বিশ্বজয়ীদের মায়ের কথা
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৩, ১৯:১৭
ড. ইয়াসমীন ইসলাম
আকীব ফারহান হোসেইনের মা
কর্মজীবনে অনেক ব্যস্ত তিনি। কিন্তু ছেলের জন্য সময় রেব করে নেন ঠিকই। তিনি পড়াশুনা করেছেন ভিকারুন্নেসা স্কুলে। সেই সময়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে তারা কয়েকজন বান্ধবী মিলে ভিকারুন্নেসা স্কুলে ডিবেটিং ক্লাব চালু করেন। সেই শুরু। এরপর কলেজ পর্যায়ে বিতর্ক করেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম এক বছর বিতর্ক করতে পেরেছিলেন। বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর পড়াশুনার এবং সংসারের প্রয়োজনে আর বিতর্কের সাথে সেভাবে থাকা হয়নি। নিজের সন্তানের মধ্যে বিতর্কের সেই বীজটি বপন করেছিলেন তিনি নিজেই। আকীব যখন খুবই ছোট, সবেমাত্র স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে সেই সময় তিনি আকিবের হাত ধরে এক বিতর্ক প্রতিযোগিতা দেখার জন্য নিয়ে গেলেন। এভাবেই সন্তানকে বিতর্কের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মা ইয়াসমীন ইসলাম। সেই ছোট্ট আকীব আজ বিশ্ব বিতর্ক অঙ্গনে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে তুলে ধরেছেন। এই নিয়ে অনুভূতির কথা জানতে চাইলে অত্যন্ত উচ্ছ্বাস এবং কিছুটা গর্বের সাথেই তিনি বলেন, ‘আমি একদম আত্মহারা। আমার ছেলে এইবার দিয়ে তৃতীয়বারের মতো এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলো। আমি যাওয়ার সময় ওকে বলেছিলাম, তোমরা দেশের প্রতিনিধি। দেশ এবং দেশের পতাকা উঁচু করে তুলে ধরবে বিশ্ববাসীর কাছে। ও পেরেছে। আমার কথা বিফলে যায়নি।’ আর আকীব সম্পর্কে তিনি বলেন, ও ছোটবেলা থেকেই অনেক শান্তশিষ্ট এবং পড়াশুনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িত ছিল। আর আকীব জানায়, ‘মা আমাকে পড়াশুনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে উত্সাহ দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় তিনি কী ধরনের কাজ করা যায় সেই বিষয়েও পরামর্শ দিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন।’
২০১২ সালের ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে জার্মানীর বার্লিনে শুরু হওয়া এই বিতর্ক প্রতিযোগিতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারি মাসের তিন তারিখে। সেমিফাইনালে জেতার পর মা ইয়াসমীন ইসলাম আকীবের সাথে আর কোনো যোগাযোগ করছিলেন না। কারণ তার মনে ধারণা ছিল, ‘আমার কোনো কথায় যদি ওর মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে!’ ফেসবুকে আকীবের খোঁজ নিচ্ছিলেন। ফাইনালের রাতটি তার কাটে বিনিদ্রায়। এরপর যখন শুনতে পেয়েছেন তার সন্তান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তখন নিজেকে মনে করেছেন পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ হিসেবে। আকিব জানায়, এই প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। তার জন্য করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। মায়ের সাহায্য এবং অনুপ্রেরণা ছাড়া এর কোনো কিছুই সম্ভব হতো না। কারণ আমি যখন থেকে স্কুলে যেতে শুরু করি তখন থেকেই তিনি আমাকে উত্সাহ দিয়ে এসেছেন। আকিব জানায়, আমি কোথাও বিতর্ক করতে গেলে সাথে করে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে যাই। এই পতাকাকে সব সময় উঁচিয়ে ধরার চেষ্টা করি। এবার পেরেছি।
দেশে এবং দেশের বাইরে বিতর্ক নিয়ে অনেক ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে আকীবকে। সামনে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপিনস্সহ বেশ কয়েকটি দেশের জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ পেয়েছেন ইতোমধ্যে। বাংলাদেশের বিতর্ক অঙ্গনকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে চান ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ।
রুখসানা আলী
রাতিব মোর্তূজা আলীর মা
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ডিবেট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের হয়ে বিতর্ক করেছেন তিনিও। নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে আকীবের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের জন্য বয়ে এনেছেন সুনাম। রাতিব তার প্রথম সন্তান। তাই তার কোনো শখে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি তিনি। রাতিব যখন মাকে এসে বিতর্ক করার প্রতি তার আগ্রহের কথা জানায় তখন তিনি সাহোত্সাহে বিতর্কে যোগ দিতে বলেছেন। আর এই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর রাতিবের মায়ের অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যখন শুনি ওরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আমি কেঁদে ফেলি। প্রতিযোগিতা বার্লিনে হওয়ায় আমাদের এখানে গভীর রাত ছিল সেই সময়। রাতে ইন্টারনেটে ওদের খোঁজ নিচ্ছিলাম। পরে ও আমাকে ফোন করে চিত্কার করে বলে ওঠে ওরা জিতেছে। আমার সেই আনন্দের কথা মুখে প্রকাশ করার মতো নয়।’ এরপর সন্তানের এই বিজয়ের খুশিতে বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘রাতিব যখন জার্মানী থেকে বাড়িতে ফেরে তখন বাড়ির সিঁড়িতে একটি লাল শাড়ি বিছিয়ে রেখেছিলাম ওকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য।’ পড়াশুনার প্রতি ছোটবেলা থেকেই মনোযোগী হওয়ার কারণে মাকে চিন্তা করতে হয়নি। কখনো বাধাও দেননি তার বিতর্কে অংশগ্রহণে। তিনি জানান, এমনও হয়েছে ওকে তিনদিন বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে। কিন্তু যেহেতু বিতর্ক ওর প্যাশন তাই বাধা দেইনি। কোনো প্রতিযোগিতায় হেরে গেলে মন খারাপ করতো। তখন আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়েছি। মন খারাপ না করে সামনের প্রতিযোগিতায় আরো ভাল করার জন্য চিন্তা করতে বলেছি। রাতিব জানায়, আমার মায়ের সাহায্য ছাড়া আমি কোনোভাবেই এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না। রাতিব নিজে ইংরেজি ভাষায় বিতর্ক করে। আমাদের দেশে ইংরেজি বিতর্কের প্রতি একটা ভীতি কাজ করে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এখনো। এই ভয়কে দূর করার জন্য কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে রাতিব। এছাড়া বাংলা ভাষার বিতর্ক নিয়েও কাজ করার ইচ্ছার কথা জানায় সে। বিতর্কের মাধ্যমে যেহেতু মেধা এবং মননের বিকাশ সাধিত হয়, তাই সে সকল শিক্ষার্থীকেই বিতর্কে যোগ দিয়ে দেশে যুক্তিনির্ভর একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার গুরুত্বের কথা বিশেষভাবে জানায়।