হরতালে নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয় ছিল শান্ত

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা মঙ্গলবারের হরতাল রাজধানীতে ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। ব্যস্ত সড়কগুলোতে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করেছে। তবে তেমন সংখ্যক প্রাইভেট কার চলেনি। খিলক্ষেত, আদাবর, সায়দাবাদ ও রূপনগর এলাকায় হরতাল সমর্থকরা ৪টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারে ৪টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোডে হরতাল সমর্থনে একটি বিক্ষোভ মিছিলে পরপর দুইটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এসময় ককটেল বিস্ফোরণে একজন আহত হয়। পুলিশ দুইজনকে আটক করে। বিএনপি প্রধান কার্যালয় নয়াপল্টন অন্যান্য হরতালের দিনের চেয়ে গতকাল ছিল শান্ত। অন্য যে কোন হরতালের চেয়ে নেতাকর্মীরা অলস সময় পার করেছেন। নয়াপল্টনের আশপাশে একটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে। ভাংচুর করা হয়নি কোন যানবাহন। শুধু সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্য দেয়াই ছিল নেতৃবৃন্দের একমাত্র কাজ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড কমিউনিকেশন শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, হরতালে রাজধানীতে ১৫ পিকেটারকে আটক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে হরতাল সমর্থনে ১০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। হরতালে রাজধানীতে বেশ কিছু দোকানপাট খোলা ছিল। সচিবালয়সহ অফিস-আদালতে অন্যান্য হরতালের চেয়ে উপস্থিতি ছিল বেশি। গাবতলী, মহাখালী ও সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে না গেলেও নগরীর অভ্যন্তরে বিভিন্ন রুটের বাস চলাচল করেছে। দুপুরের পর ছাড়া পেয়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাদেক হোসেন খোকা ও আলতাফ হোসেন চৌধুরী নয়াপল্টনের কার্যালয়ে এলে কর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা ভাবের সৃষ্টি হয়। সকাল থেকেই কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলেছে। এছাড়া সকাল সোয়া ১১টার দিকে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া এলে কিছুক্ষণ তার বক্তব্য নিতে ব্যস্ত থাকেন সাংবাদিকরা। এরপর ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার ও তার সহকর্মী অ্যাডভোকেট সুমন বিএনপি কার্যালয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ডিবি পুলিশ তাদের আটক করে। এসময় অ্যাডভোকেট মাসুদ পুলিশকে বলেন, ব্যারিস্টার রফিক আমাকে আসতে বলেছেন। আমি আপনাদের সঙ্গে যেতে রাজি আছি। শুধু দুটি মিনিট কথা বলার সময় দিন। এর পরপরই পুলিশের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয়। ডিবি পুলিশ তাদের গাড়িতে করে অ্যাডভোকেট মাসুদ ও তার সহকর্মী অ্যাডভোকেট সুমনকে তুলে নিয়ে যায়। অবশ্য কিছুক্ষণ পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এছাড়া বাকি সময় খোশগল্প করেই কাটিয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মী ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান বলেন, অন্য যে কোন দিনের তুলনায় মঙ্গলবার হরতালে নয়াপল্টন ঘিরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সাদা পোশাকেও গোয়েন্দারা অলি-গলিতে অবস্থান নিয়েছে। কারণ এখানে অলি-গলি থেকে ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। পান্থপথে ছাত্রদলের ব্যারিকেড :পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালের সামনে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কলাবাগান থানা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এসময় তারা রাস্তায় চলাচলকারী একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাংচুর করে। এর কিছু সময় পর পুলিশ এসে ধাওয়া দেয়। পুলিশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ছুঁড়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। খিলক্ষেতে বাসে আগুনঃ হরতালকারীরা খিলক্ষেত এলাকায় একটি বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দুপুর দেড়টার দিকে পল্লীবিদ্যুত্ কার্যালয়ের সামনে পার্কিং করা বাসটিতে হঠাত্ করেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। খিলক্ষেত থানা পুলিশ জানায়, আগুন ধরিয়ে দেয়া বাসটি পল্লী বিদ্যুত্ কার্যালয়ের স্টাফ বাস ছিল। আগুন দেয়ার সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করা যায়নি। আদাবরে হিউম্যান হলারে আগুন ঃ দুপুর পৌনে একটার দিকে আদাবরের রিং রোড এলাকায় একটি হিউম্যান হলারে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতাল সমর্থনকারীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হিউম্যান হলারটি হক সাহেবের গ্যারেজের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আদাবর থানার এসআই শফিউদ্দিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে খায়রুল নামে এক যুবককে আটক করে। আটক ব্যক্তি ঐ গাড়ির চালক হলেও আগুন দেয়ার সঙ্গে তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। মিরপুরে গাড়ি ভাংচুর ও আগুন ঃ সকাল পৌনে ৮টার দিকে মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের গোলচক্কর ওভারব্রিজের কাছে হরতালকারীরা তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। একই সময় সেখানে একটি পিকআপ ভ্যান ভাংচুর করে তারা। এসময় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়লে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঐ এলাকা ঘেরাও করে ফেলে। এসময় দায়িত্বরত সংবাদ কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ দুর্ব্যবহার করে। একই সময়ে মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের সামনে কে বা কারা একটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এর আগে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রূপনগরের দুয়ারিপাড়ায় একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। রূপনগর থানার ওসি শিকদার শামীম হোসেন জানান, গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। রায়সাহেব বাজারে ককটেল বিস্ফোরণ:পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড়ে সকাল ৮টার দিকে পরপর ৪টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। তবে ককটেল বিস্ফোরণকারীদের কাউকে পুলিশ আটক করতে পারেনি। পাটুয়াটুলি এলাকায় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ১০/১২ জন শিবির কর্মীর একটি দল ঝটিকা মিছিল বের করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ঘটনাস্থল থেকে আরিফুল ইসলাম (২২) নামের এক শিবির কর্মীকে আটক করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। থানার ওসি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আটক শিবির কর্মী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী। হরতাল সমর্থকরা সকাল ৭টার দিকে রায়সাহেব বাজার মোড়েও চারটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সায়দাবাদে বাসে আগুন :সকাল ১০টার দিকে সায়েদাবাদ পুলিশ ফাঁড়ির একটু দূরে ঢাকা-গাইবান্ধা রুটের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা। ভোরের দিকে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীতে হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। সেখান থেকে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায় মিছিলকারীরা। যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, ঢাকা-গাইবান্ধা সড়কে চলাচলকারী বাসটি দাঁড়ানো ছিল। এরপরও হরতালকারীরা ওই বাসে আগুন দেয়। ফকিরাপুল ও আরামবাগ মোড়ের মাঝামাঝি স্থানের সড়কে সকাল পৌনে ৯টার দিকে তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এর আগে সকালে সেগুনবাগিচায় হরতালকারীরা একটি অটোরিকশা ভাংচুর করে। কলেজ গেটে ভাংচুর : কলেজ গেট এলাকায় সকাল ৭টার দিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল রহমান নোবেলের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের করে। এসময় মিছিলে পরপর কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। মিছিলকারীরা ২টি সিএনজি চালিত অটোরিকশা ভাংচুর করে। মিছিলটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গেট দিয়ে প্রবেশের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। চট্টগ্রামে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা দেশব্যাপী হরতাল চট্টগ্রামে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। হরতাল চলাকালে জোটের উদ্যোগে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সভা সমাবেশ ও মিছিল হয়। বিকালে নাসিমন ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এসময় জোটের অন্য নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন। বিপুল সংখ্যক পুলিশ সমাবেশস্থল ঘিরে রাখে। হরতাল চলাকালে কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। নগরীতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হরতালে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। তবে রাস্তায় প্রচুর রিকশা, অটোরিকশা, হিউম্যান হলারসহ সব ধরনের হালকা যানবাহন চলাচল করছে। এছাড়া ট্রেন ও বিমান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। বন্দরের বিভিন্ন জেটি এবং বহির্নোঙ্গরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামাও স্বাভাবিক ছিল। এদিকে হরতাল প্রতিরোধের জন্য নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সমাবেশ ও মিছিল করে।