যাদুকর
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৩, ১৭:৫২
আমাদের হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো। তবুও আমরা হাঁটছি। যেতে হবে অনেক দূরে। আমরা চার বন্ধু, আমি রাখাল, মানিক, জয়দীপ আর মেঘনা। যাচ্ছি যাদু শিখতে। আমরা শুনেছি নারকেলডাঙ্গায় কে একজন এসেছে, যে যাদু শেখায়। আর যাদু দেখায়। শুনেছি যাদুকর নাকি নিমিষে লাল গোলাপ বানাতে পারে।
আমাদেরকে প্রথমে খবরটা দেয় মেঘনা। আমরা উঠোনে মার্বেল খেলছিলাম আম গাছের ছায়ায়। তখন মেঘনা ওদের বাড়ি থেকে দৌড়ুতে দৌড়ুতে আসে আমাদের কাছে, এ্যাই তোরা শুনেছিস?
বিরক্তির সঙ্গে তাকাই আমরা মেঘনার দিকে।
কী শুনবো শুনি? বাজখাই গলায় প্রশ্ন করে জয়দীপ।
মস্তবড় একজন যাদুকর এসেছে।
যাদুকর?
আমি যাদু সব সময়ে খুব ভালোবাসি। যাদুকরকে আমার মনে হয়, অনেক অনেক বড় একজন মানুষ। যে মানুষকে দু’হাতে পাওয়া যায় না। তাকে স্পর্শ করা যায় না। কী তার ক্ষমতা, শূন্য হাতে নিমিষে ভরে ফেলে সোনার মোহরে, সবার সামনে। আবার একই হাতের মুঠোয় জন্ম নেয় জ্যান্ত কবুতর। কেবল কী তাই? কারো পকেট থেকে বের করে আনে কানের দুল নয়তো হাতের আংটি। কেমন করে পারে? আমার খুব ইচ্ছে আমি যাদুকর হবো। আর যাদুকরের মতো গামছায় মুড়ি ভেজে সারাদিন রাত খাবো। মুড় মুড় করে মুড়ি খেতে আমার যে ভীষণ ভালো লাগে।
আমি মেঘনাকে জিজ্ঞেস করি, কোথায় সে যাদুকর?
নারকেলডাঙ্গায়।
নারকেলডাঙ্গাটা আবার কোথায়?
আমার নানা বাড়ির কাছে।
কীভাবে যাওয়া যায়?
এখান থেকে হেঁটে রাজপাশা। রাজপাশায় একটি ছোট্ট হাট আছে। হাটের পরেই একটা খাল। খালে একটা সাঁকো আছে, সেই সাঁকো পার হবার পরই একটা বড় মাঠ। বড় মাঠের পর একটা বড় বট গাছ। সেই বট গাছটার পরই হলো আমার নানা বাড়ি— নারকেলডাঙ্গা।
আমাকে নিয়ে যাবি? আমি মিনতি করি মেঘনাকে। জানিস, আমার না যাদুকর হতে ভীষণ ইচ্ছে করে।
আমাদের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় মানিক, এ্যাই রাখাল? এদিকে আয়।
আমি খেলবো না?
তেড়ে আমার দিকে আসে জয়দীপ— ফাজলামো পেয়েছো না? মার্বেল খেলে সব জিতে এখন বলছে খেলবে না? আমাদের সঙ্গে খেলতে হবে।
আমি বলি, ঠিক আছে তোরা আমার সব মার্বেল নিয়ে যা। আমি খেলবো না— বলতে বলতে আমি কোচর থেকে সব মার্বেল ফেলে দিলাম। মার্বেলগুলো আমার আর মেঘনার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মানিক আর জয়দীপ পাগলের মতো মার্বেল কুড়োতে থাকে। এই ফাঁকে আমি আর মেঘনা হাত ধরে ছুটি যাদুকরের জন্য, নারকেলডাঙ্গায়।
কিন্তু এতো দূর নারকেলডাঙ্গা, যদি জানতাম, তাহলে কী আসতাম? মেঘনার কথায় বুঝতে পারিনি। আমরা হাঁটতে হাঁটতে রাজপাশা ছাড়িয়ে, সাঁকো ছাড়িয়ে আবার হাঁটছি। কিছুদূর হাঁটার পর দেখি একটা বিরাট বটগাছ। আমরা দৌড়ে বটগাছের নিচে যাই।
বটগাছের নীচে অনেক মানুষ। তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর বটগাছের গোড়ায় একজন মানুষ। হাতে তার বাঁশি। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। কাঁধে চাদর। নাকের নীচে একজোড়া কাঁচাপাকা গোঁফ। মুখে মিষ্টি হাসি। কী কথায় লোকজন কেমন হাসছে।
বাচ্চালোগ তালি বাজাও....। যাদুকর বলার সঙ্গে সঙ্গে বটতলার সবাই তালি বাজাতে থাকে। মনে হচ্ছে হাতের তারায় খৈ ফুটছে। আমি আর মেঘনাও বাজাই।
এখন আমি আপনাদের দেখাবো একটা মজার খেলা, বলতে বলতে যাদুকর বাঁশি বাজাতে বাজতে সুন্দর ঢঙে নাচতে থাকে। এতো সুন্দর নাচ আর বাঁশির সুর আমরা আগে শুনিও নাই দেখিও নাই। মুগ্ধ চোখে যাদুকরের নাচ দেখতে থাকি। যাদুকরের নাচ দেখতে দেখতে মানিক আর জয়দীপের জন্য মন খারাপ লাগলো, আহা ওরা এলো না, এমন নাচও দেখতে পেলো না।
হঠত্ যাদুকর নাচ থামিয়ে বললেন, এবার সবার পকেটে একটা চকলেট পেয়ে যাবেন। যার যার পকেটে হাত দিনতো, এক দুই তিন...।
আমি আমার পকেটে হাত দিতেই একটি চকলেট পেলাম। মেঘনাতো পেলো তিনটি চকলেট।
যাদুকর বললেন, এবার আমি শূন্যে মিলিয়ে যাবো।
আমরা শিহরিত। মনে মনে ভাবি এই চোখের সামনে দাঁড়ানো মানুষটা কিভাবে শূন্যে মিলিয়ে যাবে? আর শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া কী সম্ভব? দিনের বেলায় আমরা এতোগুলো মানুষের সামনে থেকে উনি কিভাবে মিলিয়ে যাবেন? আমার ভাবনার মধ্যে যাদুকর বড় একটা বাক্স নিয়ে এলো। খুলে ফেললো ঢাকনা। উল্টে-পাল্টে দেখালো ভেতরটা। একদম খালি। তিনি ঢুকে গেলেন ভেতরে। যাদুকরের এক শিষ্য তালা মেরে দিলো। বাক্সটা সামনে আমাদের। এক দুই তিন করে আমরা গুণছি, হঠাত্ বাক্সটার সামনের ঢাকনা খুলে গেলে বের এলেন দিব্যকান্তির এক সু-পুরুষ, যার উন্নত নাক, চওড়া কপাল, ব্যাকব্রাশ করা ঘনকালো চুল। বটতলার সবাই আমরা চমকে উঠলাম, এক সঙ্গে বললাম, শেখ মুজিব শেখ মুজিব।
তিনি সহাস্য আমাদের দিকে তাকালেন, আকাশে হাত তুললেন সাতই মার্চের মতো, বললেন— আমাকে আটকে রাখা এতো সহজ নয়। আমি আসবোই, বার বার আসবো, প্রতিদিন আসবো। আমি এদেশের স্রষ্টা। আমি এ দেশের নাবিক। আমি এ দেশের প্রতিদিন সতেরোই মার্চ।
বটতলায় সমবেত আমরা করতালি দিয়ে স্বাগত জানালাম। মনে হলো আমাদের জড়িয়ে আছেন গভীর মমতায় আর অশেষ স্নেহের ছায়ায় এক আশ্চর্য যাদুকর।