শ্রীপুরে পিকনিক পার্টি-গ্রামবাসী
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত ২শ’
শ্রীপুর (গাজীপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৩, ২১:৫৩
গাজীপুরের শ্রীপুরে বনভোজনে আসা পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামবাসীর দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে শিশু-নারীসহ দুই শতাধিক লোক আহত হয়েছে। গুরুতর আহত ১১০ জনকে শ্রীপুর, গাজীপুর, টঙ্গী ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে পোশাক কারখানার শ্রমিক ও গ্রামবাসী ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নের সিংগারদীঘি গ্রামে সী-গাল পিকনিক স্পটে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় আশপাশের চার-পাঁচ গ্রামের লোকজন বনভোজনে আসা শ্রমিকবাহী ৯৫টি বাস ও ৯টি পিকআপ, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার ভাঙচুর করে। খবর পেয়ে দাঙ্গা পুলিশসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র্যাব ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুঘণ্টা চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে গ্রামবাসী সী-গাল পিকনিক স্পটে শ্রমিকদের রাত ১টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রাখে। রাত দেড়টার দিকে পুলিশ ও র্যাবের মধ্যস্থতায় শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সমঝোতার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
বনভোজনে আসা শ্রমিকরা জানায়, গ্রীন লাইফ গ্রুপের আশুলিয়ার টুঙ্গাবাড়ী, জামগড়া ও কাঠগড়া এলাকার পাঁচটি পোশাক কারখানার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ১১১টি বাস, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কারযোগে শুক্রবার সকালে শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নের সিংগারদীঘি গ্রামে বনভোজনে আসে। শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য সন্ধ্যার পর পিকনিক স্পটের ভিতর মঞ্চে নৃত্য চলার সময় গ্রামের ১০-১২ জন উচ্ছৃঙ্খল যুবক পিকনিক স্পটে প্রবেশ করে নৃত্য দেখার সময় মোবাইলে ছবি উঠাতে চেষ্টা করে। এ ঘটনা দেখে কয়েকজন শ্রমিক এগিয়ে এসে বহিরাগত যুবকদের বের করে দিতে চাইলে যুবকরা রফিকুল ইসলাম, আমিনুল হক, তোফাজ্জল হোসেন ও রতন মিয়াকে বেদম মারধর করে। ক্ষিপ্ত হয়ে শ্রমিকরা বহিরাগত যুবকদেরও বেদম মারধর করে পিকনিক স্পটের বাইরে বের করে দেন। গ্রামের যুবকদের মারধর করার খবর ছড়িয়ে পড়লে গ্রামের হাজার হাজার নারী-পুরুষ দা-লাঠি ও বল্লম নিয়ে পিকনিক স্পটের ভিতরে ঢুকে শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। শ্রমিকরাও পাল্টা হামলা চালালে পরিস্থিতি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় আতঙ্কে কয়েকশ শিশু ও নারী শ্রমিক পিকনিক স্পটের সীমানা প্রাচীর টপকে বাইরে চলে যায়।
সংঘর্ষে উভয়পক্ষের শিশু-নারীসহ অন্তত দুই শতাধিক আহত হয়েছে। গুরুতর আহত ১১০ জনকে মাওনা চৌরাস্তা, গাজীপুর, টঙ্গী, শ্রীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন ক্লিনিক-হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে সিংগারদীঘি গ্রামের যুবক কাওসার, আবুল হোসেন, কুদ্দুস ও শ্রমিকদের মধ্যে গ্রীন লাইফ গ্রুপের সিইও পাকিস্তানি নাগরিক জালাল শাকিবসহ ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সংঘর্ষ চলাকালে গ্রামের লোকজন পিকনিক স্পটের সামনে পিকনিকের ১০৪টি যানবাহন ভাঙচুর করে।
গ্রীন লাইফ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু ফয়সাল মোসাব্বের সায়মন ইত্তেফাককে জানান, শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য মঞ্চে নৃত্য চলার সময় বহিরাগত ১০-১২ জন যুবক জোর করে পিকনিক স্পটের ভিতরে চার শ্রমিককে বেদম মারধর করে। পরে শ্রমিকরা যুবকদের বাইরে বের করে দিলে গ্রামের লোকজন একযোগে শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। আবু ফয়সাল মোসাব্বের সায়মন অভিযোগ করেন, সংঘর্ষ চলাকালে আতঙ্কে কারখানার কয়েকশ নারী শ্রমিক পিকনিট স্পটের সীমানা প্রাচীর টপকে বাইরে চলে যায়। সে সময় ২০ যুবতী শ্রমিককে গ্রামের উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় ইউপি সদস্য আমিনুল ইসলাম জানান, সিংগারদীঘি গ্রামের ১০-১২ যুবক নৃত্য দেখতে ভিতরে ঢুকলে শ্রমিকরা মারধর করে বাইরে বের করে দেয়। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে গ্রামবাসী। পরে পাশের আক্তাপাড়া, চকপাড়া, সিংদীঘি ও কপাটিয়াপাড়া গ্রামের হাজার হাজার নারী-পুরুষ একযোগে শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। সংঘর্ষের খবর পেয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র্যাব ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুঘণ্টা চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও পিকনিক স্পটে শ্রমিকদের অবরুদ্ধ করে রাখে গ্রামবাসী। রাত দেড়টার দিকে পুলিশ ও র্যাবের মধ্যস্থতায় আহত গ্রামবাসীদের ২ লাখ টাকা চিকিত্সা ব্যয় পরিশোধের পর গ্রামবাসী অবরোধ তুলে নেয়।
সী-গাল পিকনিক স্পটের ব্যবস্থাপক আহসান কবির তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রায়শ বহিরাগত উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা বনভোজনে আসা লোকদের লাঞ্ছিত করে। বিশেষ করে মেয়েদের। যুবকদের পক্ষ নিয়ে এবার চার-পাঁচ গ্রামের নারী-পুরুষও হামলা চালিয়েছে। পিকনিক স্পটেও ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। শ্রীপুর থানার ওসি (তদন্ত) মহসিন-উল কাদির ইত্তেফাককে জানান, সংঘর্ষ থামলেও হাজার হাজার গ্রামবাসী পিকনিক স্পট ঘিরে রেখেছিল। পুলিশের মধ্যস্থতায় গ্রামের মাতব্বরদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠক হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এদিকে গতকাল শনিবার সকালে পৌরসভাধীন গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী সংলগ্ন বাঘের বাজার এলাকায় ময়মনসিংহগামী বিএম স্কুল এন্ড কলেজ ও কবি নজরুল একাডেমীর শিক্ষার্থীদের ওপর বাঘের বাজারের লোকজন হামলা চালিয়ে কয়েকটি বাসের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। বাসের ভিতরে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের ৩০ জন জখম হয়। গ্রামবাসী জানায়, পিকনিক পার্টির গাড়ি যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা পথচারী কয়েকজন মহিলার ওপর পানি মারলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিএম স্কুল এন্ড কলেজের চেয়ারম্যান গুরুতর আহত হন।