ফারুক রিজভীসহ ১৫৪ নেতাকর্মী কারাগারে
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৩, ২২:২৪
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ও সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে গতকাল দুপুরে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। তবে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুক, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান ও রুহুল কবির রিজভীসহ ১৫৪ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দু’টি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় ১৫৪ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে পুলিশ তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করে। গ্রেফতারকৃতদের জামিন ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য আগামী ২০ মার্চ দিন ধার্য করে সবাইকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম। এদিকে সোমবার কার্যালয়ে তল্লাশির সময় পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও অর্থ নিয়ে গেছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
মুক্তি পেলেন ফখরুলসহ তিন শীর্ষ নেতা :বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ সোমবার আটক করা শীর্ষস্থানীয় তিন নেতাকে গতকাল মঙ্গলবার ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এই তিন নেতা হলেন— বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী। গতকাল দুপুর একটার দিকে এই তিন নেতা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হন। পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে কোন অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
পল্টন থানায় ১৫৪ জনের বিরুদ্ধে দুই মামলা :সোমবার বিএনপির প্রধান কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণসহ পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার দুপুরে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পল্টন থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর হোসেন বাদী হয়ে দ্রুত বিচার আইনের ৪ ও ৫ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। অপর মামলাটি করেছেন পল্টন থানার আরেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দিন। একটি মামলা করা হয় দ্রুত বিচার আইনে এবং অপরটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, পুলিশের কাজে বাধা দান ও বিস্ফোরক জাতীয় দ্রব্য উদ্ধারের অভিযোগে দায়ের করা হয়।
মামলায় বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমান, রুহুল কবির রিজভী, মোহাম্মদ শাহজাহান, ডা.এমএ জাহিদ, হাবিবুর রহমান হাবিব ও জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধানসহ ১৫৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত পরিচয় ৫০/৬০ জনের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি (নম্বর ২০ (৩) ২০১৩) দায়ের করা হয়। অপর মামলায়ও (নম্বর ২১ (৩) ২০১৩) এই ১৫৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত পরিচয় ৫০/৬০ জনকে আসামি করা হয়। ফারুক, রিজভী, আমান, শাহজাহান, ডা. জাহিদ ও হাবিবকে এজাহারে হুকুমের আসামি করা হয়েছে।
মামলায় বিএনপি অফিস থেকে ১০টি শক্তিশালী তাজা বোমা উদ্ধার, যান চলাচলের রাস্তায় ৭টি স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি, পুলিশের ওপর হামলা, বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। পল্টন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম সারোয়ার বলেন, সোমবারের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা যে তাণ্ডব চালিয়েছিল তাতে জন শৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটেছিল। প্রকাশ্যে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করেছিল। বিএনপি ?অফিসে অবৈধভাবে তাজা বোমা মজুদ রেখেছিল। এজন্যই বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কারাগারে ১৫৪ জন নেতাকর্মী
গত সোমবার নয়াপল্টনে হাতবোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে গতকাল দুই মামলায় ১৫৪ জনকে আদালতে হাজির করা হয়। পুলিশ তাদের সবাইকে ৭ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করে। অন্যদিকে সবার জামিন চান আসামিদের আইনজীবীরা। দুইপক্ষের বক্তব্য শুনে মহানগর হাকিম কেশব রায় চৌধুরী ও অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম সহিদুল ইসলাম তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালত থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ২০ মার্চ আবারো আসামিদের আদালতে হাজির করতে বলা হয়েছে। ওই দিনই রিমান্ড ও জামিনের শুনানি হবে।
গতকাল বিকেলে আসামিদের আদালতে হাজির করে দ্রুত বিচার আইনের মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহামুদুল হাসান। আর বিস্ফোরক আইনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু জাফর আসামিদের ১০ দিন করে রিমান্ডে চান। দ্রুত বিচার আইনের মামলাটির শুনানি হয় মহানগর হাকিম কেশব রায় চৌধুরীর আদালতে। আর অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম সহিদুল ইসলাম বিস্ফোরক আইনের মামলাটি শোনেন। রাষ্ট্রপক্ষে রিমান্ডের শুনানি করেন ঢাকার জেলা জজ আদালতের পিপি খন্দকার আব্দুল মান্নান ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি আবদুল্লাহ আবু। অন্যদিকে আসামিদের আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। আসামিপক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বোরহান উদ্দিন ও সানাউল্লাহ মিয়া।
শুনানির পর তা?ত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, এ মামলা মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশে দায়ের করা হয়েছে। প্রথমে মহাসচিবসহ ৩ জনকে হুকুমদাতা হিসাবে বলা হলেও এখন অন্যদের তা বানানো হয়েছে। এতেই বোঝা যায় এটি মিথ্যা মামলা। বিএনপি আত্মঘাতী দল নয়। তারা বোমাবাজি করতে পারে না। এটি পুলিশের সাজানো নাটক। গ্রেফতারের উদ্দেশে তারা এই উদ্ধারে নাটক দেখিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। আর মামলার কাগজপত্র আদালতে না থাকাকে প্রসিকিউশনের দুর্বলতা হিসাবেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আবু বলেন, নাশকতা ঠেকানোর জন্য পুলিশ অভিযান চালায়। ১০টি ককটেল ও হাতবোমা পাওয়া গেছে। মিডিয়ার মাধ্যমে সবাই দেখেছে। এখন মিথ্যে বলে কোনভাবেই রক্ষা পাওয়া যাবে না।
বিএনপির অভিযোগ রাজনৈতিক, ভিত্তিহীন- পুলিশ
বিএনপি’র অর্থ লুণ্ঠনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ঢ?াকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও ভিত্তিহীন। যা কিছু ঘটেছে টেলিভিশন ক্যামেরা ও সাংবাদিকদের সামনেই ঘটেছে। এখানে লুকোনোর কিছু নেই। যা কিছুই ঘটেছে আইনের আওতায় ঘটেছে। টেলিভিশনে সরাসরি সমপ্রচারের মাধ্যমে দেশ ও জাতি সেদৃশ্য দেখতে পেয়েছে। কম্পিউটার থেকে কোনো ডকুমেন্ট নেয়া হয়নি বলেও জানান তিনি। ডিএমপি’র মিডিয়া সেন্টারে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, সোমবারের অভিযান সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ছিলো। বিএনপি কার্যালয়ে পাওয়া ককটেলের কথা দেশবাসী সরাসরি জানতে পেরেছে। এক্ষেত্রে পুলিশের নাটক করার কোনো প্রশ্নই ওঠে ?না। এর আগে গতকাল দুপুরে ডিবি কার্যালয় থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পার্টি অফিসে ফিরে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশের অভিযানের সময় কার্যালয় থেকে ১৯ মার্চ নির্ধারিত কাউন্সিলের জন্য সংগৃহীত তহবিল লুণ্ঠন হয়েছে।