জামায়াত শিবির নিষিদ্ধ করতে
সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৩, ২১:৪৮
জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সামপ্রতিক সময়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র তৈরি করা ও তা জনসম্মুখে প্রকাশের আহবান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। পাশাপাশি এ দেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য সরকারকে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করারও আহবান জানানো হয়।
‘যুদ্ধাপরাধী ও সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি’ নিয়ে শনিবার সচেতন নাগরিক সমাজের মহাসম্মেলন থেকে এই আহ্বান জানানো হয়। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজন করা হয় এ সম্মেলনের। সম্মেলনে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করতে নাগরিক সমাজের আন্দোলনকে বেগবান করতে শিগগিরই একটি জাতীয় কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে সম্মেলনে জানানো হয়। সম্মেলনে বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান, মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, ড. শাহদীন মালিক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আনোয়ার হোসেন, অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, মেজর জেনারেল (অব:) আমিন আহমেদ চৌধুরী, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএম আকাশ, সাংস্কৃতিক কর্মী মিতা হক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের, নারী নেত্রী খুশী কবির প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
সম্মেলনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, আমরা আজ একটি সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যদিও এ সংকট এখন থেকে তৈরি হয়নি। যদি দেশে আজ বিভক্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে তা এখন হয়নি। অনেক আগে থেকেই হয়েছে। যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল আজও তারা তাই-ই আছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ বিচারের রায় শুরু হওয়ার পর গৃহযুদ্ধের হুমকি দিয়ে মাঠে নেমেছে তারা। তারা হাঁটছে সে পথেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা যে নৃশংস গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়েছিল ৪২ বছর পরও তারা সহিংসতা অব্যাহত রেখেছে। তাদের সহিংসতার হাত থেকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও মুক্তি পাচ্ছেন না। তাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে। এসব সহিংসতায় বিএনপিকে পাশে পেয়ে আরো সাহস পাচ্ছে তারা। ১৯৭১ সালে তারা যে তাণ্ডব চালিয়েছে ২০১৩ সালেও এসে তারা তাণ্ডব চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা শাহবাগের আন্দোলনে ভিন্ন উদ্দেশ্য দেখতে পান তারা এখনও পাকিস্তানমুখী । তারা বিকৃত রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা ধারণ করে শাহবাগের আন্দোলনে দলীয় গন্ধ পান। তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুনলে মাথা হেঁট হয়ে যায়। তিনি যেভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষ নিয়েছেন তা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, সারা দেশে সংঘাতের রাজনীতি শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামপ্রদায়িক রাজনীতি। তারা আজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এ নিয়ে সারা দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ উত্কণ্ঠা বিরাজ করছে। এটি দূর করতে হলে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করা হলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কল্যাণকর হবে না। প্রচলিত যে আইন আছে তার সঠিক ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমস্যা আইন দিয়ে সমাধান করা যায় না। তবে এ ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ ছাড়া কোন উপায়ও নেই। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করার ফল ভালো হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। এমন সমাধান চাই না যা হবে অগণতান্ত্রিক। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা নিরসনের জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব ১৯৭১ সালের প্রতিচ্ছবি। সময় এসেছে জামায়াতকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার। তিনি বলেন, ৭১ সালে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শাস্তি না দিতে পারলে এটা আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কাজ হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আজ সভ্যতা, গণতন্ত্র ও শান্তিকামী মানুষের দাবি। সামপ্রতিক সময়ে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সার্বিক পর্যালোচনা করলে খুব সহজেই সন্ত্রাসবিরোধী আইন দিয়ে তাদের নিষিদ্ধ করা সম্ভব। আজ সকলের দাবি, জামায়াত-শিবির এ দেশের মাটি থেকে উত্খাত করতেই হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার কোন প্রতিহিংসার দাবি নয়, সভ্যতা ও গণতন্ত্রের দাবি। মুক্তিকামী জনতার দাবি। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে কোন দ্বিধা থাকা উচিত নয়।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, গত কয়েক মাসে জামায়াত-শিবির নিজেদের বর্ণবাদী, হত্যাকারী হিসাবে প্রমাণ করেছে। তাই এ ইস্যুতে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করতে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২০ ধারা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যক্রম পর্যালোচনা করে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ীও তাদের নিষিদ্ধ করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, শাহবাগের নতুন প্রজন্মের কারণেই আমাদের আজকের এই আয়োজন সম্ভব হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে জামায়াত-শিবির রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা আবারও ৭১ সালের পুরানো চেহারার পুনরাবৃত্তি করছে। জামায়াত-শিবির সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গভীর শেকড় গেড়েছে। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও তত্পরতা অব্যাহত রেখেছে।
কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, শাহবাগের আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম আবারও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরিয়ে দিয়েছে। দেশে নবজাগরণ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আমরা সবাই চুপচাপ ছিলাম ওরা আমাদের জাগিয়ে দিয়েছে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধ করতে দেশে যে আইন আছে, তার ব্যবহার করতে হবে। নইলে নতুন আইন করতে হবে। যতদিন জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ না হবে ততদিন আমাদের আন্দোলন চলবে।
ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলেন, জামায়াত-শিবির আমাদের অগ্রযাত্রার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার পরও সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ নির্যাতনের ওপর সরকার একটি প্রেস নোটও দেয়নি। তিনি বলেন, কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পর বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে জামায়াত-শিবির। বৌদ্ধদের ওপর তারা হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। তারা কান দেয়নি। উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ভুলে গেছে। সারা দেশে এভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হলো, সরকার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?
আমিন আহমেদ চৌধুরী বীর বিক্রম বলেন, বড় দুইটি দল জামায়াতকে দুধ কলা দিয়ে পুষছে। সেই সাপের ফণার সামনে দুই দলই দাঁড়িয়ে আছে। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া জামায়াতের পক্ষে যে স্ট্যান্ড নিয়েছে তা হবে আত্মঘাতী। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের জন্য যে মায়াকান্না করছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক, অপ্রত্যাশিত। ‘তার স্বামীর অধীনে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যুদ্ধ করেছি’- বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমি জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে। তিনি বলেন, এদেশের নানা স্তরে নানা সমস্যা। এ কারণে দেশের সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। যে কোন কাজে হয় টাকা লাগবে, নয় প্রয়োজন হবে তদ্বিরের। এ থেকে দেশের মানুষ মুক্ত হতে চায়। আমাদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। সমাজকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। মানুষের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে জামায়াত।
নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, দেশে যে সব স্থানে জামায়াত-শিবির তাণ্ডব চালিয়েছে, সেসব স্থানে নাগরিকদের একটি প্রতিনিধি দল পরিদর্শনে যাওয়া উচিত। সম্মেলনের শেষভাগে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেন সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারোয়ার আলী। ঘোষণাপত্রে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধী ও সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
সারোয়ার আলী বলেন, জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম সম্পর্কে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। ইতিমধ্যে সন্ত্রাস বোমাবাজি ভাংচুর এবং হুমকির মাধ্যমে দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মহাসম্মেলনের এ ব্যাপারে শ্বেতপত্র প্রকাশের জন্য জাতির কাছে প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।