এই সরকারের সঙ্গে কোন আলোচনা নয় :খালেদা

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলে-ছেন, এই সরকারের সাথে কোনো আলোচনা নয়। এখন এক দফার সরকার পতনের আন্দোলন হবে। হয় সরকারের বিদায় না হয় হরতাল ঘেরাও অবরোধ। এই সরকার একটি বিধর্মী সরকার। এরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না। এদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়। এরা মন্দিরে, মসজিদে, গির্জা প্যাগোডায় হামলা করে। এরা ক্ষমতায় থাকলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে চারিগ্রাম এসএ খান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ এবং গোবিন্দল ফুটবল মাঠের পৃথক দু’টি বিশাল জনসভায় তিনি একথা বলেন। গোবিন্দল এবং জৈল্লা গ্রামে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন নিহত ও অর্ধ-শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনার পর বেগম জিয়া এই এলাকায় আসলেন। বেগম জিয়াকে এক নজর দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। গোবিন্দল ফুটবল মাঠে এক জনসভায় পদ্মা সেতু করতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সরকার যে চুক্তি করতে চাচ্ছে তাকে ভাওতাবাজি হিসাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সরকার পদ্মা সেতু করতে পারবে না। আমরা পদ্মায় দু’টি সেতু করবো। খালেদা জিয়া বলেন, আজকে কোনো সভা করতে আসিনি। পুলিশের গুলিতে নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে এসেছি। আমরা শুনেছি তাদের কি নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই সরকার খুনি ও রক্ত পিপাষু, তাই এরা যতদিন ক্ষমতায় থাকতে ততদিন মায়ের বুক খালি হবে। বোনেরা স্বামী হারা হবে। ছেলে-মেয়েরা পিতৃহারা হবে। তাই আমাদের এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। আন্দোলন করতে হবে। খালেদা জিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, খুনি সরকারের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ হবে না। এই সরকারের পতন ছাড়া কোনো সমস্যার সমাধান নেই। এজন্য আন্দোলন করতে হবে। হয়তো এজন্য আরো কিছু প্রাণহানী হবে, জানমালের ক্ষতি হবে। কিন্তু দেশের স্বার্থে মানুষের স্বার্থে এই টুকু ক্ষতি মেনে নিতে হবে। খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এখানে গণহত্যা হয়েছে তার বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল করে তাকে সেখানে হাজির করা হবে। খালেদা জিয়া বলেন, আল্লাহর হুকুম ছাড়া যেমন গাছের পাতাও নড়ে না, তেমনি প্রশাসনের কোনো কাজ প্রধানমন্ত্রীর হুকুম ছাড়া হয় না। সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, গুলি বন্ধ করুন নয়তো এর প্রতিদান পেতে হবে। জনগণ বসে বসে মার খাবে, গুলি খাবে, আর মসনদে বসে আপনারা উপভোগ করবেন- তা হবে না। খালেদা জিয়া বলেন, নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের নেতা সেখানকার গডফাদার ত্বকীকে হত্যা করেছে। ত্বকীর বাবা মেয়র নির্বাচনের সময় আইভির জন্য কাজ করেছেন, এজন্যই ত্বকীকে হত্যাক করা হয়েছে। এখনো কেন শামীম ওসমান বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়নি। খালেদা জিয়া বলেন, সরকার তাদের অপকর্ম-দুর্নীতি ঢাকার জন্য পুলিশ পাহারায় ছাত্র যুবকের নাম দিয়ে শাহবাগে মঞ্চ পেতেছে। এখানে যে ছাত্র যুবকদের কথা বলা হচ্ছে তারা যুবকদের অংশ নয়, সরকারের অংশ, এরা দেশের ক্ষতি করছে। খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের কোম্পানি ভারত থেকে কম দামে না হয় বিনামূল্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ভিটামিন ক্যাপসুল এনেছে যা খেয়ে অনেক শিশু অসুস্থ হয়েছে, অনেকে মারা গেছে। এই হলো সরকারের কাজ। তারা গুলি করে মানুষ মারছে আবার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খাইয়ে মানুষ মারছে। এখানে সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিঙ্গাইর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মোহাম্মদ মুজাহারুল হক মোহর। বক্তব্য রাখেন হারুন অর রশীদ খান মুন্নু, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, খেলাফত মজলিসের চেয়ারম্যান মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, সিঙ্গাইর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঈনুল ইসলাম শান্ত, নির্বাহী কমিটির সদস্য আফরোজা খান রিতা। উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সেলিমা রহমান, সাদেক হোসেন খোকা, খায়রুল কবির খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শিরিন সুলতানা, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, মানিগঞ্জ জেলা নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক সাইফুল হুদা চৌধুরী শাতিল প্রমুখ। চারিগ্রাম এসএ খান হাইস্কুল মাঠের জনসভায় খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার একটি খুনি সরকার, জালেম সরকার, মিথ্যাবাদী, প্রতিনিয়ত গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। এই সরকার দেশের টাকা লুট করে বিদেশে পাঠিয়েছে। ডেসটিনির টাকা লুট করেছে। পদ্মা সেতু হওয়ার আগেই টাকা ভাগাভাগি করেছে। তাই বিদেশিরা দুর্নীতিবাজ সরকারকে বিশ্বাস না করে টাকা বন্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয় জনগণের কাছে তিনি প্রশ্ন করেন, শামসুল ইসলাম খান জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তারপর শান্ত এমপি হওয়ার পর কাজ করেছে। এখন আর কোনো কাজ হয় না। কি, কাজ হয়? সবাই জবাব দেয় ‘না!’ তিনি বলেন, তারা বলে সব যুবক নাকি শাহবাগে হাজির হয়েছে। এই যে যুবক এরা কারা? আপনারা কি শাহবাগে গেছেন? এ সময় সবাই সমস্বরে জবাব দেয় না। তখন খালেদা জিয়া বলেন, ওখানে হচ্ছে আওয়ামী গোষ্ঠীর কতগুলো ছেলেপেলে। খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিবারে দুর্নীতি নিয়ে খবরের কাগজে ব্যাপকভাবে লেখালেখি হয়েছে। চারিদিকে দুর্নীতি লুটপাটের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের মানুষ ক্ষিপ্ত। এসব ইস্যু চাপা দিতে সরকার শাহবাগের ঘটনা শুরু করেছে। সেখানে মঞ্চ পেতেছে। ফাঁসি ফাঁসি শুরু করেছে। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরাও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চাই। কিন্তু এই সরকার শুধু বিএনপি আর জামায়াতে ইসলামীকে ধরে। বিএনপি জামায়াত ছাড়া যুদ্ধাপরাধী দেখে না। নিজের দলের মধ্যে অনেক রাজাকার আছে। খালেদা জিয়া বলেন, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে শুক্রবারে মানুষ নামাজ পড়তে যায়। সেখানে পুলিশ তালা ঝুলিয়ে রেখেছে। এখন সেখানে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে পারে না। শাহবাগী নাস্তিকরা রাস্তায় নাচানাচি করে। তাদের পাহারা দেয় সরকার। এরপর হিন্দুদের মন্দিরে হামলা করলো। ভাঙচুর শুরু করলো। বিশ্বজিতকে আওয়ামী লীগের লোকেরা হত্যা করেছে। তাদের ধরা হয় নাই। হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বিশ্বজিতকে চিকিত্সা দেয়া হয়নি। তার খুনিদের বিচার হয়নি। আওয়ামী লীগের লোক খুন করলে মাফ পেয়ে যায়। আর বিএনপির লোক কিছু না করলেও মামলা দেয়া হয়। তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীকে গুম করেছে এই সরকার। তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। চৌধুরী আলম, ইব্রাহিম মৃধাকে তারা হত্যা করেছে। এই সরকার মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মারছে। কাজেই আমরা এভাবে মানুষকে মরতে দিতে পারি না। খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার নির্বাচনের আগে অনেক ওয়াদা দিয়েছিল। দশ টাকায় চাল খাওয়াবে, ঘরে ঘরে চাকরি দেবে। কোনো কিছুই করেনি। তারা মানুষ মারতে ওস্তাদ। ৭২-৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী দিয়ে ৪০ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল। এবার গত কয়েকদিনে পুলিশ বাহিনী দিয়ে ১৭০ জন মানুষ মেরেছে। সেজন্য তাদের বিচার হবে। খালেদা জিয়া বলেন, তারা ৫৮ জন চৌকস অফিসারকে হত্যা করেছে। তার বিচার করেনি। গণহত্যা করেছে। এসব হত্যার বিচার হবে। এই সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। বিদেশিরাও আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতায় এরা টিকে আছে। আমি তাদের বলবো জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকলে তারা এই খুনিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না। এই সরকার দেশকে বিক্রি করে দিতে চায়। তিনি বলেন, আগামী ১৮-১৯ মার্চ দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ঠিক আছে? আরো দেব হরতাল। হরতাল ঘেরাও অবরোধ যা প্রয়োজন হবে সব দেয়া হবে। এই সরকারের বিদায় করা হবে। উল্লেখ্য, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে গোবিন্দল গ্রামে হরতাল সমর্থক, পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়। এর মধ্যে একজন নারীও ছিলেন। সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তিনি। সেদিনের নিহত মাওলানা নাসির উদ্দিনের বাড়িতে যান। তার মা ফাতেমা বেগম এ সময় খালেদা জিয়াকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদেন। তিনি তাকে সান্ত্বনা দেন। এরপর স্থানীয় মাদ্রাসা ছাত্র শাহ আলমের মা শহরবানু ও চাচা আবুল কাশেমকে সান্ত্বনা দেন খালেদা জিয়া। সিঙ্গাইর পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক নাজিম উদ্দিনের বাবা মজনু মিয়াকেও সান্ত্বনা দেন বেগম জিয়া। কৃষক আলমগীরের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রাফেজা বেগম, দেড় বছরের মেয়ে আঁখি ও বাবা রাজ্জাক মিয়ার সঙ্গে কথা বলেন খালেদা জিয়া। তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে তিন লাখ করে টাকা অনুদান দেন তিনি। এছাড়া আহতদের আর্থিক সহায়তা দেন।