ভ্যাটিকানের বাতাসে অদ্ভুত এক পুরোনো গন্ধ

(পূর্ব প্রকাশের পর) ইউরোপীয় চিত্রকলার ইতিহাস আর রেনেসাঁর ওপর ‘ভেনাসের’ পাণ্ডিত্য আমার মুগ্ধতার সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। খুব মনোযোগী ছাত্রের ভান ধরে শুনে যাচ্ছি ওর কথা। আমেরিকা থেকে এই প্রথম এসেছে রোমে, একা। অথচ মনে হচ্ছে, ভ্যাটিকেনের প্রতিটি ইঞ্চি ও নিজের হাতের তালুর মতই চেনে। প্রজাপতি যেভাবে এক ফুল থেকে উড়ে উড়ে অন্য ফুলে যায়, ভেনাস ঠিক তেমনি এক-একটি কোণে ছুটে ছুটে ভাস্কর্য, পেইন্টিং, আর্কিটেকচারের জানা-অজানা ইতিহাস গড়গড় করে বলে যেতে থাকে। মিকেলাঞ্জেলোর বিশেষজ্ঞ যেন। মিকেলাঞ্জেলোর ভাঙা নাকের গল্প, কীভাবে সহপাঠী টারিজিয়ানোর হাতে মার খেয়ে নাকটা সারা জীবনের জন্য বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, সেই ঘটনা যেন ভেনাসের চাক্ষুষ দেখা। ‘একটা শিল্প জালিয়াতির মধ্য দিয়েই প্রথম মিকেলাঞ্জেলো লাইম লাইটে আসে, এটা জানো?’ আমি বললাম, ‘বল কী!’ ‘হ্যাঁ, শোনোই না, ফ্লোরেন্সের রাজপরিবার মোদিচিদের পরিবারেই ওর বেড়ে ওঠা আর বিকাশ, সেই পরিবারের দুই কাজিন লরেঞ্জো আর গিওভানি ওকে বুদ্ধি দিল, ওর গড়া একটা ঘুমন্ত কিউপিডের মূর্তি কিছুদিন মাটির নিচে পুঁতে রাখতে। ফলে সেটা রং বদলে অ্যান্টিকের রূপ ধারণ করবে, তখন চড়া দামে বেচা যাবে। তা-ই করল মিকেলাঞ্জেলো, পরে লরেঞ্জো সেটা রোমের এক অ্যান্টিক ডিলারের কাছে বেচে দিল। ডিলার সেটা বেচল রোমের কার্ডিনাল রিয়ারিওকে। কিন্তু কার্ডিনাল জালিয়াতিটা ধরে ফেলে এবং টাকা ফেরত চায়। পাশাপাশি খোঁজ লাগায় কে সেই পাকা হাতের শিল্পী, লোক পাঠায় ফ্লোরেন্সে। এভাবেই মিকেলাঞ্জেলোর রোমে আসা। চোখে পড়লেন ভ্যাটিকানের কার্ডিনালের। সে-ই অনুরোধ করল সেন্ট পিটার্স চ্যাপেলের জন্য একটা মূর্তি তৈরি করে দিতে হবে। সেটাই ছিল পিয়েতা।’ আমি জানতে চাইলাম, ‘ইতিহাস বলে, রাফায়েল আর মিকেলাঞ্জেলোর সম্পর্কটা না কি সাপে-নেউলের সম্পর্ক ছিল?’ ‘হ্যাঁ, এটা ঠিক, অসাধারণ প্রতিভাবান বিখ্যাত স্থপতি ব্রুমান্তে ছিল রাফায়েলের চাচা, ব্রুমান্তের সাথে পোপ এবং উচ্চ পদস্থদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ফলে ব্রুমান্তে চাইতেন, ভালো ভালো কাজগুলো মিকেলাঞ্জেলোর ওপর টেক্কা মেরে ভাইপো রাফায়েলকে পাইয়ে দিতে। রাফায়েল নিজেও তখন স্বীকৃত শীর্ষশিল্পীদের মধ্যে একজন। আর রাফায়েলেরও ছিল কপি করার অসাধারণ গুণ। যা দেখতেন, তা-ই কপি করে ফেলতে পারতেন। ফলে মিকেলাঞ্জেলো তাঁর কাজের ত্রিসীমানায় কাউকে ঘেঁষতে দিতেন না, ঘেরাটোপের মধ্যে কাজ করতেন। মিকেলাঞ্জেলো সমসাময়িক প্রায় সব গ্র্যান্ডমাস্টারদের কাছেই ঈর্ষার পাত্র ছিলেন। কথা বলতে বলতে আর ছবি তুলতে তুলতে আমরা পৌঁছে গেছি সিসটিন চ্যাপেলের কাছাকাছি। আমরা দুজনই চরম উত্তেজিত। একটা বিশাল ব্যালকনির পাশে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল অদূরের টাইবার নদীর প্রেক্ষাপটে প্রাচীন রোমান নগরীর অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। ভেনাসকে বললাম, ‘এসো, ওই ল্যান্ডস্কেপ পেছনে রেখে তোমার একটা ছবি তুলে দিই। এই ছবিটাই হবে লার্জার দ্যান লাইফ। এই ছবিটার মধ্য দিয়েই তুমি আমাকে স্মরণ করবে।’ ভেনাস সত্যি সত্যি ভেনাসের ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে গেল। আমি ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে এই প্রথম ভেনাসকে দীর্ঘ সময় নিয়ে দেখলাম। হায়, আজ আমি যদি ছবি আঁকতে পারতাম। সবুজ চোখের এই অসাধারণ সুন্দরীকে আমি কোথায় তুলে রাখি, কবিতায়, ক্যানভাসে, পাথরে খোদাই করে অথবা দেয়ালের ফ্রেসকোতে। ভেনাসের তাড়া, ‘একটা ছবি তুলতে এত সময় লাগলে কীভাবে হবে।’ আমি ক্যামেরা থেকে চোখ না নামিয়েই বললাম, ‘তোমার গায়ে কোনো কাপড় না থাকলে তোমাকে সত্যিই এখন গ্রিক দেবী মনে হতো।’ হঠাত্ সিরিয়াস হয়ে ভেনাস বলল, ‘যে ছবি হবে লার্জার দ্যান লাইফ, তেমন ছবির জন্য আমি সব করতে রাজি, খুলব সব?’ সর্বনাশ, বলে কী! আমিও উত্তর দিলাম, ‘আমি কিন্তু তোমার মিকেলাঞ্জেলোর মতো সমকামী নই।’ বলেই সাটার টিপে দিলাম। এবার ভেনাস শুরু করল, ‘বিয়ে-শাদি করেননি সারা জীবন, উপরন্তু দেবতার মতো এক সুদর্শন যুবক শিষ্য ছিল মিকেলাঞ্জেলোর, যার নাম ছিল তোম্মাসো কাভালিয়েরি, তাকে নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছিলেন; এঁকেছিলেন তার পোর্ট্রেট। সারা জীবনে আর কারও পোর্ট্রেট তিনি আঁকেননি। সে কারণেই সবাই সন্দেহ করে, মিকেলাঞ্জেলো সমকামী ছিলেন।’ দুজন মিলে ছুটলাম সিসটিন চ্যাপেলের দিকে, ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। নোটিশটির দিকে মন খারাপ করে তাকিয়ে আছে ভেনাস। নিজের ক্যামেরাটা ব্যাগে গোছাতে গোছাতে বলল, ‘সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল লাস্ট জাজমেন্টের সামনে দাঁড়ানো একটা ছবি থাকবে আমার, তা আর হলো না।’ আমি বললাম, ‘হবে না কেন, নিশ্চই হবে।’ ভেনাস বলল, ‘সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে পারবে তুলতে?’ আমি ভেনাসকে বিশ্বাস করানোর জন্য ওর সবুজ চোখের গভীরে তাকিয়ে দৃঢ়তা নিয়ে বললাম, ‘ছবি তুলে সিকিউরিটির হাতে ধরা পড়লে কী হবে, বড়জোর আমার জেল অথবা জরিমানা হবে, তোমার তো স্বপ্নটা পূরণ হবে, তোমার জন্য এটুকু না হয় করলাম। শোনো, ছবি তোলার সাথে সাথে তুমি আমার হাত থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে নেবে, যাতে আমাকে ধরলেও ক্যামেরাটা ওরা না পায়।’ এক অদ্ভুত ভালো লাগার দৃষ্টিতে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল ভেনাস। আমরা সিসটিন চ্যাপেলের ভেতর ঢুকে আলাদা হয়ে গেলাম। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শিল্পকর্মের সামনে এবং নিচে দাঁড়িয়ে প্রতিটি মুহূর্তকে আত্মস্থ করতে চেষ্টা করছি। বারবার শিহরিত হয়েছি, আমার সামনে লাস্ট জাজমেন্ট আর মাথার ওপর ওল্ড টেস্টামেন্টের বিশ্বসৃষ্টির রহস্য। আমার মাথায় ঢোকে না—এত সুউচ্চ সিলিংয়ের গায়ে কীভাবে সম্ভব হলো ছবি আঁকা। ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমারই তো ঘাড় ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। মাসের পর মাস মিকেলাঞ্জেলো একটা উঁচু মঞ্চের ওপর শুয়ে শুয়ে করেছেন এই কাজ। ঠিকমতো খাওয়া হয়নি, মাসের পর মাস বদলাননি শরীরের পোশাক। অল্প পরিসর, তাই দৃষ্টি সব সময়ই প্রায় নাকের ডগায় আটকানো, আলোর স্বল্পতা তো আছেই, তাঁর চোখ প্রায় অন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল। সিলিংয়ে লাগানো রং চুইয়ে চুইয়ে ঝরেছে নাকে-মুখে-গায়ে, কোনো সাহায্যকারী নেই। কারণ তিনি নিজেই তা চাননি। তিনি কাজ করতে ভালোবাসতেন নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায় আর নিভৃতে। কঠিন নির্জন নিঃসঙ্গ চ্যাপেলের মধ্যে ঘটে চলছে পৃথিবীর ইতিহাসের দুঃসাহসী আর দুঃসাধ্য শিল্পযজ্ঞ। এই সময়ে তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। মিকেলাঞ্জেলোর কবিতা, সে আর এক ইতিহাস। সিলিংটাকে তেত্রিশটা ভাগে ভাগ করে জেনেসিসে বর্ণিত বিশ্বজগত্ সৃষ্টিসংক্রান্ত বিষয় এবং আদম-হাওয়া, নুহের প্লাবন ইত্যাদি ওল্ড টেস্টামেন্টের বিভিন্ন এপিসোড, বিভিন্ন নবীদের ছবি এবং পৌরাণিক ভবিষ্যত্-বাণী, যিশুর শিষ্যদের জীবনকাহিনি যেন থরেথরে জীবন্ত হয়ে নড়াচড়া করছে। ওপর থেকে ঘাড় নামিয়ে সামনে তাকালে সমস্ত দৃশ্যপটজুড়ে লাস্ট জাজমেন্ট, ঈশ্বর শেষবিচারের দিনে মানুষের পাপ-পূণ্যের বিচার করছেন। আমার কাছে যেটা অবাক লেগেছে, সেটা হলো খ্রিষ্টধর্মের ওপরে শিল্পের প্রভাব অথবা জয়। দর্শনার্থীদের মধ্যে যতটা না ধর্মীয় অনুভূতি কাজ করছে, তার চেয়ে বেশি কাজ করছে শিল্প-নৈপুণ্যের মুগ্ধতা। উচ্চ রেনেসাঁর সময়ে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে চার্চের প্রভাব, তখন ধর্মীয় বিষয়গুলো চাক্ষুষ বাস্তবতায় এনে জনমনে প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখার একটা চেষ্টা হয়তো ছিল। লাস্ট জাজমেন্টের সামনে দাঁড়ানো ভেনাসের কাঁধে আলতো করে টোকা দিতেই সে যেন স্বপ্নের ভেতর থেকে বের হয়ে এল। আমাকে নাগালের মধ্যে পেয়েই শুরু করল, ‘তোমাকে একটা দারুণ তথ্য দিই, এখানে যা-কিছু দেখছ, এই যে সিলিংয়ে আঁকা ওল্ড টেস্টামেন্ট অবলম্বনে বিশ্বসৃষ্টির বিবরণ আর তার ছাব্বিশ বছর পরে দেয়ালে আঁকা লাস্ট জাজমেন্ট বা শেষবিচার, মিকেলাঞ্জেলো কিন্তু এসব স্বেচ্ছায় আঁকেননি। পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস অনেকটা জোর করে তাঁকে দিয়ে এই কাজগুলো করিয়েছেন, তাই পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস আসলে হিরো না ভিলেন, এটা নিয়ে ইতিহাসে বিতর্ক আছে। মিকেলাঞ্জেলো ভাস্কর হয়েই জন্মেছিলেন। ছবি আঁকার ব্যাপারে তাঁর ছিল দারুণ অনীহা। প্রবল পরাক্রম পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস প্রথমে চেয়েছিলেন নিজের জন্য একটা মহিমান্বিত সমাধিক্ষেত্র তৈরি করতে। সেই কাজটার দায়িত্ব পেয়েছিলেন মিকেলাঞ্জেলো, কিন্তু শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পোপ। ফলে যুদ্ধের নেশায় মশগুল পোপের কাছে সমাধি-স্তম্ভের জন্য ব্যয় করাটা তখন অপচয়ের নামান্তর। খুব অপমানিত আর প্রত্যাখ্যাত বোধ করেছিলেন শিল্প।’ আমার মনে হলো, মিকেলাঞ্জেলোর এই আমেরিকান হট প্রেমিকাটিকে এখন থামানো উচিত। আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘ছবি তুলবে না?’ চোখে-মুখে আতঙ্ক ফুটিয়ে বলল, ‘আর ইউ সিরিয়াস?’ আমি মুখ সিরিয়াস করে বললাম, ‘তোমার জন্য জীবন বাজি।’ ওকে আমার পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে দিয়ে ওর ক্যামেরাটা খুব গোপনে হাতে নিয়ে নিলাম। ভেনাস উত্তেজনায় রীতিমতো কাঁপছে, ‘ফ্লাশটা অফ রাখো।’ আমি বললাম, ‘ফ্লাশ না মারলে এই অল্প আলোতে ছবি উঠবে না।’ সে বলল, ‘ফ্লাশের আলো দেখে তোমাকে সহজেই ধরে ফেলবে।’ আমি বললাম, ‘এই কম আলোতে ফ্লাশ মারলে কিছুক্ষণের জন্য সবাই অন্ধ হয়ে যাবে, ততক্ষণে আমিও কাজ সেরে হাওয়া।’ আমার বুদ্ধিটাতে সে ইমেপ্রসড। ওর দাঁড়ানোর পজিশন ঠিক করে দিয়ে আমি ভিড়ের মধ্যে একটা সুবিধামতো জায়গায় দাঁড়িয়ে ফটাস করে সাটার টিপেই ভিড়ের মধ্যে ঝাঁকের কৈ হয়ে মিশে আসমানের দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলাম বিশ্বসৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনে। হঠাত্ চারিদিকে গুঞ্জন আর সিকিউরিটিদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। ভেনাস আমাকে চমকে দিয়ে পেছন থেকে প্রেমিকার মতো জড়িয়ে ধরল। আমরা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন প্রেমিক-প্রেমিকার মতো অভিনয় করতে করতে সিসটিন চ্যাপেল থেকে বিশ্ব জয়ের আনন্দ নিয়ে বের হয়ে এলাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা। সেন্ট পিটারস স্কয়ারের পাশের কফি শপে বসে কফি খেতে খেতে দেখছি, ভেনাস তার ডাইরির সাদা পাতায় খসখস করে কী যেন লিখে এক টানে ছিঁড়ে ফেলল। বাড়িয়ে দিল কাগজটা আমার দিকে। কাগজে ওর নাম, হোটেলের ঠিকানা, রুম নম্বর, ফোন নম্বর, আর মিলিত হবার সময় দেওয়া। আমার পায়ের নিচের রোম সাম্র্যাজ্য তখন থরথর করে কাঁপছে, আর নিজেকে লাগছে পরাক্রান্ত রোমান সম্রাটদের মতো। এই প্রথম ওর নাম জানলাম ‘ভিল্লিনি’ সাথে আরও কী যেন খটরমটর ছিল। আমার খুব ইচ্ছে করল ওকে বলতে, প্রথম দর্শনেই আমি ওকে একটা নাম দিয়ে দিয়েছি, ‘ভেনাস’। সারাটা সময় মনে মনে ওকে এই নামেই ডেকেছি, কিন্তু বললাম না। এটা আগামীকালের চমক হিসেবেই রেখে দিলাম। কাগজটার দিকে তাকিয়ে শুধু মুখে বললাম, ‘এটা কি আমার পুরস্কার।’ লজ্জায় রাঙা ভেনাস হঠাত্ তড়িঘড়ি করে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বলল, ‘আমার টুরিস্ট বাসস্টপে এক্ষুনি পৌঁছাতে হবে। ওকে পৌঁছে দিলাম বাসের কাছে। বাসে চড়ার আগে হাসতে হাসতে আমাকে বলল, ‘দেখো কবি, এখনও আমি তোমার নামটাই জানি না অবশ্য মনে মনে আমি তোমাকে কবি বলেই ডেকেছি।’ আমি বললাম, ‘আমার নাম লতিফুল ইসলাম শিবলী।’ আমার নামটা শুনে হঠাত্ বদলে গেল ওর চেহারা। ‘কী বললে নামটা, আবার বলো তো।’ আমি আবার বললাম। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি মুসলিম?’ অস্ফুট উচ্চারণ করল, ‘ও মাই গড, এটা তোমার আগেই বলা উচিত ছিল।’ বদলে যাওয়া চেহারা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে, ‘তোমাকে যে কাগজটা দিয়েছি, ওটা দাও।’ নাম-ঠিকানার কাগজটা ওর হাতে ফিরিয়ে দিলাম। কাগজটা সে হাতের মুঠোয় তছনছ করে সম্পূর্ণ অপরিচিত চেহারা নিয়ে বলল, ‘আমি ইসরাইলি, থাকি আমেরিকায়, হেবরনে তোমরা আমার অনেক আত্মীয়কে হত্যা করেছ।’ প্রচণ্ড ঘৃণাভরে কথাগুলো বলেই দ্রুত বাসে চড়ে বসল। ওর সিটের সামনের জানালা দিয়ে আমি ওকে দেখছি। কিন্তু একটিবারের জন্যও সে ঘুরে তাকাল না আমার দিকে। ওর ঘৃণার মাত্রা আর কারণটা পুরোপুরি বুঝতে আমার আরও এক বছর লেগেছিল। কারণ পরের বছর নাইন-ইলেভেনে বদলে গেছে পৃথিবীর রাজনৈতিক সমীকরণ, যেখানে দুঃখজনকভাবে ধর্মই হয়ে উঠেছে শত্রুতা আর মিত্রতার মাপকাঠি, যা মোটেই কাম্য নয়। হতভম্ভ আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি ভেনাসের দূরে চলে যাওয়া বাসের দিকে তাকিয়ে বুকভরে টেনে নিলাম বাতাস, ভ্যাটিকানের বাতাসে অদ্ভুত এক পুরোনো গন্ধ। (সমাপ্ত)