেলে। আর এই দু’জনের সম্মিলিত তাণ্ডবে নিজেদের একটার পর একটা রেকর্ড ভেঙে কাল অন্যরকম এক উচ্চতায় পৌঁছে গেল বাংলাদেশ। দেশের সর্বোচ্চ, আশরাফুলের অপরাজিত ১৮৯ রান এবং দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ মুশফিকুরের অপরাজিত ১৫২ রানে ভর করে কাল গল টেস্টের তৃতীয় দিনে মাত্র ২টি উইকেট হারিয়ে আরও ৩০৩ রান যোগ করল বাংলাদেশ; সাকুল্যে প্রথম ইনিংসে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ৪৩৮ রান! গল ঐতিহ্যগতভাবে স্পিন বোলারদের জন্য স্বর্গ বলে বিবেচিত হয়। সেই মুত্তিয়া মুরালিধরন, শেন ওয়ার্ন থেকে এই সময়ের রঙ্গনা হেরাথ পর্যন্ত এই স্টেডিয়ামে ভূরি ভূরি উইকেট নিয়ে ব্যাটসম্যানদের জন্য বধ্যভূমি বানিয়েছেন গলকে। কিন্তু প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশী স্পিনারদের, তথা বোলারদের উল্টো ‘বধ করে’ শ্রীলঙ্কা ৪ উইকেটে ৫৭০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করেছিল। জবাবে ধরেই নেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ সব সময়ের মতো মুখ থুবড়ে পড়বে। দিনের শুরুটা সে রকমই হয়েছিল। আগের দিন ২ উইকেট হারিয়ে ১৩৫ রান তোলা বাংলাদেশ ১৭৭ রানে হারিয়ে ফেললো চতুর্থ উইকেট। ৫৫ রান করে ফিরলেন অভিষিক্ত মোমিনুল এবং কোনো রান না করেই উচ্চাভিলাষী এক শট খেলতে গিয়ে আউট মাহমুদউল্লাহ। উইকেটে তখন ধিকি ধিকি হয়ে টিকে আছেন আগের দিনের অপরাজিত ব্যাটসম্যান আশরাফুল। এই সময়ই আশরাফুলের সঙ্গে যোগ দিলেন মুশফিকুর। আর এই জুটিই যেন ‘ম্যাজিক’ শুরু করল গল স্টেডিয়ামে। সেই সকালে ২ উইকেট হারানোর পর সারা দিনে আরও দুটো সেশন কেটে গেল; আর কোনো উইকেটের দেখা পেল না লঙ্কান বোলাররা। শুরু হলো এক অসাধারণ জুটির যাত্রা। আর এই যাত্রাপথে ভেঙে যেতে থাকল একটার পর একটা রেকর্ড। প্রথমেই ২০০ রানের জুটি পার করার ভেতর দিয়ে দেশের হয়ে যে কোনো উইকেট জুটিতে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড করে ফেললেন আশরাফুল-মুশফিক; ৫ম উইকেটে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত দু’জনের সংগ্রহ ২৬১ রান! এর মধ্যে আশরাফুল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নিজের পঞ্চম ও ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে গেলেন। এই নিয়ে তিন বছর পর আবার টেস্ট সেঞ্চুরি করলেন; সর্বশেষটাও ছিল এই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। সেঞ্চুরির পরও চললো আশরাফুলের মহাকাব্য। এক পর্যায়ে দেশের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসাবে ১৫০ রান পার করে ফেললেন; নিজে এই কাজ করলেন দ্বিতীয়বার। এরপর নিজেরই করা ভারতের বিপক্ষে সেই অপরাজিত ১৫৮ রানের ইনিংস পার করে দেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটা আরও লম্বা করে ফেললেন। আশরাফুল যে ওভারে ১৫০ স্পর্শ করলেন, পরের ওভারেই ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করে ফেললেন মুশফিকুর রহিম। একদিকে প্রতিপক্ষ ও বিশ্বের দৃষ্টি যখন আশরাফুলের দিকে; মুশফিক তখন সেঞ্চুরি পার করে একটু বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন যেন। ফলে আশরাফুল আর ৩০ রান করতে না করতেই দেশের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসাবে ১৫০ রানের ঘর পার করে ফেললেন মুশফিকও। বলাই বাহুল্য, এখন দেশের সর্বোচ্চ তিনটি ব্যক্তিগত ইনিংসের দু’টিই হলো গতকাল; আর তিনটিরই মালিক তারা দু’জন! এই দুই ইনফর্ম ব্যাটসম্যান অসমাপ্ত বীরত্বগাঁথা নিয়ে যখন মাঠ ছাড়ছেন; তাদের নামের পাশে ছোট-বড় আরও অনেক কীর্তির রেকর্ড। ৪ উইকেটে এই ৪৩৮ রান বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। এই স্কোরটি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। এই জুটিটি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পঞ্চম উইকেটে যে কোনো দেশের সর্বোচ্চ রানের জুটি। তবে এসব পরিসংখ্যান দিয়ে আশরাফুল-মুশফিকের কীর্তি বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে না; চিরকালের ভয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একদিনের জন্য হলেও কেমন রাজত্ব করলেন বাংলাদেশের এই দুই ব্যাটসম্যান। বাকি দু’ দিন এই রাজত্ব ধরে রাখলে কে জানে, নতুন কিছুও ঘটতে পারে! বাংলাদেশের সেরা টেস্ট জুটি ব্যাটসম্যান জুটি রান প্রতিপক্ষ ভেন্যু আশরাফুল-মুশফিক ৫ম ২৬১* শ্রীলঙ্কা গল তামিম-জুনায়েদ ২য় ২০০ ভারত ঢাকা আশরাফুল-মুশফিক ৬ষ্ঠ ১৯১ শ্রীলঙ্কা কলম্বো বাংলাদেশের সেরা টেস্ট ইনিংস ব্যাটসম্যান রান প্রতিপক্ষ ভেন্যু মোহাম্মদ আশরাফুল ১৮৯* শ্রীলঙ্কা গল মোহাম্মদ আশরাফুল ১৫৮* ভারত চট্টগ্রাম মুশফিকুর রহিম ১৫২* শ্রীলঙ্কা গল তামিম ইকবাল ১৫১ ভারত ঢাকা আমিনুল ইসলাম ১৪৫ ভারত ঢাকা স্কোর কার্ড শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংস:৫৭০/৪ (ডিক্লেয়ার্ড)। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস জহুরুল ক চান্দিমাল ব এরাঙ্গা ২০ এনামুল ব মেন্ডিস ১৩ আশরাফুল অপরাজিত ১৮৯ মমিনুল ক ম্যাথিউস ব কুলাসেকারা ৫৫ মাহমুদুল্লাহ স্টা চান্দিমাল ব হেরাথ ০ মুশফিক অপরাজিত ১৫২ অতি (বাই ২, লেগ বাই ১, নো বল ৬) ৯ মোট (৪ উইকেট, ১৩৬ ওভার) ৪৩৮ উইকেট পতন : ১-২৩ (জহুরুল ৭.৫) ২-৬৫ (এনামুল ২৩.৬) ৩-১৭০ (মমিনুল ৫২.৩) ৪-১৭৭ (মাহমুদুল্লাহ ৫৩.৬)। বোলিং: কুলাসেকারা : ২১-৩-৭৬-১ এরাঙ্গা : ২২-৩-৮০-১ হেরাথ: ৪২-৯-১০৩-১ মেন্ডিস: ২৩-২-৯২-১ ম্যাথিউস: ৬-১-১৬-০ দিলশান: ২০-৩-৫৫-০ থিরিমান্নে: ২-০-১৩-০।