‘চিঠি দিও পত্র দিও জানাইও ঠিকানা’

বাড়ির পাশ দিয়েই রানার যেতেন। তাঁকে দেখে স্কুলে যাওয়ার সময় নির্ধারণ করতাম ঘড়ির বিকল্প হিসেবে। তখনকার দিনে রানারের সময়ানুবর্তিতা ছিল ঈর্ষনীয়। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল সময়ের সঙ্গে তাল মেলানো। ‘রানার’ নিয়ম ও সময়ের প্রতিশব্দ বনে গিয়েছিল। সুকান্তের বিখ্যাত ‘রানার’ কবিতায় তা সুন্দরভাবে বিবৃত হয়েছে। তাঁর কাজ চিঠি বহন করা। চিঠিপত্র-পত্রিকা-ম্যাগাজিন ভরা ফোলা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এক ডাকঘর থেকে অন্য ডাকঘরে পৌঁছে দেয়া। তখন মফস্বলের ডাকঘরগুলোতে প্রচুর চিঠি আসতো। আমাদের পোস্টমাস্টার ছিলেন ননী বিশ্বাস। এ পদে সাধারণত বিশিষ্ট সজ্জনরাই নিয়োগ পেতেন। পেশা নয়, ব্রত হিসেবে কাজটি করতে হতো। সঙ্গত কারণেই গ্রামের পোস্টমাস্টার একজন সম্মানিত ব্যক্তি। রবিবার বন্ধ, সপ্তাহে ৬ দিন ডাকঘর খোলা থাকতো। গড়পরতা ৪ দিন আমাদের চিঠি আসতো। স্কুলের ফাঁকে প্রায় প্রতিদিন কাছের ডাকঘরে যেতাম। দেখেছি, কোনোদিন চিঠিপত্র কম এলে পোস্টমাস্টার বাবুর মুখ শুকিয়ে যেতো। কলকাতা দমদম বিমানবন্দরের প্রাক্তন গ্রাউন্ড সুপারভাইজার হীতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এক সময় আমাদের পোস্টমাস্টার ছিলেন। অত্যন্ত কর্তব্যপরায়ন এ ব্যক্তিটিকে দেখেছি খুব যত্ন করে খাম বা পোস্টকার্ডের গায়ে সিল মারতে। তিনি বলতেন, ‘এগুলো কালের সাক্ষী, ডাকঘরের নাম, কত তারিখে এলো বা গেলো তা স্পষ্ট করে চিহ্নিত থাকা জরুরি।’ আমিও ভেবেছি হ্যাঁ জরুরিই তো বটে। সব জরুরির অবসান ঘটেছে, এখন আর কেউ চিঠি লেখে না। চিঠি পড়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, পরিবার, ঐ সময়কার ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষার চমকপ্রদ ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়। চিঠি বাস্তবিকই কালের সাক্ষী। চিঠিও নেই সাক্ষীও নেই। পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারবে না অনেক পারিবারিক সামাজিক তথ্য। চিঠির বিকল্প হিসেবে মেসেজ, এসএমএস স্থান করে নিয়েছে। যোগাযোগ হয় চ্যাটিং-এর মাধ্যমে। মোবাইল এখন কথা আদান-প্রদানের অনিবার্য বস্তু। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই চিঠির জন্ম। পরবর্তীকালে তা শুধুই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে সভ্যতা-ভব্যতা, আভিজাত্য, সৌজন্যবোধ প্রকাশ পেতো। ভাষার উত্কর্ষচর্চারও মাধ্যম ছিল এই চিঠি। প্রণয়ের খুঁটিনাটি বিষয় প্রকাশের উত্কৃষ্ট সুযোগ পাওয়া যেতো চিঠির মাধ্যমে। স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রাসঙ্গিক শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে চিঠি লেখা নতুন বউয়ের এক বিশাল যোগ্যতা। চিঠিতে মনের আকুতি যতটুকু প্রকাশ করা যায়, অন্যভাবে তা সম্ভব নয়। আমার নানা তাঁর মেয়ের (আমার মায়ের) কাছে চিঠি লিখে খামের ওপর নামের আগে লিখতেন, ‘নূর চশেম’ অর্থাত্ ‘চোখের আলো’। সেই চোখের আলো আজ বার্ধক্যে ন্যুব্জ। আমার পিতা তাঁর পিতার কাছে লিখতেন, ‘বখেদমতে আরজ এই...’। তাঁরা আজ বেঁচে নেই। চিঠিগুলো আজো যেন জ্বলজ্যান্ত। পুরাতন চিঠিগুলো বলছে— তাঁরা কেমন ছিলেন, কতটুকু বুঝতেন, জানা ও লেখার দৌড় ছিল কোন পর্যায়ের। সবাই বোঝেন সফট কপি কখনো হার্ড কপির বিকল্প হয় না। সফট ডিলিট হয়ে যায়। হার্ডের স্থায়িত্ব অনেক বেশি। একটি চিঠির সফট কপির অবস্থান অন্ধকারে। প্রয়োজনে একে নাও পাওয়া যেতে পারে। হার্ড কপির সরব উপস্থিতিকে মুছে ফেলা যায় না। তাই দেখা যায়, বিখ্যাত লোকদের পুরনো চিঠিপত্র অনেক দামে নিলাম হতে। বড় বড় ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানতে তাঁদের চিঠিপত্র এক বিশেষ উপাদান। চিঠিহীন যুগে জানাজানির ব্যাপারে বিকল্প উপাদানের সন্ধান করতে হবে। আমি জানি না তিনি কী পরিমাণ চিঠি লিখেছেন, তারপরও প্রতীক্ষায় আছি কেউ সম্পাদনা করবেন ‘হুমায়ূনের পত্রাবলী’। দেখার বড় ইচ্ছা, এই কথার জাদুকর চিঠিপত্র কীভাবে লিখতেন। আমাদের সংস্কৃতি থেকে চিঠিপত্র ঝেরে ফেলা উচিত নয়। সবাইকে চিঠি লেখার প্রতি উত্সাহিত করা প্রয়োজন। নানা উপাদানের প্রবাহ থাকে এই চিঠিতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শেয়ার করে যেখান থেকে পেতে পারে তথ্য, তাকে রুদ্ধ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রয়োজনে চিঠি লেখার জন্য প্রণোদনা কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। ‘চিঠি দিও পত্র নিও জানাইও ঠিকানা’— বিরহিণীর এ কাতর কণ্ঠ অন্য কোনোভাবে প্রকাশ সম্ভব নয়। চিঠির প্রয়োজন ফুরিয়েছে—কথাটি সঠিক নয়। হয়তো অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটেছে। মাধ্যম বদল হয়েছে। নেত্রকোনা