মো. আমিরুজ্জামান (সৈয়দপুর, নীলফামারী)
দেশে এক সময় সার্কাস ও যাত্রাপালায় বিভিন্ন রকম খেলা প্রদর্শন করা হতো। মোটরসাইকেল বা কারের প্রদর্শনী তেমন একটা দেখা যেত না। এরইমধ্যে বিভিন্ন শহরে বেশ জনপ্রিয় ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এ মৃত্যুকূপ খেলা। অত্যন্ত রোমাঞ্চকর, শ্বাসরুদ্ধকর এ খেলাটি না দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই।
নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরের ইসলামবাগ এলাকার গোলাম রব্বানীর পুত্র এসএম রাশেদ তরুণ বয়সে এক বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঞ্জার গেম বা মুত্যুকূপ খেলার আয়োজন করে পেয়েছেন বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার। তিনি প্রথমে এ পেশায় আসেন বাবা এবং বড় ভাইয়ের হাত ধরে ২০০৩ সালে। বাবা সরকারি চাকরি করতেন পাশাপাশি মোটরসাইকেল প্রদর্শনী করতেন। বয়সের ভারে বাবা এ কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন, কিন্তু তিনি ও তার বড় ভাই সারোয়ার হোসেন নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন দুঃসাহসিক এ খেলাটি।
চার ভাই তিন বোন তাঁরা। ভাইবোনের মধ্যে রাশেদ তৃতীয়। সৈয়দপুর রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও সৈয়দপুর মহাবিদ্যালয় থেকে পড়া লেখা শেষ করেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় এ খেলা প্রদর্শনী করে সকল বয়সের মানুষে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন। এ বছর ঢাকা বাণিজ্য মেলায় অংশ নিয়ে সববয়সী মানুষের মন জয় করেন। শুধু ঢাকাবাসী নন, ভারত ও নেপালের মানুষদেরও মন জয় করে এসেছেন তিনি। সহযোগিতা পেলে বিদেশে এই খেলায় অংশ নিয়ে দেশের সুনাম বয়ে আনতে চান তিনি। শুধু এ খেলাই নয়, গানের গলাও তাঁর বেশ মধুর। গান গেয়ে বন্ধুদের আড্ডা মাতিয়ে রাখেন তিনি। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবামূলক সংগঠনেরও সদস্য। মানুষের দুঃখ দেখলে নিজের সবকিছু উজাড় করে দিতে চান। এ সব কারণে বন্ধুদের কাছেও তিনি খুব প্রিয় এবং পরিবারের সকলের মধ্যমণি।
দাদা আবদুর রাজ্জাক ১৯৬২ সালে মোটরসাইলে নিয়ে অনেকটা শখের বসবতী হয়ে ডেঞ্জার গেম নামে এ খেলার প্রদর্শনী শুরু করেন। সে থেকে এ খেলাটি তাদের পারিবারিক পেশায় রূপ নেয়। বাবা গোলাম রব্বানী ১৯৮৬ সালে ময়মনসিংহের উর্বরা প্রদর্শনী মেলায় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের হাতে কৃতিত্বের সম্মাননা পেয়েছেন। তেমনি বড় ভাই সারোয়ার হোসেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১ বেঙ্গল রেজিমেন্টের লে. কর্নেল মিজানুর রহমানের হাত থেকে পেয়েছেন পুরস্কার।
রাশেদ বলেন, ‘১৯৬২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দাদা থেকে শুরু করে আমরা আমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত তিন পুরুষ এ পেশার হাল ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। যা এ পেশায় কেউ ধরে রাখতে পারেনি। দেশের এমন জায়গায় প্রদর্শনী করেছি যেখানকার দর্শনার্থীরা আমাদের শহরের আমার জন্মস্থানের নাম জানে না, কখনো শোনেনি সৈয়দপুর শহর কোথায়। আমি সৈয়দপুর শহরের সন্তান হয়ে গোটা দেশে আমার জন্মস্থানের নাম ছড়িয়ে বেড়াই। দেশে অনেক সুনাম অর্জন করেছি।’
গোলাম রব্বানী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার বাবা, আমি ও আমার সন্তানরা এ খেলা প্রদর্শন করে দর্শকদের অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছি। মানুষ খেলা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে। আবার অনেকে খেলা শেষে আমাকে স্পর্শ করে দেখে আমি আসলে মানুষ নাকি ভূত। আমরা খেলা প্রদর্শনকালে অনেকবার দুঘর্টনায় আহতও হয়েছি। চিকিত্সাভার নিজেই নিতে হয়েছে। কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পাইনি। এছাড়া এ খেলাটির রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। অথচ বর্তমানে এ খেলাটি ক্রিকেট, ফুটবলের মতো দর্শকপ্রিয় হয়ে উঠছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ খেলার মান এবং সুনাম দুটোই ছড়িয়ে যাবে দেশ-বিদেশে।’