জিম্মি দেশের ১৬ কোটি মানুষ
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৩, ২১:১৮
হরতাল, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে দেশের ১৬ কোটি মানুষ। রাজনীতির একপক্ষ অন্যপক্ষকে জব্দ করতে হরতাল নামের যে অস্ত্র বেছে নিচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সন্দেহ নেই হরতাল সংবিধানসম্মত একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। যে কোনো দল, সংগঠন এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ের কেউ সাধারণ ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান করতে পারে। তবে হরতাল পালনে কাউকে বাধ্য করা গণতান্ত্রিক অধিকারের পর্যায়ে পড়ে না। প্রজাতন্ত্রের যে কোনো নাগরিক নির্ভয়ে কাজ ও রাস্তায় চলাচল করার অধিকার রাখেন। কিন্তু গত দুই যুগ ধরে আমাদের দেশে হরতালের নামে যে অপরাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা চলছে তাতে জনগণের সে অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হরতালকালে যানবাহন চালানোর দায়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের দুষ্কর্মে এ যাবত্ কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। ঘটেছে জীবনহানির ঘটনা। যারা এসব অপরাধে জড়িত তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমাদের দেশে যারা যখন ক্ষমতায় থাকে, বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে দেশ চালানো তাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়। অন্যদিকে কারণে-অকারণে সরকারকে জব্দ করার সস্তা পদ্ধতি হিসেবে হরতাল নামের নোংরা অস্ত্রের অপপ্রয়োগ করে বিরোধী দল। গেলো সপ্তাহে টানা তিনদিন হরতাল আহ্বান করেছে ১৮ দলীয় জোটভুক্ত দুটি বৃহত্ বিরোধী দল। যে সব ইস্যুতে হরতাল আহূত হয়েছে তার ন্যায্যতা-অন্যায্যতা নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। আমার প্রশ্ন দেশবাসীর অধিকার নিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে, তাদের জীবন-জীবিকা রুদ্ধ করে জ্বালাও-পোড়াও ও বোমাবাজির ভয় দেখিয়ে যেভাবে হরতাল পালনে দেশবাসীকে বাধ্য করছে তা কোনো সভ্য সমাজে থাকা উচিত নয়। নিজেদের সভ্য মানুষ ও গণতন্ত্রপ্রেমী ভাবলে হরতাল নামের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের ইস্যুতে সন্ত্রাস-সহিংসতা এবং হরতাল এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা একদিকে জনশৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করছে; অন্যদিকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ইদানীংকার হরতালে সাধারণ মানুষ হত্যা, যানবাহনে আগুন, ভাঙচুর, বোমা-ককটেল নিক্ষেপের মাধ্যমে যেভাবে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
হরতাল সংবিধানস্বীকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও এ অধিকারের সীমা লঙ্ঘনের প্রবণতা সম্পর্কে এ দেশের মানুষ পরিচিত। হরতাল আহ্বানের অধিকার যেমন যে কারোরই রয়েছে, তেমনি তা অগ্রাহ্য করার অধিকারও সংরক্ষিত। কিন্তু হরতালের সময় যানবাহন চললে, দোকানপাট খুললে, কেউ অফিস-আদালতে যেতে চাইলে তারা যে বিড়ম্বনার মুখে পড়েন তা গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। হরতালকালে হামলার শিকার হওয়া এমনকি বিবস্ত্র করার জংলি উদাহরণও অতীতে এ দেশে দেখা গেছে। এ প্রেক্ষাপটে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণে, রাজনীতিকদের ভাবমূর্তির স্বার্থে হরতালের রাজনীতির অবসান ঘটানো আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক শক্তি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে সেটিই হবে কাঙ্ক্ষিত। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটিও হরতালের রাজনীতি থেকে জাতিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে পথ দেখাতে পারে।
ঢাকা