চট্টগ্রাম-চাঁদপুর ট্রেনে যাতায়াত প্রসঙ্গ

খুলনা, বরিশাল বিভাগ ও বৃহত্তর ফরিদপুরের মোট ২১টি জেলা নিয়ে গঠিত দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। অনেকেই সংক্ষেপে বলেন দক্ষিণাঞ্চল। চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধান প্রবেশদ্বার হচ্ছে চাঁদপুর, যেমন রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধান প্রবেশদ্বার মাওয়া। চাঁদপুর হয়ে এ যোগাযোগব্যবস্থা অতি সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী। এক্ষেত্রে যা অপরিহার্য তা হলো, চট্টগ্রাম থেকে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম-চাঁদপুর বিরতিহীন ট্রেন অবিলম্বে চালু করা এবং একই রেলপথে স্বল্প দৈর্ঘ্যের লাকসাম রেলওয়ে বাইপাস নির্মাণ করা। তিন দশক ধরে এ রেলপথে মাত্র দুটি ট্রেন চলাচল করছে, অথচ যাত্রী বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। চট্টগ্রাম-চাঁদপুর লাইনে চালু ‘সাগরিকা এক্সপ্রেস’ ও ‘মেঘনা এক্সপ্রেস’ ট্রেন দুটির চারটি ট্রিপে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার যাত্রীরা ভ্রমণ করতে পারে না। এ ট্রেন দুটি শুধু রেলপথসংলগ্ন লোকাল যাত্রীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এসব লোকাল যাত্রীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিনা টিকেটে ভ্রমণ করে। যাত্রীরা সাগরিকা এক্সপ্রেসের নাম দিয়েছে ‘টিটিই-গার্ড-ড্রাইভারের ট্রেন’। সহজভাবে বলা যায়, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর লাইনে ট্রেনের বিদ্যমান সময়সূচি, অতি মন্থরগতি ও সংখ্যাল্পতার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচ কোটি মানুষ এ রেল সংযোগের কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। পূর্বাঞ্চলীয় রেলের সদর দপ্তর চট্টগ্রামের সিআরবিতে যাঁরা চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রেল পরিচালনার দায়িত্বে আছেন তাঁরা কোনোক্রমেই এর দায় এড়াতে পারেন না। চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে তিনটি রুট আছে। প্রথমটি হচ্ছে চট্টগ্রাম-ঢাকা-মাওয়া রুট অথবা চট্টগ্রাম-ঢাকা-পাটুরিয়া রুট। দ্বিতীয়টি হচ্ছে চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুট। ভোলা ও বরিশালে যাওয়ার জন্য তৃতীয় একটি রুট হচ্ছে চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর-ভোলা রুট। এ রুটটি ভোলা জেলা ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। তাছাড়া এ রুটটি বছরের অধিকাংশ সময় নাব্যতা সংকটে অচল থাকে। দীর্ঘ নৌপথ সংশ্লিষ্ট এ রুটে রেল সড়ক ব্যবহারেরও কোনো সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম থেকে ভায়া ঢাকা-মাওয়া বা ঢাকা-পাটুরিয়া পথে দক্ষিণাঞ্চলে যেতে একজন যাত্রীকে এলাকাভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়, ভ্রমণকাল হয় ১২ থেকে ২০ ঘণ্টা, জনপ্রতি ন্যূনতম পরিবহন ব্যয় ১,০০০ টাকা। কিন্তু ভায়া চাঁদপুর পথে (প্রস্তাবিত বিরতিহীন ট্রেন চালু হলে) একজন যাত্রীকে এলাকাভেদে অতিক্রম করতে হবে ২০০ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার, ভ্রমণকাল হবে ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা, জনপ্রতি পরিবহন ব্যয় হবে ১৫০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতকারী যাত্রীরা বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীরা চট্টগ্রাম-ঢাকা-মাওয়া পথে অথবা চট্টগ্রাম-ঢাকা-পাটুরিয়া পথে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে গন্তব্যে যেতে দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করে। অথচ প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম-চাঁদপুর বিরতিহীন ট্রেন চালু করলে গন্তব্যের দূরত্ব নেমে আসবে অর্ধেকে, ভ্রমণকাল ও পরিবহন ব্যয় হবে এক-তৃতীয়াংশ। জাতীয় জ্বালানি সম্পদের হবে বিপুল সাশ্রয়। এ কারণে দক্ষিণাঞ্চলের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম থেকে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম-চাঁদপুর বিরতিহীন ট্রেন চালু ও একই রেলপথে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ‘লাকসাম বাইপাস’ চাইছে। চট্টগ্রাম-চাঁদপুর বিরতিহীন ট্রেনের একটি অতিরিক্ত সুবিধা আছে। চট্টগ্রাম-ঢাকা বাসে ও ট্রেনে ভ্রমণকাল প্রায় সমান (৬/৭ ঘণ্টা)। কিন্তু চট্টগ্রাম-চাঁদপুর বাসে ভ্রমণকাল ৬ ঘণ্টা কিন্তু বিরতিহীন ট্রেনে ভ্রমণকাল ৩ ঘণ্টা। ট্রেনভাড়া বাসভাড়ার এক তৃতীয়াংশ। বিরতিহীন ট্রেনে বর্তমান হারে ভাড়া মাত্র ১২০ টাকা, কিন্তু বাসভাড়া ৩৫০ টাকা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন ২৭টি আন্তঃনগর ট্রেন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেড়ে যায়। কিন্তু চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যের লক্ষ্যে ছাড়ে মাত্র ১০টি আন্তঃনগর ট্রেন। সুতরাং চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে রেল পরিচালনা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ। চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রেলপথের দৈর্ঘ্য মাত্র ১৮০ কিলোমিটার (যা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দৈর্ঘ্যের প্রায় অর্ধেক) হওয়াতে প্রস্তাবিত ‘চট্টগ্রাম-চাঁদপুর বিরতিহীন ট্রেন’ চালু করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চারটি ট্রিপ বাড়বে। বর্তমানে মিটারগেজ ইঞ্জিনের সংকট চলছে এবং বিদেশ থেকে ইঞ্জিন এলে প্রস্তাবিত ‘চট্টগ্রাম-চাঁদপুর বিরতিহীন ট্রেন’ চালু করা যেতে পারে বলে জানা গেছে। মিটারগেজ ইঞ্জিনের সংকটকালীন সময়ের জন্য আমি একটি বিকল্প প্রস্তাব করছি। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ৮টা ৩০ মিনিটে চালু সাগরিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটির যাত্রা সময় এগিয়ে নিয়ে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে করা যায়। ট্রেনটি থেকে ১২টি ভগ্ন ও জরাজীর্ণ কোচ বাদ দিয়ে ১৮টি আন্তঃনগর ট্রেনের কোচ যুক্ত করা যায়। তা হলে প্রচলিত ইঞ্জিনেই ট্রেনটি চলতে পারে। লাকসামের আগে কোনো বিরতি না দিলে দুপুর ১২টার আগেই সাগরিকা এক্সপ্রেস চাঁদপুর পৌঁছতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে, দুপুর ১২টার পরে দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশের জন্য চাঁদপুরের বিপজ্জনক মেঘনা পার হতে নিয়মিত কোনো নৌযান থাকে না। চট্টগ্রাম ও লাকসামের মধ্যবর্তী লোকাল স্টেশনের যাত্রীরা কর্ণফুলী, চট্টলা, পাহাড়িকা ও মহানগর প্রভাতীতে যাতায়াত করতে পারে। এই চারটি টেনের প্রয়োজনীয় বিরতিগুলো দেয়া যায়। তাছাড়া লোকাল যাত্রীদের স্বল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে যাতায়াতের জন্য রেলপথের সমান্তরালে সড়কপথে রয়েছে হরেক রকমের যানবাহন।‘সাগরিকা এক্সপ্রেস’-এ চট্টগ্রাম ও লাকসামের মধ্যবর্তী লোকাল যাত্রীদের কারণে একদিকে রেলবিভাগ আর্থিকভাবে বিপুল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে চাঁদপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সরাসরি যাত্রীরা চট্টগ্রাম থেকে ‘সাগরিকা এক্সপ্রেস’-এ উঠতে পারছে না। অধিকন্তু চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরের মধ্যবর্তী ১৮০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে ৩ ঘণ্টার স্থলে ব্যয় হচ্ছে ৮/৯ ঘণ্টা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে মন্থরতম, ‘কার্বন ডাই-অক্সাইডের জেনারেটর’ ও ‘টিটিই-গার্ড ড্রাইভারের ট্রেন’ হিসাবে খ্যাত ‘সাগরিকা এক্সপ্রেস’ পূর্বাঞ্চলীয় রেলের Liability থেকে রাষ্ট্রের একটি Asset-এ রূপান্তরিত হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়