জামায়াত মোকাবিলায় ১৪ দলের ব্যাপক প্রস্তুতি

জামায়াতে ইসলামীর সহিংসতা মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও জামায়াতকে কোণঠাসা করার কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন জোট। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করে জামায়াতের সকল কর্মসূচি রাজপথে মোকাবিলা করবে ১৪ দল। একই সঙ্গে জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন কর?ার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশ্বের ১৯৩ দেশে জামায়াতের সহিংসতার খতিয়ান পাঠানো শুরু হয়েছে। জামায়াত-শিবির যাতে রাজপথ দখল করতে না পারে এবং দেশব্যাপী তাণ্ডব-সহিংসতা চালাতে না পারে সে জন্য কাজ করছে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সব শক্তিসহ তরুণ প্রজন্মের সহায়তায় এ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হচ্ছে বলে ১৪ দলীয় জোট সূত্র জ?ানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের পর থেকে সারাদেশে এ প্রতিরোধ কমিটি গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য। তিনি জানান, সরকার ও ১৪ দলের পক্ষ থেকে পৃথক সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। একটি হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে প্রশাসনিক ভাবে, অন্যটি ১৪ দলের পক্ষ থেকে। এ দুই কমিটি তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের অপতত্পরতা প্রতিহত করবে। একই সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের কর্মকাণ্ড সর্ম্পকে মানুষকে সচেতন করবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসন সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করছে। সরকারি পর্যায়ের এ কমিটিকে জামায়াত-শিবিরের জঙ্গিদের তালিকা তৈরি করতে সহায়তা করবেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর থেকে এ কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে কোনো কোনো এলাকায় এ কমিটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এদিকে নাশকতা সৃষ্টিকারী জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করতে জোর তত্পরতা চালাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। জামায়াত-শিবির যাতে নতুন কোনো সহিংসতা ঘটাতে না পারে, রাজপথ দখল করতে না পারে সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো হার্ডলাইনে রাখা হতে পারে। এছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন আইনের আওতায় এনে সহিংসতা সৃষ্টিকারী জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। জামায়াত নিজেদের ইসলামী দল দাবি করে বারবার ইসলামের অপব্যবহার করেছে- দেশের আলেমদের এ অভিযোগ প্রমাণ করে মানুষের কাছে জামায়াতের আসল পরিচয় তুলে ধরবে ১৪ দল। এজন্য আলেম-ওলামাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সরকারের দু’জন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া আলেম-ওলামাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে বৈঠকও করেছে ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। দেশের ইমামরা যাতে জামায়াতের অপতত্পরতা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করেন সে ব্যবস্থাও করবে ১৪ দল। আবার কোনো ইমাম যাতে জামায়াত-শিবিরের পক্ষ নিয়ে কোনো অপপ্রচার চালাতে না পারেন সেজন্য ইমামদের ওপর নজরদারি করবেন তারা। আর এসব কাজে সহায়তা করবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার এ বিষয়ে ইতিমধ্যে তথ্যমন্ত্রণালয় থেকে মোবাইলে এসএমএস পাঠানো শুরু হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর জামায়াত-শিবিরের সহিংস তাণ্ডব ও একই সময়ে সারাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনাগুলোকে দেশে ও বিদেশে প্রচার করার উদ্যোগ নিয়েছে ১৪ দল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের সহযোগিতা নিচ্ছেন তারা। এ নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছে ১৪ দল। এর মাধ্যমে জামায়াতকে জনবিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উগ্রসাম্প্রদায়িক শক্তি হিসাবে প্রমাণিত করে তাদের ওপর আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থন কমিয়ে আনা হবে। গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক থেকে শুরু করে নিহত হওয়া স্বাধীনতার সপক্ষের বিভিন্ন ব্যক্তিসহ পুলিশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে মানুষের সামনে এনে জামায়াত-শিবির সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ১৪ দল। জামায়াত-শিবির যাতে ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে আরো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটাতে না পারে সে জন্যও নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত করছে ১৪ দলীয় জোট। আন্দোলনের নামে জামায়াত-শিবির সহিংসতায় লিপ্ত হলে তাদের আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করতে উদ্যোগ নেবে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট। তবে নিষিদ্ধ করার চেয়ে এ ইস্যুতে জামায়াত-শিবিরকে চাপে রাখার উপর বেশি জোর দিচ্ছেন তারা। এছাড়া জামায়াতের নিবন্ধনে দেশের সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কয়েকটি ধারা রয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে জামায়াতকে চাপে রাখবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া কয়েকটি রায়ে একাত্তরের সালে দলগতভাবে হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতার বিষয়টি উঠে আসে। এ কারণে তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকেও জামায়াতের বিরুদ্ধে সহায়তার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তদন্তের পর দলটির বিরুদ্ধে মামলা করার কথা ভাবছেন তারা। জামায়াত-শিবির ও বিএনপির অপতত্পরতা সম্পর্কে দেশব্যাপী গণজাগরণ সৃষ্টি করতে ১৪ দল তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। এরই অংশ হিসাবে আগামী ১৮ মার্চ রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনের সামনে সমাবেশ করবে আওয়ামী লীগ। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে গণজাগরণে শামিল করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম জানান, জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই আমাদের শক্ত অবস্থান থাকবে। ওদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিহত করা শুধু নয়, ওদের নৈরাজ্য চিরদিনের জন্য বন্ধ করতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবো। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবিরকে ছাড় দেয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। কারণ তারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। তারা দেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাদের বিছিন্ন করা হবে। প্রশাসনিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।