বিলুপ্ত হচ্ছে বিনিয়োগ বোর্ড!

জাতীয় শিল্পনীতি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিল্প নিবন্ধনের দায়িত্ব শিল্প উন্নয়ন ও উদ্ভাবন অধিদপ্তরের উপর ন্যস্ত করতে নতুন আইন হচ্ছে। ‘শিল্প উন্নয়ন ও উদ্ভাবন আইন ২০১২’ শীর্ষক এই আইনটি বর্তমানে খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। আইনটির ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে: ‘‘খাতভিত্তিক প্রতিটি শিল্পের জন্য সরকার কর্তৃক ‘পোষক কর্তৃপক্ষ’ (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়) থাকবে এবং এই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে শিল্প নিবন্ধন ও স্থাপন করতে হবে।’’ আইনটি পাস হলে বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের দায়িত্বে থাকা বিনিয়োগ বোর্ড (বিওআই) তার কার্যকারিতা হারাবে এবং এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিল্প উন্নয়ন ও উদ্ভাবন আইন বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প সচিব মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহ ইত্তেফাককে জানান, আইনটি বর্তমানে খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে আলোচনা ও মতামতের উপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত করা হবে। তবে বিনিয়োগ বোর্ড মনে করে, এ ধরনের আইন কিংবা পৃথক অধিদপ্তরের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। প্রস্তাবিত শিল্প উন্নয়ন ও উদ্ভাবন অধিদপ্তর স্থাপন করা হলে দেশে বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট ও বৃদ্ধিকরণের সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব, এখতিয়ার ও ক্ষেত্র নিয়ে নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগে ও ব্যবস্থাপনায় শিল্পায়নের স্বাভাবিক গতিকেও এটি বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে বিনিয়োগে আগ্রহী দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাগণ নিরুত্সাহিত হবেন বলে বিনিয়োগ বোর্ড দাবি করেছে। এছাড়া আইনটি প্রণয়ন করা হলে বেপজা, ইপিজেড, বিসিক, পিপিপি’র কার্যক্রমেও বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছে। এ প্রসঙ্গে বোর্ডের সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল ইত্তেফাককে জানান, পৃথক অধিদপ্তরের ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হবে। যে কাজগুলো বিনিয়োগ বোর্ড বর্তমানে করছে সেই একই কাজের জন্য পৃথক অধিদপ্তর স্থাপনের কোন প্রয়োজন নেই বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধুমাত্র নিবন্ধনের জন্য এত বিশাল বোর্ডের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। তাছাড়া শিল্প সংক্রান্ত সকল বিষয় একটি আইনের মাধ্যমেই হওয়া উচিত এবং তা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনেই হওয়া প্রয়োজন বলে তারা মন্তব্য করেছেন। প্রসঙ্গত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) নিয়ে কাজ করে শিল্প মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে বিনিয়োগ বোর্ড, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, প্রাইভেটাইজেশন কমিশন, অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ কার্যালয় বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে রয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ১৯৭২ সালে গঠিত ‘শিল্প অধিদপ্তর’ ১৯৮৯ সালে বিলুপ্ত করে ‘বিনিয়োগ বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা করে তত্কালীন সরকার। সেই থেকে ‘বিনিয়োগ বোর্ড আইন ১৯৮৯’-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সভা, সেমিনার ও বিভিন্ন দেশে রোডশোর মতো কর্মসূচি পালন করলেও শিল্পের নিবন্ধন ছাড়া বোর্ডের কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। প্রকৃত অবস্থায় দেশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব আসলেও ঠিক কী পরিমাণ প্রকৃত বিনিয়োগ হচ্ছে তারও কোন হিসেব নেই তাদের কাছে। বিনিয়োগ বোর্ডের দেয়া তথ্যানুযায়ী দেশে ২০১২ সালে ১৮৫৫ শিল্পে ৭১৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে । এর মাধ্যমে ৩ লাখ ৬৪ হাজার লোকের কর্মসংস্থান তৈরির প্রস্তাবনা রয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধুমাত্র দেশীয় বিনিয়োগকারীরা ১৬৫৫টি শিল্প প্রকল্পে ৫০০ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছেন। এছাড়া ওই সময়ে ২১২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন টাকা বা ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছর বছর এত বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দেশে আসলে তো দেশের পরিস্থিতিই পাল্টে যেত। কিন্তু ঠিক কত টাকার বিনিয়োগ দেশে এসেছে তার কোন খতিয়ান বিনিয়োগ বোর্ডে নেই। এরকম পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র নিবন্ধনের জন্য পৃথক বোর্ডের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করেন অনেকেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বোর্ডের সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে জনবলের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন। যে কারণে নতুন আইন বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয় শিল্পনীতি ২০১০ প্রণয়ন করে। প্রতিবারের মতো এবারের শিল্পনীতি প্রণয়নের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত নেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতামত অনুযায়ী বিভিন্ন সময়কালে শিল্পনীতি প্রণয়ন করা হলেও এর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। এটি মূলত কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে শিল্প মন্ত্রণালয় এবারের শিল্পনীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে প্রথমে একটি শিল্প আইন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে ‘শিল্প উন্নয়ন ও উদ্ভাবন আইন-২০১২’ আকারে প্রস্তুত করা হয়। এর উপর মতামতের জন্য ২০১২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়। কিন্তু অধিদপ্তর গঠন করার জন্য নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে শিল্প সচিব জানান, সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত পাওয়ার জন্য সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। সকলের মতামত গ্রহণ করার পর প্রয়োজনে বিভিন্ন ধারা পরিবর্তন করে আইনটির খসড়া মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে।