‘বড় দল’ হয়ে ওঠা
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৩, ২১:৩১
সেন্ট লুসিয়া থেকে গল। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত বলতে পারেন। মিল বলতে দুটি নগরীই সাগরের বুকে গড়ে উঠেছে; সেন্ট লুসিয়া ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরে, আর গল ভারত সাগরের তীরে। এ ছাড়া আর তেমন কোনো মিল তাদের মধ্যে থাকার কথা না। কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, এই দুটি শহরই এখন বাংলাদেশের কাছে একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে।
এই দুটি নগরীতেই তৈরি হল বাংলাদেশের ইতিহাস। এই দুটি শহরেই বাংলাদেশ পূর্ণশক্তির কোনো টেস্ট দলের বিপক্ষে বৃষ্টির সাহায্য ছাড়াই ম্যাচ ড্র করল। তবে এবারের ড্রয়ের মাহাত্ম্য যেন ছাড়িয়ে গেল সেই সেন্ট লুসিয়াকেও। এবার বাংলাদেশ যেন হয়ে উঠল সত্যিকারের ‘বড় দল’।
গল এখন সত্যি বাংলাদেশের বড় হয়ে ওঠার সাক্ষী এক টেস্ট ভেন্যু। এ গল টেস্টে বাংলাদেশ পেল প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি, এখানেই পেল এখন পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ রান, এখানেই দেশের ইতিহাসে প্রথম এক ইনিংসে তিন সেঞ্চুরিয়ানের দেখা পেল বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে কোনো দলের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস, শ্রীলঙ্কার মাটিতে এক টেস্টে মোট সর্বোচ্চ রান, উইকেট-রক্ষক অধিনায়কের করা দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি দেখল গল। হল আরও ছোট-খাটো ইতিহাস।
২০০৪ সালের সেন্ট লুসিয়ার সেই টেস্টের সঙ্গে আরেকটি মিল আছে এই গল টেস্টের। সেবারও এক টেস্টে বাংলাদেশের তিন জন সেঞ্চুরি করেছিলেন, এবারও তাই। তবে এবার তিন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেছেন এক ইনিংসে; তার একটি ডাবল সেঞ্চুরি, একটি ১৯০ রানের ইনিংস।
তবে সেন্ট লুসিয়ার সঙ্গে গলের মূল পার্থক্য, ক্রিকেটের ধরনের। সেই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ একটা ‘অস্বাভাবিক’ টেস্ট খেলে ফেলেছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু গল টেস্টে গত পাঁচদিন ধরে যেটা ঘটল, সেটাকে আর ‘ওয়ান অফ’ ঘটনা বলা যাচ্ছে না। দৃশ্যত এই মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরি, আশরাফুলের প্রায় ডাবল সেঞ্চুরি এবং বাংলাদেশের ছয় শতাধিক রানকে বিশেষ কিছু বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার ৫৭০ রানের জবাবে স্বভাব অনুযায়ী ধসে না পড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যে ৬৩৮ রান করল; তাতে একটু অবাক হতেই হয়। তবে আমরা যদি বাংলাদেশের সর্বশেষ কিছু টেস্টের স্কোরকার্ড খুলে দেখি; তাহলে মানতে হবে, এটা বাংলাদেশের ধারাবাহিকতার একটা পরিণতি।
একটা সময় বাংলাদেশের টেস্ট ইনিংস মানেই ১০০ রানের কাছাকাছি অলআউটের ঘটনা ঘটত হরহামেশা। ২০০২ সালে টানা ১২ ইনিংসে বাংলাদেশ ২০০ রান স্পর্শ করতে পারেনি। ২০০৪-০৫ মৌসুমেও প্রায় একইধরনের চিত্র দেখেছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সাল থেকে একরকম পরিস্থিতিটা বদলাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ নিয়মিত ২৫০-এর ওপরে এবং মাঝে মাঝে ৩৫০ পার করা ইনিংস খেলতে শুরু করেছে।
এই সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট বড় ধাক্কাটা খায় বার বার বড় মেয়াদে টেস্ট বিরতিতে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ৫টি ও গত বছর মাত্র ২টি টেস্ট খেলেছে। তাতেই পরিষ্কার কিছু উন্নতি দেখা যাচ্ছে। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৫৫৬, ১৬৭, ৩৮৭ ও ২৮৭ রানের চারটি ইনিংস খেলেছে; এর মধ্যে ৫৫৬ রানের ইনিংসটি ছিল দেশের তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
এবার গলে এসে সে রেকর্ড ভেঙে দিল বাংলাদেশ। ফলে বলতেই হবে যে, একটা ধারাবাহিক উত্তরণের ভেতর আছে বাংলাদেশ। এই উত্তরণের ফল হিসেবে অন্তত তাত্ক্ষণিকভাবে একটা বড় প্রাপ্তিও ঘটেছে বাংলাদেশের—বিশ্ব ক্রিকেটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে তারা। অন্তত ক্রিকেট বিশ্ব এটুকু মানছে যে, অবশেষে ‘সাবালক’ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ক্রিকেট।
বাংলাদেশের এই টেস্টে সাবালক হয়ে ওঠার মধ্যে একটা বিস্ময় লুকানো আছে। বাংলাদেশ যে নিয়মিত যথেষ্ট পরিমাণে টেস্ট খেলতে পারছে না, সেটা বলাই বাহুল্য। এর সঙ্গে যোগ করুন, এই খেলোয়াড়দের লংগার ভার্সন ম্যাচ খেলার ঘাটতি। এখনও দেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট সেই ‘পিকনিক’ মেজাজ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখনও উইকেট নিয়ে আছে হাজারো অভিযোগ।
এরপরও বাংলাদেশের মুশফিক যখন ২০০ রান করেন, আশরাফুল যখন ১৯০ রান করেন, বাংলাদেশ যখন পাঁচ-ছয় শ পার করা ইনিংস খেলে; তখন বিস্ময়টা চেপে রাখা মুশকিল হয়। এই বিস্ময় নিয়েই আমরা অপেক্ষা করি, আরও ধারাবাহিক চেহারায় টেস্টে আরও বড় দল হয়ে উঠবে বাংলাদেশ।
এক নজরে
এই নিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ৮ সেঞ্চুরি দেখল এক টেস্ট। ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো ৮ সেঞ্চুরি হয়েছিল উইন্ডিজ-দক্ষিণ আফ্রিকা অ্যান্টিগা টেস্টে।
পঞ্চম শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান হিসেবে জোড়া সেঞ্চুরি করলেন কুমার সাঙ্গাকারা।
এই ইনিংসের ভেতর দিয়ে নিজের ৩২তম টেস্ট সেঞ্চুরি করলেন সাঙ্গা। মাহেলা জয়াবর্ধনেকে টপকে তিনি এখন এককভাবে শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান।
এই ম্যাচে দু দল মিলিয়ে অসমাপ্ত ৪ উইনিংসে ১৯ উইকেটে ১৬১৩ রান করেছে; শ্রীলঙ্কার মাটিতে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসেও এটি সর্বোচ্চ রানের ম্যাচ।
বাংলাদেশের ছয় জন ব্যাটসম্যান এই টেস্টে যার যার সর্বোচ্চ রান করেছেন।