স ং ঘা ত পূ র্ণ পা কি স্তা ন
সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৩, ২০:২০
পাকিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথম কোন নির্বাচিত সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করল। সন্ত্রাসকবলিত দেশটির প্রায় ৬৬ বছরের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। শনিবার দেশের প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ বলেন, পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। শনিবার ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) সরকার পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছে। তালেবানের অব্যাহত সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যদিয়েও পুরো মেয়াদ পার করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে পিপিপি সরকার। শনিবার মধ্যরাতেই পাকিস্তানের নির্বাচিত পার্লামেন্ট বিলুপ্ত হয়েছে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রশাসন পরিচালিত হবে। পার্লামেন্ট বিলুপ্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা আছে। এই নির্বাচনে পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল নির্বাচন বলেই মনে করছেন অনেকে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানে নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের সময় সেখানে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না যে সরকার কিংবা সামরিক বাহিনী নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে সমর্থ। এদিকে পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সংকট দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ব্যাপক হানাহানি ও সন্ত্রাসের মধ্যে পাকিস্তানে শুরু হতে যাচ্ছে সবচেয়ে জটিল নির্বাচন।
পেশোয়ার, লাহোর, কোয়েটা, করাচিসহ বড় বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ২০ জন মানুষ খুন হচ্ছে। সারাদেশে সন্ত্রাসের থাবা বিস্তার লাভ করেছে। কোন কোনদিন আত্মঘাতী কিংবা গাড়ি বোমা হামলায় মৃতের সংখ্যা একশ’ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত ৯ মার্চ লাহোরে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা হয়। তাদের বাড়িঘরে লুটপাট চালায় দুর্বৃত্তরা। ১০ জানুয়ারি কোয়েটায় হামলায় ১১৫ জন শিয়া নিহত হন। পরের মাসের ১৫ তারিখে একই ধরনের গণহত্যার শিকার হন ৮৪ জন, আহত হন ২০০ জন। সে সময় ক্ষুব্ধ শোকাহত শিয়ারা প্রতিবাদস্বরূপ নিহত স্বজনদের দাফন করতে অস্বীকৃতি জানান। অনেকে পাকিস্তান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। অনেক হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, আহমদিয়া মুসলিম ও শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ জাতিগত অসহিষ্ণুতার কারণে পাকিস্তান ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ৩ মার্চ করাচির শিয়া অধ্যুষিত একটি এলাকায় ৫০ জন নিহত এবং ১০০ জন আহত হন। শিয়া মতাবলম্বী নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এবং চিকিত্সকরাও খুন হন। গত বছর কট্টর সুন্নিদের হামলায় ৪শ’র বেশি শিয়া নিহত হয়। ২০১৩ সালের প্রথম দু’মাসে ২শ’র বেশি শিয়া মুসলিম নিহত হয়েছে। শিয়াদের ওপর এসব হামলা চালিয়েছে লস্কর-ই-জাংভি। তাদেরকে ইতিমধ্যে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সংগঠনটির সাবেক প্রধান মালিক ইসহাককে গৃহবন্দি করা ছাড়া সরকার তেমন কিছুই করতে পারেনি। এর আগেও তিনি কয়েকবার বন্দি হন। কিন্তু পরে আবার মুক্তি পেয়ে যান। মনে হচ্ছে যেন পাকিস্তানে জঙ্গিরা সরকার কিংবা সামরিক বাহিনীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এবারের নির্বাচন হবে সবচেয়ে জটিল। পাকিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথম একটি নির্বাচিত সরকার আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে যাচ্ছে। পাকিস্তানের গণতন্ত্রের এটি সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কোন রাজনৈতিক দলই চরমপন্থিদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয়।
করাচিতে হানাহানি লেগেই আছে। শিয়াদের ওপর হামলার পাশাপাশি আছে জাতি ও গোষ্ঠীগত সংঘাত, মাফিয়াদের পারস্পরিক সংঘাত, ভূমি দখল নিয়ে সংঘাত। প্রায় প্রত্যেকদিনই নগরীর কোন না কোন অংশ বন্দুকযুদ্ধ, হত্যা অথবা বিক্ষোভের কারণে অচল হয়ে পড়ে। গত ১৩ মার্চ ত্রাণকর্মী ও স্যানিটেশন বিশেষজ্ঞ পারভিন রেহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানের হিউম্যান রাইটস কমিশনের হিসাবে ২০১২ সালে করাচিতে সন্ত্রাসের বলি হয় ২ হাজার ২৮০ জন। সারাদেশে সাংবাদিকরা সন্ত্রাসীদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। মার্চের শুরুর দিকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে ২ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে বেসামরিক নাগরিক এবং সেনা চৌকি গুলোতে তালেবান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জঙ্গিরা পুলিশ স্টেশনগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি উত্তর পশ্চিমের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ৪টি স্কুলে জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। বেলুচিস্থানে প্রতিদিন বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলনের কারণে প্রাণহানি ঘটছে। এসব এলাকা যেখানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব খারাপ সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সেনাবাহিনী পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে সব কেন্দ্রে তারা লোক দিতে পারবেন না। অনেক এলাকায় পুলিশ দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেছে। এবার পাকিস্তানে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা খুবই কম হবে এবং আত্মঘাতী বোমা হামলার ভয়ে বড় ধরণের সমাবেশ করা সহজ হবে না।
হিউম্যা রাইটম কমিশন অব পাকিস্তা প্রধান আইএ রেহমান জানান, ন্যাশনাল এসেম্বেলির প্রায় অর্ধেক আসনে ভোটারদের মাঝে আতংক বিরাজ করবে। অনেকে ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবে না। অনেক জায়গায় প্রার্থীরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবে। অনেক জায়গায় প্রার্থীরা জঙ্গিদের সমর্থন লাভের চেষ্টা করবে জীবন বাঁচাতে। সংবিধান অনুযায়ী সরকারকে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী মনোয়ন দিতে হবে নির্বাচন পরিচালনার জন্য। কিন্তু এ ধরনের একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে দুর্বল। তারা জঙ্গিদের সামাল দিতে হিমশিম খাবে। জনমনে প্রশ্ন কেন সেনাবাহিনী আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। এদিকে সেনা প্রধান জেনারেল পারভেজ কায়ানি বলেছেন, বেসামরিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে পিপিপি সরকারের অধীনে আরো দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকার অনুরোধ করলেই কেবল সেনাবহিনী মাঠে নামবে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নিয়ে পিপিপি আসলে জঙ্গিবাদের বিস্তারে সহযোগিতা করেছে। প্রতিটি চরমপন্থি ইসলামী গ্রুপের পাল্টাবে অবস্থান আছে। সেখানে মুসলিম লীগের সাথে রয়েছে তাদের সখ্যতা। মুসলিম লীগ ক্ষমতায় আসলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো সম্ভব নাও হতে পারে।
এদিকে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হুঁশিয়ার করেছে যে পাকিস্তান মারাত্মক অর্থ সংকটে পড়বে। এ বছরের শেষ নাগাদ তাদের আইএমএফ’র কাছ থেকে ৯ শত কোটি ডলার ঋণ নিতে হবে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে আর দুই মাস আমদানীর কাজ চালানো যাবে। যাই হোক নির্বচন তো করতেই হবে। অবাধ, সুন্দর নির্বাচনের জন্য যাতে সহিংসতা কমিয়ে আনা যায় সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলো, সামরিক বাহিনী পুলিশ, গণমাধ্যমগুলোকে সচেষ্ট থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত পকিস্তানে সহিংসতামুক্ত অবাধ, নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন সুদূর পরাহত বলেই মনে হচ্ছে।