আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি যেখানে

আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি যেখানে—চমক সৃষ্টি করার জন্য শিরোনামটি ব্যবহার করিনি। আমরা সবাই জানি সবাই বুঝি কোথায় আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি। আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি শিক্ষাক্ষেত্রে। এবার নিশ্চয় কেউ দ্বিমত করবেন না। ‘হররোজ হরতাল/এর সাথে রাখি তাল কীভাবে?’ তবু তাল রেখে চলেছি— বাজার করছি— খাচ্ছি দাচ্ছি— নানান কথায় ঝড় তুলছি চায়ের কাপে। কিন্তু যে কাজটি করতে পারছি না একেবারেই তা হলো সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে। বর্তমানের নিঃসঙ্গ জীবনে, পাড়াপড়শিবিহীন জীবনে, খেলার মাঠবিহীন জীবনে একজন শিক্ষার্থীই সবচেয়ে নিঃসঙ্গ। দিনের পর দিন গৃহবন্দী জীবনে তার মতো কষ্টের দিন আর কেউ পার করে না। যন্ত্রপাতির সামনে বসে কতক্ষণ কাটে তার? এটা সবারই উপলব্ধি করা ফরজ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই একমাত্র জায়গা যেখানে গেলে শিক্ষার্থী স্বাচ্ছন্দবোধ করে। প্রাণ খুলে সহপাঠীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। শিক্ষকের সঙ্গেও নানান বিষয়ে শেয়ার করে—তার ভালো লাগে। সেই ভালোলাগার স্থানটুকুও কেড়ে নিয়ে আমরা তাদের কী সর্বনাশই না করছি। অনেক ক্ষতি অনেকভাবে পুষিয়ে নেয়া যায়—কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যদি অমনোযোগী হয়ে যায়—শিক্ষা থেকে সরে যায় ঝরে যায়—এ ক্ষতি পূরণ করা দুরূহ ব্যাপার। এটা হূদয় দিয়ে বুঝতে হবে। চাকরিজীবী মা-বাবা সন্তানকে স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে কাজ করতে পারেন। কিন্তু হরতালের দিনে তারা কোনো না কোনো ভাবে কর্মক্ষেত্রে যেতে বাধ্য হন—তাদের সন্তান কার কাছে কীভাবে থাকবে, সে চিন্তায় সারাক্ষণই অস্থির থাকেন। কাজ করবেন কোন মানসিকতায়? সুতরাং কর্মক্ষেত্রেও তাঁরা যথাযথ শ্রম দিতে পারছেন না। এতে লাভ হচ্ছে কার? আমরা কেবলই পেছনে চলি নেতার আদেশে। প্রশ্ন হচ্ছে—সন্তানের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে আমরাই বা কত দিন পেছনে চলবো? এর বিকল্প পথ বের করতেই হবে। কেননা সন্তানের শিক্ষাজীবন নিয়ে আপস চলে না। এমনিতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটিছাটা বেশি তার ওপরে গোদে বিষ ফোঁড়ার মতো হরতাল বোঝার ওপর শাকের আঁটি। শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ব মনে রেখে, তাদের শিক্ষাজীবন সচল রাখতে আমাদের অবশ্যই চিন্তা করতে হবে। হরতালের স্থবির পথ থেকে বেরিয়ে এসে সচল পথের ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে আমরা সত্যি ধ্বংস হয়ে যাবো। বিশ্ব যেখানে এগিয়ে চলেছে তখন আমরা কেন পিছিয়ে পড়বো? কেন আমরা আমাদের অতি আদরের আত্মজ-আত্মজার শিক্ষাজীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবো বা খেলতে দেবো? দেশের সচেতন নাগরিকের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ—শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটা পন্থা বের করুন যাতে ওরা পড়ালেখা করতে পারে, আগামী বিশ্বের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীই আমাদের ভবিষ্যত্—আমাদের আশা ভরসা—তারা যদি কোনো কারণে পিছিয়ে পড়ে—নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আমরা শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়—জাতিগতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবো। এটা আমাদের কারোই কাম্য হতে পারে না। আসুন আমরা আমাদের সন্তানদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাই—নিজেরাও বাঁচি। ঢাকা