গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্প কারখানা
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৩, ২৩:০০
শিল্প কারখানায় গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার পাশে শিল্প এলাকা সাভারে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই কমে গেছে। নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য শিল্প এলাকার চিত্রও কমবেশি একই রকম।
সাভার শিল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অর্ধেক গ্যাসও পাচ্ছে না শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার যে মাসে বেশি গ্যাস পাওয়া গেছে, সে মাসের চেয়ে কম ব্যবহার করা মাসে বিল হয়েছে বেশি। গ্যাস সংকটের কারণে একটি মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানে মাসে বিপুল অংকের টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
গ্যাস জেনারেটর থাকা শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গ্যাস সংকট এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান শর্তাধীন সময়ে তাদের পণ্য বিদেশের ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে রফতানি আদেশ বাতিল হচ্ছে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের সাভার কার্যালয় সূত্র জানায়, সাভার এলাকায় গ্যাসের চাহিদা প্রতি ঘন্টায় ৯৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৩ ঘনফুট। এর মধ্যে শিল্পকারখানায় চাহিদা প্রতিঘন্টায় প্রায় ৮২ লাখ ঘনফুট। এছাড়া আবাসিক এলাকায় ১৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮৭ ঘনফুট, বাণিজ্যিক খাতে ২৫ হাজার ৮৯৭ ঘনফুট । এর মধ্যে ডিইপিজেডেই প্রতি ঘন্টায় ১৪ লাখ ৫৫ হাজার ৮০৯ ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তুু এর বিপরীতে গ্যাস পাওয়া যায় ২৫ থেকে ৩০ ভাগ। গ্যাস সংকটে অনেক শিল্প কারখানাই দিনে গড়ে ১০ ঘন্টা বন্ধ থাকে।
বর্তমানে দেশের মোট গ্যাসের ৬০ শতাংশ বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যবহূত হয়। ১৭ শতাংশ সরবরাহ করা হয় শিল্পখাতে (সার ছাড়া)। সার উত্পাদনে ৭ শতাংশ, আবাসিক খাতে ১০ শতাংশ, সিএনজিতে ৪ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক খাতে ২ শতাংশ গ্যাস ব্যবহূত হচ্ছে।গ্যাসের চাপ বাড়ানোর জন্য একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে উপর্যুপরি চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সন্তোষজনক কোন সমাধান মেলেনি। ভূতুড়ে বিল নিয়েও একাধিক অভিযোগ আছে। ভূতুড়ে বিল সমস্যা নিরসনের উদ্দেশ্যে আধুনিক মিটার স্থাপন করতে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ টাকাও নিয়েছে। কিন্তু টাকা নেয়ার পর এক বছর চলে গেলেও মিটার স্থাপন করা হয়নি।
সাভারের কবিরপুরস্থ তোহা টেক্সটাইল লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান অভিযোগ করেন, তাদের কারখানায় ৩৮ হাজার ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও পাচ্ছেন মাত্র দুই হাজার ঘনফুট গ্যাস। তাও গ্যাসের চাপ থাকে খুবই কম। কিন্তুু মাস শেষে বিল আসে অতি মাত্রায়।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড-এর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নওশাদ ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘সাভার এলাকার গ্যাস সমস্যাটা বেশ কিছুদিন ধরে হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের যে পার্থক্য তার জন্যই সমস্যাটা বেশি হচ্ছে। আমাদের যে গ্যাস পাই তা মোটামুটি সমানভাবে সরবরাহ করার চেষ্টা করি। এখন পরিস্থিতি একটু ভাল হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।’ তিনি বলেন, টাঙ্গাইল, চন্দ্রাতে এখন গ্যাস পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গ্যাসের চাপ আরো না বাড়া পর্যন্ত সাভার এলাকায় অবস্থার উন্নতি হবে না। সাভার এলাকায় গ্যাসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় পিএসআই চাপ বাড়ানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে খুব ভালভাবে অনুভব করা যায় না।
নিটওয়্যার রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পরিচালক মঞ্জুরুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ঠিকমত গ্যাস না থাকায় প্রতি মাসে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। বেশি বিদ্যুত্ বিল দিতে হচ্ছে। ফার্নেস ওয়েল ও ডিজেল কিনতে হচ্ছে বেশি। সাথে আবার গ্যাসের বিলও দিতে হচ্ছে বেশি। সব মিলিয়ে যা খরচ হওয়ার কথা তার থেকে অনেক বেশি করতে হচ্ছে। এতে উত্পাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। সাভার এলাকার ৪৩৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ চালু আছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না। শতভাগ রফতানিমুখী ২২১টি কারখানায় গ্যাস জেনারেটর থাকলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে জেনারেটরগুলো বন্ধ হয়ে যায়। গ্যাসের অভাবে কোনো কোনো শিল্প-কারখানার এক অংশ চালু রেখে অপর অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। চাহিদামত সুতা উত্পাদন করতে না পারায় বেশক’টি স্পিনিং মিল বন্ধ রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে।
সাভার পৌর এলাকার শিমুলতলায় অবস্থিত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন্স অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আঞ্চলিক বিক্রয় কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উত্পাদন আগের চেয়ে কমে গেছে।
সাভারে ৩৬টি সিএনজি স্টেশন আছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জোড়পুল এলাকার লালন সিএনজি স্টেশনের মালিক হাজী জামাল উদ্দিন সরকার জানান, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে হরহামেশা স্টেশন বন্ধ থাকে। গ্যাস সঙ্কট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। আশুলিয়া শিল্প এলাকার প্রায় ১৫-১৬টি সিএনজি স্টেশন দিনের বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে।
ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় অবস্থিত মালঞ্চ পাওয়ার প্লান্টে প্রতিদিন ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হতো। এ পাওয়ার প্লান্টে গ্যাসের চাহিদা ১০০-১৭০ পিএসআই। বর্তমানে ৫০-৬০ পিএসআই মাত্রায় গ্যাস পাওয়ায় তারা বিদ্যুত্ উত্পাদন ৩৫ মেগাওয়াট থেকে ২০ মেগাওয়াট পর্যন্ত করতে পারছে। একইভাবে ঢাকা পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-১ পরিচালিত আশুলিয়ায় পাওয়ার প্লান্টটি ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করত। বর্তমানে গ্যাসের চাপ না থাকায় উত্পাদন ২০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। প্রসঙ্গত গতকাল বুধবার সারাদেশে ২২২ কোটি ১৯ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এই সময় চাহিদা ছিল ২৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি।