চলে গেলেন শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম

বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান ভৌতবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম আর নেই। চট্টগ্রামের অভিভাবক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় এ ব্যক্তিত্ব শুক্রবার রাত ১২টায় নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে ....... রাজেউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে হূদরোগ ও বহুমূত্র রোগে ভুগছিলেন। গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রতিষ্ঠিত গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্রে মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে তার মরদেহ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার অসংখ্য মানুষ মরহুমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। আজ রবিবার আসর নামাজের পর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় নামাজে জানাজাশেষে মরহুম জামাল নজরুল ইসলামকে গরীবুল্লাহ শাহ (রা.) মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হবে। তার মৃত্যুর পর চট্টগ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নগরীর সার্সন রোডে মরহুমের বাসায় ছুটে যান। প্রফেসর জামাল দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। গণিত ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন মনোরম পরিবেশে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে গত ৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। আমৃত্যু প্রগতিশীল সামাজিক ও নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তার বড় মেয়ে সাদাফ পেশাগত জীবনে মাইক্রো বায়োলজিস্ট ও ঢাকায় কর্মরত। ছোট মেয়ে নার্গিস সাইকোলজিস্ট ও লন্ডনে কর্মরত। ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। জন্মের এক বছর পর তার বাবা কলকাতায় বদলি হন। জামাল নজরুল প্রথমে ভর্তি হন কলকাতার মডেল স্কুলে। পরে ভর্তি হন শিশু বিদ্যাপীঠে। বাবার বদলির সুবাদে এরপর তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। নবম শ্রেণিতে উঠার পর পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে ভর্তি হন লরেন্স কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি সিনিয়র কেমব্রিজ ও হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করেন। লরেন্স কলেজের পাঠ শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়তে যান এবং সেখান থেকে বিএসসি অনার্স করেন। ১৯৫৭ সালে কেমব্রিজে পড়তে যান। কেমব্রিজের প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি (১৯৫৯) অর্জন করেন। সেখান থেকেই মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে ডিএসসি বা (ডক্টর অফ সায়েন্স) অর্জন করেন। ড. জামাল নজরুল গণিত এবং পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। বেশকিছু গাণিতিক সূত্র ও জটিল গাণিতিক তত্ত্বের সহজ পন্থা উদ্ভাবন, মহাকাশের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মহলেও তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তার লেখা বই অক্সফোর্ড, কেমব্রিজসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞানী ও প্রফেসর ইমেরিটাস ড. জামাল নজরুল ইসলামের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এক শোকবার্তায় বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রফেসর জামাল নজরুলের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, তার ইন্তেকাল জাতির জন্য বিরাট ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। তার মৃত্যুতে সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ আল নোমান, নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক কাজী ইনামুল হক দান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আনোয়ারুল আজিম আরিফসহ চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক প্রকাশ করেন। জাতীয় পার্টি-জেপি’র মহাসচিব ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। জেপি মহাসচিব বলেন, তিনি ছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞানী এবং বরেণ্য শিক্ষাবিদ। তার মৃত্যুতে দেশে বিজ্ঞান ও শিক্ষাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তিনি মরহুমের রূহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, তার মৃত্যুতে কেবল বিজ্ঞান জগত্ নয়, মননশীল চিন্তার জগতেও অপূরণীয় ক্ষতি হল। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। কর্মজীবন ড. জামাল নজরুল যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, লন্ডনের কিংস কলেজ, ইউনিভার্সিটি কলেজ, কার্ডিফ (বর্তমানে কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়), সিটি ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজসহ বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে ‘দি আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স (১৯৮৩) সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর তা বিজ্ঞানী মহলে সাড়া ফেলে। তার রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি গ্রন্থটি ১৯৮৫ সালে কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত হয়। এখান থেকে প্রকাশিত হয় ‘স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ’, যা পরে স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়। তার অন্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি (১৯৯২), বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত কৃষ্ণ বিবর এবং রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা’ এবং অন্যান্য প্রবন্ধ, শিল্প সাহিত্য ও সমাজ। এছাড়া ডব্লিউ বি বনোর সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ‘ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি’ (১৯৮৪)। একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০১ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক লাভ করেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ১৯৮৫ সালে তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেডেল পান। ১৯৯৮ সালে ইতালির আবদুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমী অফ সায়েন্স অনুষ্ঠানে তাকে মেডাল লেকচার পদক দেয়া হয়।