মুন্সিগঞ্জে জনসভায় খালেদা জিয়া
সরকার মসজিদে তালা দিচ্ছে নাস্তিকদেরও রক্ষা করছে
আনোয়ার আলদীন, লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) থেকে
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৩, ২১:৪৮
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, এই সরকার একদিকে মসজিদে তালা দিয়েছে, অন্যদিকে নষ্ট প্রকৃতির নাস্তিকদের পাহারা দিচ্ছে, লালন-পালন করছে। তিনি শাহবাগের মঞ্চ অবিলম্বে বন্ধের জন্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এসব মঞ্চ ফঞ্চ বন্ধ না হলে জনগণ হাঁটা দেবে ঢাকায়। সেখানে জনগণের মঞ্চ করে সরকারকে বিদায় করবে। তিনি বলেন, সরকারের পায়ের নীচে মাটি নেই, সেজন্য ইস্যু খুঁজছে। এখন মন্দির ভাঙা শুরু করেছে। এরপর মসজিদও ভাঙতে পারে। গতকাল শুক্রবার মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গোয়ালীমান্দ্রা বাজারে সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পরিদর্শন শেষে স্থানীয় বাজারে এক সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।
বেগম খালেদা জিয়া বলেন, এখানে হামলা করা হয়েছে, তাই দেখার জন্য এসেছি। যারা মন্দির ভেঙেছে তাদের সরকার ধরেনি। উল্টো বিএনপির ওপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা সকল ধর্মের মানুষকে সম্মান করি, মর্যাদা দেই। কিন্তু আজ কোনো ধর্মের মানুষ নিরাপদ নয়। প্রতিনিয়ত তারা (সরকার) খুন করে চলেছে।
তিনি বলেন, এই ব্যর্থ সরকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। কেলেঙ্কারি, অপকর্ম ঢাকতে গণহত্যা শুরু করেছে। পদ্মা সেতু শুরুর আগেই কমিশন খেয়ে বসে আছে। এ কারণে বিশ্বব্যাংক টাকা দেয়নি। অন্য সংস্থাগুলোও ফিরে গেছে। লোক দেখাতে তারা হয়তো একটা ভিত্তিপ্রস্তর দেবে। কিন্তু সেতু করতে পারবে না। এই সরকার আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতিবাজ।
তিনি বলেন, এই সরকারের সময় মুন্সীগঞ্জে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমরা আবার নির্বাচিত হলে মন্দির নির্মাণ করে দেব এবং এই এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করবো।
খালেদা জিয়া বলেন, পদ্মা সেতু, শেয়ারবাজার, হলমার্ক, ডেসনিটি এসব নিয়ে যখন লেখালেখি হচ্ছে, দুর্নীতি নিয়ে যখন তোলপাড় শুরু হয়েছে তখন দৃষ্টি ফেরানোর জন্য শাহবাগে নাস্তিকদের নিয়ে মঞ্চ তৈরি করেছে। তারা বলে, ফাঁসি চাই। তরুণ সমাজ রাজাকারদের ফাঁসি চায়। বলে স্বাধীনতা বিরোধী মানবতাবিরোধীদের ফাঁসি চাই। আমরাও বলেছি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার চাই। দলমত দেখলে চলবে না। বিচার করতে হলে সবার বিচার করতে হবে। তারা শুধু বিএনপি আর জামায়াতের লোকদের ধরেছে।
শাহবাগে কারা? এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, তারা নিরপেক্ষ ছেলে নয়। সব আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকজন। তারা সব নাস্তিক। তারা কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না। তারা নষ্ট প্রকৃতির। তারা আদালত মানে না, দেশের আইন মানে না। রাস্তা বন্ধ করে দিনের পর দিন এসব কাজ করছে।
তিনি বলেন, শাহবাগের নাস্তিকদের যখন দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন তারা হিন্দুদের মন্দির ভাঙা শুরু করেছে। সরকারকে আমি হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, আর যদি কোনো মন্দির ভাঙা হয় জনগণ রুখে দেবে, সেজন্য শাস্তি পেতে হবে। এর আগে কক্সবাজারের রামুতে তারা বৌদ্ধ মন্দির ভেঙেছে। সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে ধর্মহীনতার কাজ করছে।
তিনি বলেন, শাহবাগের ওই তরুণরা সেখানে শুধু নাচে আর নানা অপকর্ম করে। বিরোধীদলের বিরুদ্ধে কথা বলে। পত্রিকা বন্ধ করতে বলে। তারা সরকারের দুর্নীতির কথা বলে না। কর্মসংস্থানের কথা বলে না। সীমান্তে বিদেশিরা মানুষ হত্যা করে—তা বলে না। শুধু ফাঁসি ফাঁসি আর ফাঁসি। সরকার তাদের টাকা দিয়ে, খাবার দিয়ে লালন-পালন করছে।
তিনি বলেন, আমাদের সমাবেশে হামলা করে পণ্ড করে দিচ্ছে। অফিসের সামনে সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। দলের অফিস ভেঙে তছনছ করেছে। ১৫৪ জনকে ধরে নিয়ে গেছে। এই কি পুলিশের কাজ? আমি দেখে অবাক হয়ে গেছি। মনে হয় যেন ডাকাত পড়েছে। টাকা পয়সা কাগজপত্র সব লুটপাট করে নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমাদের দলীয় কার্যালয়ে দিনরাত প্রচুর লোক আসে, যায়। সেখানে কাজকর্ম চলে। পুলিশরা পকেটে করে বোমা নিয়ে রেখেছে। সাংবাদিকদের বের করে বোমা রেখে আবার তাদের ডেকে বলে বোমা পেয়েছি। বিএনপি অফিস বোমা রাখার জায়গা না।
খালেদা জিয়া বলেন, শাহবাগের নাস্তিকরা নবীজী (স.) সম্পর্কে কটূক্তি করেছে। এতে মুসলমানদের মনে আঘাত লাগে। সেজন্য তারা কর্মসূচি দিয়েছিল। প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ বাইতুল মোকাররম। সরকার একদিকে নাস্তিকদের পাহারা দিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে মসজিদে তালা দিয়ে রেখেছে। এ পর্যায়ে তিনি বলেন, এসব মঞ্চ ফঞ্চ বন্ধ করুন। তা না হলে জনগণ হাঁটা দেবে ঢাকায়। সেখানে মঞ্চ করে সরকারকে বিদায় করে দেবে।
তিনি বলেন, হরতাল হলেই সরকার পুলিশ, র্যাব সব রাস্তায় নামায়। অথচ আওয়ামী লীগের লোকেরা অস্ত্র নিয়ে মিছিল করে। তারা বিশ্বজিতকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগ নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছু বোঝে না।
খালেদা জিয়া পুলিশের উদ্দেশে বলেন, আপনারা অনেক মানুষ হত্যা করেছেন। এই হত্যা বন্ধ করেন। পুলিশ যদি এভাবে মানুষ হত্যা করে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাহলে পুলিশ বাহিনীকে আগামীতে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে নিষিদ্ধ করবে।
তিনি বলেন, আজকে দেশের অবস্থা খারাপ। অনেক লোক জেলে রয়েছে। অবিলম্বে তাদের না ছাড়লে ১৮-১৯ মার্চ হরতাল পালন করে সরকারকে সমুচিত জবাব দেবেন।
খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার গুলি করে ১৭০ জনকে হত্যা করেছে। তার দায় এড়াতে পারবে না। এখন ক্ষমতায় আছেন, কাউকে ধরছেন না। ক্ষমতা থেকে বিদায় হলে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে।
তিনি বলেন, এই সরকারের পায়ের নীচে মাটি নেই। তাই মন্দির ভাঙছে। কয়দিন পর মসজিদও ভাঙতে পারে। এই সরকারকে বিদায় নিতে হবে।
এর আগে বেলা সাড়ে তিনটায় গুলশানের বাসা থেকে গাড়ি বহর নিয়ে খালেদা জিয়া রওনা করেন। বিকাল পাঁচটায় তিনি লৌহজং পৌঁছান। খালেদা জিয়া গোয়ালীমান্দ্রায় প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পরিদর্শন ও স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। সন্ধ্যা ৬টায় তিনি ঢাকায় রওনা করেন।
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাদেক হোসেন খোকা, সেলিমা রহমান, মিজানুর রহমান সিনহা, আবদুল হাই প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এদিকে বেগম খালেদা জিয়ার আগমনের প্রতিবাদে গতকাল মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গোয়ালীমান্দ্রা গ্রামে মনিপাড়া কালিমন্দির মাঠে এলাকাবাসীর ব্যানারে সংখ্যালঘুরা এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। মুখে কালো কাপড় বেঁধে এবং হাতে কালো পতাকা ও বিভিন্ন শ্লোগান লেখা ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা মানববন্ধনে অংশ নেয়। এর আগে এলাকাবাসীর ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল কালিমন্দির এলাকা প্রদক্ষিণ করে। উল্লেখ্য, গত ৩ মার্চ রাতের আঁধারে গোয়ালীমান্দ্রা কালিমন্দিরে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়।