গুলিতে কনস্টেবল নিহত
খুলনা অফিস ও কয়রা সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৩, ২২:২৪
আসামি ধরতে গিয়ে জামায়াতের কর্মী-সমর্থক ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে খুলনার কয়রা উপজেলার আংটিহারা ফাঁড়ি পুলিশের একজন কনস্টেবল নিহত হয়েছেন। তার নাম মফিজুর রহমান (৪৬)। গত শনিবার দিবাগত গভীর রাতে কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের গোলখালি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে ফাঁড়ি পুলিশের আরও কয়েকজন সদস্য এবং সাত-আটজন গ্রামবাসী আহত হয়েছে। এর মধ্যে মহিবুল্লাহ ও বাশার মোড়ল নামে দুই গ্রামবাসীর অবস্থা গুরুতর বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।
এ ঘটনার পর গতকাল রবিবার এলাকায় নতুন করে আসামি গ্রেফতারে অভিযান চালানো হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি।
জানা গেছে, গত ৫ মার্চ বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় গত ৯ মার্চ স্থানীয় গোলখালি গ্রামের রেজাউল মোড়ল বাদী হয়ে ৩৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০০-১৫০ জনের নামে কয়রা থানায় একটি মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কয়রার আংটিহারা পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোমিন গত শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে আসামি ধরতে গোলখালি গ্রামে অভিযান চালান।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, পুলিশ মামলার এক নম্বর আসামি স্থানীয় জামায়াত নেতা গনি সরদারের বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে তার কলেজ পড়ুয়া ছেলে সিরাজুলকে আটক করে। সিরাজুল আসামি না হওয়ায় তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য চেষ্টা করে মা তার আয়েশা খাতুন। তাদের চিত্কারে সেখানে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীসহ গ্রামের সাধারণ লোকজন জড়ো হয়। এক পর্যায়ে তারা পুলিশের কাছ থেকে সিরাজুলকে ছিনিয়ে নেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির ও সাধারণ গ্রামবাসীর সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষ চলাকালে গ্রামবাসীকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ২৫টি রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি ছোঁড়ে। এতে গোলখালি গ্রামের আবুল বাশার মোড়ল (৫২), মহিবুল্লাহ গাজী (১৮), হালিমা বেগম (৪০), জাহেদা বেগম (৪৫), সাহিদা বেগম (৪৫), জাহানারা বেগম (৩৬) ও মেহেরুন নেছা (৩৫) গুলিবিদ্ধসহ আরো ৪-৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। এক পর্যায়ে পুলিশ পিছু হটে ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার সময় জামায়াত-শিবির কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে বলে অভিযোগ করেন খুলনা জেলা পুলিশের সহকারি পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) আব্দুল কাদের বেগ। একটি গুলি কনস্টেবল মফিজুর রহমানের বাম পায়ের হাঁটুর কাছে বিদ্ধ হয়। তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাটকাটা গ্রামে পৌঁছালে শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। তবে পুলিশের গুলিতে আহত গ্রামবাসীদের কোথায় ভর্তি করা হয়েছে গতকাল রবিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তা জানা যায়নি।
অপর একটি সূত্র জানায়, শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে সুন্দরবন সংলগ্ন আংটিহারা ক্যাম্প থেকে ১৩ জন পুলিশ সদস্য জামায়াত অধ্যুষিত গোলখালি গ্রামে গিয়ে প্রথমে স্থানীয় জামায়াত নেতা গণি সরদারকে গ্রেফতার করে। পরে জামায়াতের আরেক নেতা আব্দুর রশীদ সরদারকেও গ্রেফতার করা হয়। এই খবরে এলাকার জামায়াত সমর্থকরা পার্শ্ববর্তী মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেয় যে, ‘পুলিশ আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, আপনারা যে যেখানে আছেন এগিয়ে আসেন।’ এরপর এলাকার কয়েকশ’ নারী-পুরুষ সমবেত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। তারা গ্রেফতারকৃত আসামিদের ছিনিয়ে নেয়। পুলিশ অবস্থা বেগতিক বুঝে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। তখন জামায়াতের নেতাকর্মীরা পাল্টা গুলি ছুঁড়লে কনস্টেবল মফিজুর বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে সহকর্মীরা তাকে নিয়ে পিছু হটে।
নিহত কনস্টেবল মফিজুর রহমান নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়নের কুমড়ি গ্রামের আব্দুস সালাম শেখের ছেলে। খুলনা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংঘর্ষের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ৫ মার্চের ঘটনায় গত শনিবার বিকাল পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি বলে পুলিশ তাকে জানায়। হঠাত্ মামলা রেকর্ড করে তাত্ক্ষণিক পুলিশ আসামি ধরতে গেলে গ্রামের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় গ্রামবাসী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রতিপক্ষের হামলায় পুলিশ মারা গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ ব্যাপারে কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলুর রহমান বলেন, আসামি ধরতে পুলিশ সদস্যদের সেখানে পাঠানো হয়েছিল। গ্রামের লোকেরা সহায়তা না করে উল্টো গুলি করে পুলিশকে হত্যা করেছে।
খুলনা জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (বি সার্কেল) আব্দুল কাদের বেগ বলেন, জামায়াত-শিবিরের গুলিতে কনস্টেবল মফিজুর রহমান নিহত হয়েছেন। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মফিজুরের লাশের ময়না তদন্ত হয়েছে। পুলিশ সদস্য খুনের ঘটনায় গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।
দাফন সম্পন্ন, বাড়িতে শোকের মাতম
আমাদের লোহাগড়া (নড়াইল) সংবাদদাতা জানান, নিহত কনস্টেবল মফিজুর রহমানের দাফন গতকাল রাতে তার নিজ বাড়ি লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ি গ্রামে সম্পন্ন হয়েছে।
গতকাল মফিজুরের লাশ এসে পৌঁছালে কুমরি গ্রামের বাড়িতে এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। নিহতের ছোট ভাই নূর ইসলাম জানান, মফিজুরের দরিদ্র পরিবারটির নিজস্ব তেমন কোন জমিজমা নেই। তার আয়ের ওপরই সংসার চলত। মফিজুরের ২ ছেলে ও স্ত্রী রয়েছেন। বড় ছেলে পারভেজ শেখ (২০) লোহাগড়া আর্দশ কলেজে অনার্স ২য় বষের্র ছাত্র। ছোট ছেলে সাগর শেখ (১৬) কুমড়ি আলীয়া মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র।