অর্থনীতিতে আমদানির প্রভাব
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৩, ১৫:৫৪
বৈদেশিক বাণিজ্য যেকোন দেশের অর্থনীতির জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য ও সেবা আমদানি ও রফতানি মিলেই এই বৈদেশিক বাণিজ্য। এই উভয়মুখী বাণিজ্যের ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার, বাণিজ্য ভারসাম্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতির হার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। স্বাভাবিকভাবে বলা হয় আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রফতানি আয় বেশি হলে তা জিডিপিতে যুক্ত হয়। অপরদিকে আমদানির তুলনায় রফতানি কম হলে জিডিপি সংকুচিত হয়। এর বিপরীত চিত্রও আছে। উন্নত দেশগুলোতে আমদানি বাড়লে জনগণের সামগ্রিক জীবনমান বাড়ে, যা সরকার ও জনগণের অন্যতম অগ্রাধিকার। আমদানি বাড়লে ভোক্তারা বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনার সুযোগ পায়। রুচিটা একটু নেড়েচেড়ে দেখার সুযোগ হয়। গরিব দেশের অনেক ভোক্তারও এ ঘোড়ারোগ আছে। অনেক ভোক্তা আছেন বিদেশি পণ্য না হলে মন ভরে না। পণ্যের মান যেমনই হোক বিদেশি হওয়া চাই। এটি মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের একটি দিক। তবে ধনি-গরিব, ছোট-বড় যেকোন অর্থনীতির জন্যই এমন বিলাসিতার সুযোগ নেই। অনেক ধনি দেশ জোর করে আমদানি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়তে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বা সার্বভৌম বন্ড বিক্রি করে সেই ঘাটতি মেটায়। ঋণের পাহাড় জমে। ঋণসংকট হয়। অর্থনীতি মন্থর হতে থাকে। এক সময় ধস নামে। ইউরোজোন ও যুক্তরাষ্ট্র এর বড় উদাহরণ।
বাই-আমেরিকান পলিসি বা আমেরিকানদের কেনাকাটা করার নেশা নতুন নয়। জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণে সরকার আমদানিকে নিরুত্সাহিত করে না। বাজার অর্থনীতির নীতি পুরোপুরি মেনে চলে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশ এবং সমাজতান্ত্রিক ধনি দেশগুলো অবশ্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতির ফাঁকফোকর দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার সংরক্ষণ করে। শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা রাখঢাক থাকলেও কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের ক্ষেত্রে অনেকটা প্রকাশ্যেই বাজার সংরক্ষণ করে। উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করে উন্নত দেশগুলোর সাথে টিকতে পারবে না। তাই অনেকটা ঘোষণা দিয়েই অভ্যন্তরীণ বাজার সংরক্ষণ করে। উচ্চ শুল্ক আরোপ, আমদানির ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদান, কোটা আরোপ, জটিল কাস্টমস প্রথাসহ বিভিন্ন অশুল্ক বাধা প্রয়োগ করে। গরিব দেশগুলো অবশ্য অনেক সময় দাতাদের চাপে শ্যাম রাখি না কুল রাখি এমন অবস্থা হয়। এক সময় বাজার উন্মুক্ত করতে বাধ্য হয়। দেশীয় শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ে। বাংলাদেশেও এমন অবস্থা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৪ সালে সরকার অধিকাংশ পণ্যের শুল্ক এক লাফে ৩০০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনে। ফলে দেশে রুগ্ন শিল্প, খেলাপিঋণ ও ঋণ মওকুফের কালচার তৈরি হয়।
অনেক অর্থনীতিবিদের মতে আমদানি একটা প্রয়োজনীয় অমঙ্গল। কারণ আমদানি করলে দেশীয় উত্পাদন স্পৃহা বাধাগ্রস্ত হয়। তা যেমন ঠিক তেমনি আমদানি না করলে দীর্ঘমেয়াদে রফতানি করা যায় না। কারো কারো মতে যা দেশে উত্পাদন হয় না তা আমদানি করা দোষের কিছু নয়। আবার অষ্টাদশ শতাব্দির স্কটিশ দার্শনিক অ্যাডাম স্মিথ যিনি উন্নয়ন রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রবক্তা হিসেবে সুখ্যাত তার মতে, আমদানি সম্পদ গড়ায় অবদান রাখে। অনেকের মতে আমদানি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্তিমিত করে না। বরং আমদানি ও প্রবৃদ্ধি পরস্পর ধনাত্মকভাবে সম্পর্কযুক্ত। ভালোর দিকে গেলে তা বাড়ে। আবার খারাপের দিকে গেলেও তা বেশি খারাপ হয়। তবে সাধারণ ধারণা হচ্ছে আমদানি বাড়লে উত্পাদন কমে। তাই সরকার তার সাফল্যের তালিকায় আমদানি প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্ত করে না। বরং আমদানির অংক প্রকাশকে এড়িয়ে যেতে পছন্দ করে। জিডিপি নিরূপণে ভোক্তা ব্যয়, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় ও রফতানি আয়ের যোগফল থেকে আমদানি ব্যয়কে বিয়োগ করা হয়। তাই আমদানি বাড়লে জিডিপি কমে। বাস্তবে এটি যথাযথ নয়। ভোক্তারা তাদের আয় দেশীয় পণ্য ক্রয়ে ব্যয় করলেই যে জিডিপি দ্রুত বাড়বে এমন নয়। আমদানি মোট জিডিপিকে দাবিয়ে রাখে না। এটা নির্ভর করে কী আমদানি করা হচ্ছে, তা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর। অ্যাডাম স্মিথের মতে আমদানিকে দেখতে হবে বর্তমান উত্পাদন বৃদ্ধির উপকরণ হিসেবে। অথবা ভবিষ্যত্ উত্পাদন বাড়ার লক্ষ্যে বিনিয়োগ হিসেবে। আমদানি হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে সাথে রফতানিও যদি কমে-বাড়ে তাহলে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে জিডিপির ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই বিশ্লেষণ করা যাক। ধরা যাক, কোনো বছর খাদ্যশস্য আমদানি বেড়ে গেল। এতে রফতানি আয় অপরিবর্তিত থাকলেও জিডিপি কিছুটা কমবে। দেখতে হবে এই আমদানি অপচয় বা অনুত্পাদনশীল খাতে ব্যবহূত হচ্ছে কিনা। বাংলাদেশে খাদ্যশস্য আমদানির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে। এ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হতে পারছে। জাতীয় উত্পাদনশীলতা বাড়ছে। আয় ও ভোগ বাড়ছে। জিডিপি বৃদ্ধিতে বেশি অবদান রাখতে পারছে। তাই জনগণের খাদ্য নিরাপত্তায় আমদানি করাটা একটা বিনিয়োগ। যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রবৃদ্ধি অর্জনে অবদান রাখে। আবার টমেটো সস বা পটেটো চিপস আমদানি করলে তা অপচয়ই হবে। কারণ দেশে পর্যাপ্ত টমেটো উত্পাদন হয়। এখন তো গ্রীষ্ম মৌসুমেও প্রচুর টমেটো উত্পাদন হচ্ছে। সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা করলে কর্মসংস্থান হয়। ভোক্তারাও কম দামে কিনতে পারে। প্রয়োজনে দেশীয় বাজার উপযোগী পণ্য উত্পাদনে উদ্যোক্তাদের বিশেষ উত্সাহ দেয়া যেতে পারে। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এ কৌশল প্রয়োগ করছে। আলু উত্পাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। উত্পাদন বেশি হওয়ায় মৌসুমে দাম এত পড়ে যায় যে, চাষিরা উত্পাদন মূল্যও পায় না। তাই চিপস দেশেই উত্পাদন হতে পারে। তা না করে আমদানি করা মানেই দেশের উত্পাদনে মূল্য সংযোজিত হলো না। আলুও নষ্ট হলো। শিল্প স্থাপিত না হওয়ায় কর্মসংস্থানও হলো না। দারিদ্র্য ঘুচলো না। আয় বাড়লো না। ক্রয়সামর্থ্যও বাড়লো না।
সারণী থেকে দেখা যায়, মেশিনারি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি ব্যয় দেশের মোট আমদানির ৭৭ থেকে ৮১ শতাংশ। যদিও আমদানিকৃত মধ্যবর্তী পণ্যের সবটাই মূল্য সংযোজিত হয় না। তার আগেই ব্যবহার হয়ে যায়। শিল্পখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের যন্ত্রপাতি ব্যাপক আমদানির কারণে বিগত দুই অর্থ বছর মেশিনারি আমদানি অনেক বেড়েছে। এ দুটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েও বলা যায়, বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় আমদানি অনেক কমেছে। কারণ সরকার বিলাস সামগ্রী আমদানি নিরুত্সাহিত করছে। তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের ফলে গত দুই বছর জ্বালানি তেল আমদানিও অনেক বেড়েছে। বর্তমান সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপের ফলে বিদ্যুতের বিশাল ঘাটতি মিটিয়ে দেশ এখন একটা স্বস্তিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। আরও বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। তাই চলতি অর্থ বছরে জ্বালানি আমদানি আরো বাড়বে। সারণীতে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আমদানি প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রফতানি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, আমদানি সঠিকভাবেই রফতানিতে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। পাশাপাশি দেশে আত্মকর্মসংস্থানের একটা ভাল আবহ সৃষ্টি হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এখন আর চাকরির আশায় বসে থাকে না। সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে নিজেরাই কিছু করছে। এদের একটা অংশ কাজ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ বেকারের বৈদেশিক কর্মসংস্থান হচ্ছে।
দেশি-বিদেশি শিল্প বিনিয়োগ বাড়লে উচ্চ মজুরিতে নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত আমদানি-রফতানির ফলে রাজস্ব আয় বাড়ে। সেবাখাত ও পরিবহন সেক্টর সম্প্রসারিত হয়। প্রতিটি খাতেই ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়। মানুষের আয় বাড়ে। এর ফলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বাড়ে। এ চাহিদা পূরণে আমদানি ও উত্পাদন বাড়ে। অর্থনীতিতে গতিশীলতা বাড়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হার বাড়ে। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার এ কৌশলই অবলম্বন করছে। ফলে গড়ে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমদানি-রফতানি মুদ্রা পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলে। রফতানির তুলনায় আমদানি অনবরত কমতে থাকলে দেশীয় মুদ্রা শক্তিশালী হয়। এটি রফতানিকারকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের আয় কমে যায়। রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমেও মুদ্রামান বাড়ে। তবে সেক্ষেত্রে রফতানিকারকদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় না। আমদানি অব্যাহতভাবে বাড়লে মুদ্রার মূল্যমান হ্রাস পায়। এ অবস্থা রফতানিকারকদের নিকট পছন্দীয় হলেও এতে মূল্যস্ফীতি ঘটে। ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়ে। আবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লে সুদহার কমানো সহজ হয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুতই বাড়ছে। বর্তমানে তা ১ হাজার ৪১১ কোটি ডলার। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ। রিজার্ভ বৃদ্ধির সাথে সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহারও কিছুটা কমিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা উত্সাহিত হবেন। দেশি বিনিয়োগ বাড়লে তুলনামূলকভাবে অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। কারণ তারা শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী হয়। তাই সুদহার আরেক ধাপ কমিয়ে আরো দেশীয় বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি প্রভৃতি উত্পাদন সহায়ক পণ্য আমদানি সব সময়ই অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। এখানেও চ্যালেঞ্জ আছে। বাজারের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ গতিধারা বিশ্লেষণ না করে উত্পাদন করলে তা অমঙ্গলই বয়ে আনে। এজন্য এফবিসিসিআই-এর তত্ত্বাবধানে সার্বক্ষণিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশ্বায়ন ব্যবস্থায় নিরন্তর গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাবনাময় পণ্য ও সেবা উত্পাদন করেই দীর্ঘ মেয়াদে শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব। এভাবেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। ২০২১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে।
সারণী: বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি চিত্র (কোটি ডলারে)
পণ্য/অর্থ বছর ২০০৮-০৯ ২০০৯-১০ ২০১০-১১ ২০১১-১২
মেশিনারি ৩০৭ ৩৫৫ ৬০২ ৭৫৩
কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য ১,৫৩৫ ১,৫২৩ ২,০৭০ ১,৯৮৮
জ্বালানি তেল ২০৪ ২২৯ ৩১৮ ৪৪৮
ভোগ্যপণ্য ২০৫ ২৫৯ ৩৭৬ ৩৬৩
মোট আমদানি ২,২৫১ ২,৩৬৬ ৩,৩৬৬ ৩,৫৫২
প্রবৃদ্ধি হার ৪.০৭ ৫.১১ ৪২.২৭ ৫.৫৩
রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হার ৪.৫১ ৪.১১ ৪১.৫৪ ৫.৯৩