ভেনিজুয়েলায়ও ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ পুতিন!

শিফারুল শেখ

 

গত মঙ্গলবার রাজপথে নেমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হন ভেনিজুয়েলার স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুয়াইদো। সেনাবাহিনীর উদ্দেশে তিনি মাদুরোর প্রতি আনুগত্য ত্যাগের ডাক দিলেও হাতে গোনা কয়েকজন সৈন্য ছাড়া কেউ সেই আহ্বানে সাড়া দেননি। বুধবার মে দিবসে দেশের ইতিহাসে মাদুরোবিরোধী সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ করতে চেয়েছিলেন গুয়াইদো। বাস্তবে দুপুরের মধ্যেই বেশিরভাগ বিক্ষোভকারী ঘরে ফিরে যান। বিদ্রোহী সৈন্যরা গৃহবন্দি বিরোধী নেতা লোপেজকে মুক্ত করেছে বলে দাবি করা হয়। তিনি বিক্ষোভের সময়ে গুয়াইদোর পাশেই ছিলেন। পরে সপরিবারে তিনি চিলির দূতাবাসে আশ্রয় নেন। এমন প্রেক্ষাপটে প্রবল চাপ সত্ত্বেও মাদুরো ক্ষমতায় টিকে আছেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর এখনো তার কর্তৃত্ব বহাল। সেনাবাহিনীর মধ্যেও কোনো বিদ্রোহের লক্ষণ দেখা যায়নি। কিন্তু কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা এই প্রতিবেদনে।

 

ভেনিজুয়েলায়ও ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ পুতিন

আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র তথা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপছন্দের নেতাকে সমর্থন দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ভেনিজুয়েলায়ও। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সমাজে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। গুয়াইদোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগসহ ৫০টি দেশ এবং রাশিয়া, কিউবা, বলিভিয়া, তুরস্ক ও চীন মাদুরোকেই বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। মাদুরোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট  ট্রাম্প সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সিএনএনকে জানান, গত মঙ্গলবার গণবিক্ষোভের মুখে মাদুরো কিউবায় চলে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তার সমর্থক দেশ রাশিয়ার হস্তক্ষেপে তিনি মত বদল করে ক্ষমতায় থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। মাদুরো প্রশাসন অবশ্য এমন দাবি উড়িয়ে দিয়েছে। পম্পেও ভেনিজুয়েলায় প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনই কোনো প্রস্তুতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। আর প্রেসিডেন্ট পুতিন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ পম্পেওকে সতর্ক করে বলেন, ভেনিজুয়েলায় ওয়াশিংটন আরো আগ্রাসী পদক্ষেপ নিলে পরিণতি ভালো হবে না। এমনকি গত ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপের দিন বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। তিনি আশা করেন, ভেনিজুয়েলায় কোনো বিদেশি শক্তি প্রবেশ করবে না।

 

কী স্বার্থ রাশিয়ার

ভেনিজুয়েলায় আমেরিকা সামরিক হস্তক্ষেপ করলে ওয়াশিংটন ও মস্কোর স্বার্থ নিয়ে ব্যাপক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সের্গেই ল্যাভরভ। মাদুরোকে রক্ষায় রুশ নির্মিত সামরিক হেলিকপ্টার চালাতে ভেনিজুয়েলার পাইলটদের সহায়তা করতে দেশটিতে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধন করেছে রাশিয়া। কারণ ভেনিজুয়েলায় রাশিয়ার সামরিকসহ বিভিন্ন খাতে আর্থিক লেনদেন রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। তেল মজুদের ক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলা শীর্ষে। তবে তেল বিক্রি করে নগদ অর্থের বেশিরভাগ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু এখন সেটি মাদুরো নয়, স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট গুয়াইদো পান। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি রোজেনফট ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ এবং তেল প্রকল্পে ২০১০ সাল থেকে ৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। কার্নেগী মস্কো সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে এই পর্যন্ত কারাকাসকে রাশিয়া ১৭০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। পিডিভিএসএ’নর কাছে রোজেনফট’র পাওনা ১০০ কোটি ডলারের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত গুয়াইদো ক্ষমতায় আসলে এসব অর্থ ফেরত পাওয়া রাশিয়ার জন্য কঠিন হবে। সামরিক ক্ষেত্রেও রাশিয়ার বিনিয়োগ তথা রাশিয়া থেকে অনেক সামরিক অস্ত্র ক্রয় করে কারাকাস। ২০০৬ সালে তত্কালীন নেতা হুগো শ্যাভেজের সরকার রাশিয়ার কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কিনতে ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি করেছিল। মস্কো ভেনিজুয়েলার তেল সর্বনিম্ন মূল্যে ক্রয় করে। রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, কারাকাস ২০০৫ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ১১০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে মস্কো থেকে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৩০০, সু-৩০ যুদ্ধবিমান, টি-৭২ ট্যাংকও রয়েছে। এসব সরঞ্জামের জন্য কারাকাসের কাছে রাশিয়া এখন কী পরিমাণ অর্থ পাবে তা জানা যায়নি। ভেনিজুয়েলার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রুশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। এছাড়া রাশিয়ার শস্য আমদানির ক্ষেত্রে ভেনিজুয়েলা অন্যতম প্রধান দেশ। ওয়াশিংটন ভিত্তিক জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের গবেষক সের্গেই সুখানকিন বলেন, রাশিয়ার বেসরকারি মালিকানাধীন সামরিক কোম্পানি পিএমসি ভেনিজুয়েলায় সংঘাত বিস্তাররোধে কাজ করছে। ফিনিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনালের গবেষক মিকেইল উইগেলের মতে, কেবল এগুলো নয়, মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্মানেও আঘাত লাগবে। বিশ্ব দেখবে তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে গেছে যা কিউবাসহ আরো অনেক দেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মাদুরো থাকায় রাশিয়ার যেমন স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তেমনি গুয়াইদো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বাড়বে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং  রাশিয়া সমঝোতায় পৌঁছালে মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতি ঘটতে পারে।