প্রাথমিক শিক্ষায় বৃত্তি নিয়ে পুকুরচুরি
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৩, ২১:১১
২০১২ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় মেহেরপুর সদর উপজেলায় প্রায় ৪৫০০ জন ছাত্রছাত্রী অংশ নিয়েছিল। যে ৩১৮ জন ছাত্রছাত্রী জিপিএ ৫ বা এ+ পায়, তার মধ্যে আমার মেয়েও একজন।
২০১১ সাল পর্যন্ত স্ব স্ব উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের নিয়ন্ত্রণে কোনো একটি স্কুলে বসে একাধিক শিক্ষক একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরীক্ষার খাতাগুলো দেখতেন বা মূল্যায়ন করতেন । এই প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে ২০১২ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার খাতাসমূহ এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় প্রেরণ করা হয়। পরীক্ষার খাতাসমূহ মূল্যায়নের জন্য জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (NAPE), ময়মনসিংহ কর্তৃক একটি নীতিমালা সারা বাংলাদেশের পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে প্রেরণ করা হয়। খাতা মূল্যায়নের জন্য মাত্র ৬ দিন সময় বরাদ্দ ছিল।
আমরা সবাই জানি জিপিএ ৫ সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট। আর জিপিএ ৫-এর স্কোর হলো ৮০ থেকে ১০০-র মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর । অর্থাত্ ৮০ নম্বর পেলে জিপিএ ৫ আবার ১০০ নম্বর পেলেও জিপিএ ৫। তাহলে মেধাবীদের মধ্যে পার্থক্য কী হলো ? পার্থক্য অবশ্যই আছে। জিপিএ ৫ সর্বোচ্চ মেধার মান নির্ণয় করে না। মেধার মান নম্বরের ভিত্তিতেই হতে হবে। কেননা ৮০ আর ১০০ কখনোই এক হতে পারে না। পরীক্ষার ফলাফলের ২/৩ মাস পর ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি প্রদান করা হবে মেধাক্রম নম্বরের ভিত্তিতেই— জিপিএ ৫-এর ভিত্তিতে নয়।
পরীক্ষার ফলাফলের পর ইন্টারনেট থেকে মেয়ের মার্কশিট ওঠালাম। সেখানে ফলাফল জিপিএ ৫ বা এ+পেলাম। খাতা ঠিকমতো মূল্যায়ন করা হয়েছে কিনা এরকম একটা কৌতূহল থেকে প্রতি বিষয় ২০০ টাকা হারে ১২০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট জমা দিয়ে সব খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করলাম। পুনর্নিরীক্ষান্তে জানতে পারলাম গণিত ছাড়া ৫ বিষয়ে নম্বর কম দিয়ে আমার মেয়ের খাতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। শুধু তাই নয় সমাজ বিষয়ে ৮৫ নম্বর পেলেও তাকে খাতার ওপরে মোট নম্বর ৮১ করে রাখা হয়েছে। ৪ নম্বর গণনা করা হয়নি। আমি যদি ১২০০ টাকা খরচ করে জিপিএ ৫ পাওয়া খাতাসমূহ পুনর্নিরীক্ষণ না করতাম তাহলে আমার মেয়েকে এই ৮১ নম্বর নিয়েই থাকতে হতো। আর এই ৪ নম্বর যোগ হওয়ার কারণেই তার মোট নম্বর ৫৫৬ থেকে বেড়ে ৫৬০ হয়েছে। যার ফলে সে কোনো রকমে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে । আমি যদি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের ব্যাপারে উদ্যোগী না হতাম তাহলে আমার মেয়ে বৃত্তিই পেতো না!
আমি খাতা মূল্যায়নে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার চেয়ে ২৭-১-১৩ তারিখে রেজিস্ট্রার ডাকযোগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধিকর্তা মহাপরিচালক মহোদয় বরাবর আবেদন করি। যার অনুলিপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিবদ্বয়, মহাপরিচালক ও পরিচালক (নেপ) এবং সকল পরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বরাবর প্রেরণ করি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানতে পারিনি।
যে সমস্ত ছাত্রছাত্রী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর পূর্বে অনুরূপ মডেল টেস্ট পরীক্ষায় ৬০০ নম্বরের মধ্যে ৫৭৫ বা ৫৮৫ নম্বর পেয়ে উপজেলার সেরা দশের মধ্যে ছিল—তারা কেউই বৃত্তি পায়নি । এই হলো আমাদের মেধার মূল্যায়ন। এই হলো আমাদের জিপিএ ৫-এর খেলা। তাই পরীক্ষার প্রকৃত নম্বর জানতে হবে এবং আমাদের খাতা পুনর্মূল্যায়ন করার সুযোগ দিতে হবে। কেননা নম্বরের ভিত্তিতেই মেধার মাপকাঠি নির্ণয় হবে।
মেহেরপুর